“মানব আমার ভেদ, আমি মানবের ভেদ”
কামেল পীর খোদা-প্রেমের অনুরাগী এবং খোদার নূরে পাগল। তিনি খোদার প্রেমাগ্রিতে জ্বলে পুড়ে নিজেকে ফানা বা ধ্বংস করে দেন। তাই খোদার কুদরত তাঁর মাধ্যমে প্রকাশ পায়। ফলে বাঘ, ভালুক, সাপ-বিচ্ছু সবকিছু তাঁর অনুগত হয়ে যায়। এ প্রসংগে হযরত বড় পীর (রঃ)-এর “ফতুহুল গায়ব” এ বর্ণিত হাদিসটির উল্লেখ করা যায়, “মোমেন বান্দা যখন রেয়াজত ও নফল এবাদত দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য অনুসন্ধান করেন, আল্লাহ তাঁকে ভালবাসেন এবং তাঁকে প্রিয়ভাজন করেন, তখন আল্লাহ তাঁর দর্শন শক্তি হয়ে যান, তাঁর শ্রবণ শক্তি হয়ে যান এবং তাঁর হস্তপদ হয়ে যান”।
১. মানবজাতির মর্যাদা ও মহান সৃষ্টি
আল্লাহ
তা‘আলা কুরআনে বলেন:
"আর নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানকে সম্মানিত করেছি..." —সূরা বনী ইসরাঈল,
১৭:৭০
এই
আয়াত
থেকে
বোঝা
যায়,
আল্লাহ
মানুষকে সম্মানিত করে
সৃষ্টি
করেছেন। এর
মানে,
"মানব
আমার
ভেদ"—এই অংশটিকে বোঝা
যেতে
পারে
এইভাবে:
মানুষ
আল্লাহর এক
বিশেষ
সৃষ্টি,
যার
মধ্যে
নিহিত
রয়েছে
সম্মান,
জ্ঞান
ও
দায়িত্ব। মানুষই
আল্লাহর খলিফা
(প্রতিনিধি) পৃথিবীতে:
"আমি পৃথিবীতে
একজন খলিফা বানাতে যাচ্ছি..." —সূরা আল-বাকারা,
২:৩০
২. “আমি মানবের ভেদ” – এই অংশের ব্যাখ্যা
যদি
বলা
হয়
"আমি
মানবের
ভেদ",
তাহলে
এতে
বোঝানো
হতে
পারে
যে
স্রষ্টা স্বয়ং
নিজ
সৃষ্টির মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছেন—যা মূলত তাসাউফ
বা
সুফিবাদের দর্শনের ধারায়
পড়ে।
ইসলামে
স্রেফ
কুরআন
ও
সহীহ
হাদীসের ভিত্তিতে আল্লাহ
মানুষের মতো
নয়,
তিনি
সৃষ্টি
থেকে
পৃথক:
"তাঁর কোনো সমকক্ষ
নেই" —সূরা ইখলাস, ১১২:৪
তবে
একাধিক
আয়াতে
আল্লাহ
তাঁর
"সিফাত"
বা
গুণাবলির প্রকাশ
ঘটিয়েছেন তাঁর
সৃষ্টির মধ্য
দিয়ে—যেমন দয়া, ক্ষমা,
ন্যায়বিচার ইত্যাদি। এই
দৃষ্টিকোণ থেকে,
যদি
বলা
হয়
“মানব
আল্লাহর সৃষ্টির প্রতিফলন”—তাহলে
এটি
একটি
রূপক
অর্থ
বহন
করে,
আক্ষরিক নয়।
রসুল (সঃ) বলেন, “মোমেন ও কামেল লোকদের দিল আল্লাহতালার আরশ বা সিংহাসন”।
মওলানা রুমী (রঃ) বলেন, “কামেল পীর আল্লাহকে দেখার দর্পন বিশেষ”। তাই পীরের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারলে খোদার প্রমালোকে আত্মা উদ্ভাসিত হয়, অন্তর স্বচ্ছ আয়নার মত পরিস্কার হয় এবং খোদার সাথে যোগসূত্র স্থাপিত হয়।
মওলানা রুমী (রঃ) আরও বলেন, “মোমেন ও কামেলদের দিল হাসিল কর। ইহা তোমার জন্য হজ্জ্ব আকবর। হাজার হাজার কাবা অপেক্ষা শয়তানী স্বভাবমুক্ত একটি অন্তর শ্রেষ্ঠ”। মুরশিদ প্রেমের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন রেখে গেছেন কবি হাফেজ সিরাজী (রঃ)। তিনি তাঁর মুরশিদের উদ্দেশ্যে বলেন, “তোমাকে এমনি ছেড়ে দেব না। আমার জানাজায় তুমি না আসলেও আমার মাজারে হলেও তোমাকে আসতে হবে”।
ওলীগণ হচ্ছেন খোদায়ী প্রেম-প্রেরণা সমৃদ্ধ আত্মা বা রূহের অধিকারী। আল্লাহতলার এশক মহব্বত হৃদয়ে জাগাতে ওলীদের শিষ্যত্ব বা বায়াত গ্রহণ করতে হবে। কামেল পীরের দর্শন লাভ করলে খোদার কথা স্মরণ হয়। কারণ কামেল পীর হল খোদার নূরের ছায়া বিশেষ। তাই ভক্তিভরে পীরের সামনে বসলে খোদার জন্য ভক্তি ও প্রেমের স্পন্দন হৃদয়ে অনুভূত হয়। মহান আল্লাহ বলেন, “প্রকৃত ঈমানদার ঐ ব্যক্তি যাদের হৃদয়ে আল্লাহতায়ালার কথা স্মরণ করা মাত্র কম্পন হয়”।
ইসলামী দর্শনের আলোকে
মানব আমার ভেদ : মানুষ আল্লাহর সৃষ্টি
এবং
খলিফা—সম্মানিত ও দায়িত্বশীল।
আমি মানবের ভেদ : তাসাউফে রূপক অর্থে বলা
যায়:
মানুষের মধ্যেই
সৃষ্টিকর্তার গুণাবলি প্রতিফলিত হয়,
তবে
আল্লাহ
মানুষের মতো
নন।
উপসংহার
কামেল পীর ভক্তের হৃদয়ে রূহানী আকর্ষনের প্রভাব বিস্তার করে থাকেন। ফলে মুরীদ সর্বদা খোদা ও রসুলের ধ্যানে বিভোর থাকেন ও দুঃখ কষ্ট ভুলে যান। মুরিদের হৃদয়ে আনন্দের ঢেউ খেলে যায়। মওলানা রুমী (রঃ) বলেন, “ক্রুশ ও খ্রীষ্টান জগতে তন্ন তন্ন করে খুঁজলাম। সেখানে খোদাকে পেলাম না। পূজা মন্ডপ ও বৌদ্ধ মঠে গমন করলাম। সেখানেও তাঁকে পেলাম না। হিরত ও কান্দাহারের পর্বত অনুসন্ধান করলাম। তিনি সে উপত্যকার মধ্যেও নেই। কামেল ওলীর অন্তরে তাঁকে দেখতে পেলাম। তিনি অন্য কোনখানে নেই”।
.jpg)
No comments