Header Ads

পাক পাঞ্জাতন ও তাদের শান

 

ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু মহাপুরুষ আছেন যাঁদের জীবন, চরিত্র ও আত্মত্যাগ মানবজাতির জন্য চিরন্তন আদর্শ হয়ে আছে। তাঁদের মধ্যেই সবচেয়ে সম্মানিত ও পবিত্র পাঁচজন হলেন — পাক পাঞ্জাতন। "পাক পাঞ্জাতন" অর্থ পবিত্র পাঁচজন। তাঁরা হলেন: হজরত মুহাম্মদ (সা.), হজরত আলী (আ.), হজরত ফাতিমা (আ.), হজরত হাসান (আ.) ও হজরত হোসেন (আ.)

এই পবিত্র পাঁচজন ব্যক্তিরা কেবল নবী বা ইমাম ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন পরিপূর্ণ নৈতিকতা, পবিত্রতা ও আত্মিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক। তাঁদের জীবন থেকে আমরা শিক্ষা পাই—কীভাবে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হয়, কিভাবে সত্যের পথে থাকতে হয়, এবং কীভাবে মানবতার কল্যাণে আত্মত্যাগ করতে হয়।

হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন আল্লাহর শেষ রাসূল। তিনি মানবজাতির জন্য কুরআনের মাধ্যমে আল্লাহর বাণী পৌঁছে দেন। তাঁর জীবনচরিত হল নিখুঁত মানবধর্মের পথপ্রদর্শক।

হজরত আলী (আ.) ছিলেন জ্ঞান, সাহস ও ন্যায়বিচারের মূর্ত প্রতীক। তিনি ইসলামি রাষ্ট্রের প্রথম যুগে নেতৃত্ব দিয়েছেন প্রজ্ঞা ও ধর্মনিষ্ঠার সঙ্গে।

হজরত ফাতিমা (আ.), রাসূলের কন্যা, ছিলেন নারীদের মধ্যে সর্বোচ্চ মর্যাদাপ্রাপ্ত। তাঁর চরিত্র ছিল পবিত্রতা, বিনয়, ও ত্যাগের এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত।

হজরত হাসান (আ.) ছিলেন শান্তিপ্রিয় নেতা, যিনি মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের জন্য রাজনৈতিকভাবে বিচক্ষণতা দেখিয়েছেন এবং রক্তপাত এড়াতে নিজের খিলাফত ত্যাগ করেন।

হজরত হোসেন (আ.) ছিলেন সত্য ও ন্যায়ের শহীদ। কারবালার প্রান্তরে তিনি নিজের পরিবারসহ জীবন উৎসর্গ করে ইসলামকে রক্ষা করেন। তাঁর আত্মত্যাগ চিরকাল সত্যের প্রতীক হিসেবে স্মরণীয় থাকবে। কুরআনের আয়াতে (সূরা আহ্‌যাব ৩৩) বলা হয়েছে: “আল্লাহ চান যাতে আহলে বাইতের অপবিত্রতা দূর করেন এবং তাঁদের সম্পূর্ণরূপে পবিত্র রাখেন।” এই আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, এই পাঁচজন ব্যক্তিই পবিত্রতম মানুষদের অন্তর্ভুক্ত। তাঁদের সম্মানিত অবস্থান শুধু ইতিহাসের পৃষ্ঠায় নয়, প্রতিটি মুসলমানের হৃদয়ে গাঁথা। 

কালাল্লাহুতায়ালা জাল্লা জালালুহু আম্মা নাওয়ালুহু ফিল কোরআনুল মাজিম-'ক্বুল লা আছআলুকুম আলাইহে আজরান ইল্লাল মায়াদাত্তা ফিল কুরবা।' (সূরা : শুরা ২৩, আয়াত)। অর্থ- বলুন হে রাসূল (সা.), রেসালাত বা নবুয়ত বিষয়ে চাইলে কোনো পারিশ্রমিক, আমি চাই আমার নিকট আত্মীয়ের অর্থাৎ আহলে বাইয়াতের সঙ্গে মাআদ্দাতা বা মহব্বত। ওই আয়াতকে বলা হয় আয়াতে মাআদ্দাতা বা প্রাণাধিক ভালোবাসার নিদর্শন। ওই আয়াত দ্বারা আল্লাহ আহলে বাইয়াতের প্রতি মহব্বত উম্মতে মোহাম্মদীর জন্য ফরজ করে দিয়েছেন।

রইসুল মুফাচ্ছেরীন হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাছ (রা.) থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, উক্ত সূরা শুরার ২৩নং আয়াত যখন নাজিল হয়, তখন সাহাবায়ে কেরাম হুজুর পাককে (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা.), আপনার কোনো নিকট আত্মীয়, যাদের সম্পর্কে এ আয়াত নাজিল হলো? জবাবে নবী করিম (সা.) বলেন, আলী, মা ফাতেমা, ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন। (তাফসিরে এ জালালইন মিসরি, দ্বিতীয় খণ্ড, ৩২নং পৃষ্ঠা, তাফসিরে ইবনে আরাবির দ্বিতীয় খণ্ড, ২১১ পৃ.)। 

হাদীসের দৃষ্টিকোণ:

হাদীসে কিসা (চাদরের হাদীস) খুবই বিখ্যাত, যেখানে হজরত মুহাম্মদ (সা.) একটি চাদরের নিচে আলী, ফাতিমা, হাসান ও হোসেনকে নিয়ে বসেন এবং বলেন: “এইরা আমার আহলে বাইত।” এটি প্রমাণ করে তাঁদের একান্ত ঘনিষ্ঠ ও পবিত্র অবস্থান।

তা ব্যতীত ও নিকট আত্মীয় সম্পর্কে মেশকাত শরিফের ৩নং জিলদের ২৬৮ ও ২৬৯ পৃষ্ঠায় হজরত সাদ ইবনে আবি ওয়াকাস থেকে বর্ণিত- যে সূরা আল ইমনরার ৬১নং আয়াত নাজিল হলো তখন রাসূল (সা.) আলী, মা ফাতেমা, হাসান ও হোসাইনকে রাসূলের (সা.) গায়ের কাল কম্বলের ভেতর ডেকে নিয়ে বললেন, 'হে আল্লাহ সাক্ষী থাকুন, তারাই আমার নিকট আত্মীয়।

' আল্লাহ সূরা আল ইমরানের ১০৩নং আয়াতে ফরমাইয়াছেন- "তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং পরস্পরে বিভক্ত হয়ো না। তোমরা আল্লাহর সেই অনুগ্রহ স্মরণ করো, যখন তোমরা ছিলে একে অপরের শত্রু, অতঃপর তিনি তোমাদের হৃদয়সমূহে মিল স্থাপন করলেন এবং তোমরা তাঁর অনুগ্রহে ভাই ভাই হয়ে গেলে। তোমরা ছিলে অগ্নিকুণ্ডের ধারে, আর তিনি তা থেকে তোমাদের রক্ষা করলেন। এভাবেই আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর নিদর্শনসমূহ স্পষ্ট করে তুলে ধরেন, যাতে তোমরা সৎপথে চলতে পারো।" উক্ত আয়াতেই বলা হয়েছে, 'তোমরা দলে দলে বিভক্ত হয়ে যেও না।' কারণ যদি মুসলমানরা ভিন্ন ভিন্ন আকিদা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ফেকরা সৃষ্টি করে, তবে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে লিপ্ত হয়ে ইসলামকে দুর্বল করে ফেলবে। এতে মোহাম্মদী ইসলামকে খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত করে ফেলবে। 

হজরত আলা ইবনে সুররা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, হজরত রাসূল (সা.) ফরমাইয়াছেন- 'হোসাইন আমা হতে এবং আমি হোসাইন হতে।' অর্থাৎ আমি ও হোসাইন অভিন্ন। যে কেউ হোসাইনকে মহব্বত করে, আল্লাহ তাকেও মহব্বত করেন। হোসাইন স্বয়ংই একটি বংশ।

হাদীসের দৃষ্টিকোণ:

আহলে বাইয়াত :মেশকাত শরিফের ৩নং জিলদের ২৭৩ পৃষ্ঠায় হজরত যায়েদ ইবনে আকরাম হতে বর্ণিত গাদীর ই কুমের ভাষণে রাসূল (সা.) ফরমাইয়াছেন, আমি দুটি ভারি জিনিস তোমাদের জন্য রেখে যাচ্ছি। তোমরা তা মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরে রাখলে বা আমলে নিয়ে এলে আমার পরে তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না বা অন্ধকারে পড়ে মরবে না। এ দুটি ভারি জিনিসের মধ্যে ১নং কিতাবাল্লাহ আল্লাহর বাণী পাক কোরআন ও ২নং আমার আহলে বায়াত। 

তাই দুই জিনিস একটি অপরটি হতে কখনও পৃথক হবে না হাউজে কাওছার পর্যন্ত। মেশকাত শরিফের ৩নং জিলদের ২৮১ পৃষ্ঠায় হজরত আবিয়ার গফিফারি কাবা ঘরের দরজা ধরে কসম খেয়ে বলেছেন, তোমরা জেনে রেখ আহলে বাইয়াত হজরত নূহর (আ.) কিস্তি বা নৌকার মতো। হজরত নূহর (আ.) পল্গাবনের সময় যারা কিস্তি বা নৌকায় উঠেছিল, তারাই বেঁচেছিল এবং যারা ওঠেনি, তারাই ধ্বংস হয়েছিল। 

হজরত আবু সাইদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, নবী করিম (সা.) বলছেন, অসিলার মাকামের ওপর আর কোনো মাকাম নেই। সুতরাং তোমরা আমার জন্য অসিলা প্রার্থী হও। সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা.), অসিলার মাকামে আপনার সঙ্গে থাকবেন কে? জবাবে নবী করিম (সা.) বললেন, আলী, ফাতেমা, হাসান ও হোসাইন (রা.)। 

হজরত আলী (রা.)থেকে বর্ণিত- হুজুর (সা.) এরশাদ করেন, হাশর দিবসে চার ব্যক্তির জন্য আমি নিজেই সুপারিশ করব- ১. যে আমার আহলে বাইয়াত ও বংশধরকে সম্মান দেবে; ২. যে আমার আহলে বাইয়াতের বংশধরের অভাব পূরণ করবে; ৩. যে আমার আউলাদের মধ্যে কেউ অস্থির হয়ে পড়লে উদ্ধার করার জন্য প্রয়াসী হবে; ৪. যে আমার আউলাদের জন্য কথায় ও কাজে মনেপ্রাণে মহব্বত রাখে।

No comments

Powered by Blogger.