Header Ads

২১শে রমযান: আমীরুল মুমিনীন মাওলা আলী (আঃ)-এর শাহাদাত

 

আমীরুল মুমিনীন ইমাম আলী ইবনে আবু তালিব (আঃ) ছিলেন ইসলামের চতুর্থ খলিফা এবং প্রথম ইমাম (শিয়া মতে)। তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ঘনিষ্ঠ সাহাবি, চাচাতো ভাই এবং জামাতা। তাঁর চরিত্রে ছিল সাহস, জ্ঞান, ন্যায়পরায়ণতা ও আল্লাহর প্রতি গভীর আনুগত্য।

রাসূল (সঃ) বারবার তাঁর মর্যাদা ঘোষণা করেছেন। "আমি যার মাওলা, আলী তার মাওলা" — এই হাদীস তাঁর নেতৃত্বের গুরুত্ব স্পষ্ট করে।

শাহাদাতের কারণ

ইমাম আলী (আঃ)-এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয় সিফফিন যুদ্ধের পর, যেখানে মুয়াবিয়া এবং তার অনুসারীদের সাথে তাঁর সংঘর্ষ হয়। এই সংঘাতের পর একটি চরমপন্থী গোষ্ঠী, খারেজীরা, আলী (আঃ)-এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।

তাদের মতে, হাকামিয়্যাহ মীমাংসা মেনে নিয়ে ইমাম আলী (আঃ) "মানবের বিচারকে আল্লাহর বিচার উপর স্থান দিয়েছেন" যা তারা কুফর বলে বিবেচনা করে। এ থেকেই তারা সিদ্ধান্ত নেয়, তিনজন নেতাকে হত্যা করতে হবে:

আমীরুল মুমিনীন আলী (আঃ)

মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান

আমর ইবনে আস

ঘটনাস্থল

ইমাম আলী (আঃ) তাঁর শাসনামলে রাজধানী স্থাপন করেন কুফা শহরে (বর্তমান ইরাক)। তিনি প্রতিদিনের মতো মসজিদে কুফা-তে ফজরের নামাজ আদায় করতে যেতেন। সেখানেই এই নির্মম ঘটনা সংঘটিত হয়।

আমিরুল মোমেনীন, ইমামে আযম, মাওলা আলী (আঃ) কে আঘাতের রাতে মাওলা আলী (আঃ) মসজিদে প্রবেশ করলেন এবং উপস্থিত মুয়াজ্জিন কে বললেন, "আজ তোমার পরিবর্তে আমি আযান দিব। "মাওলা আলী (আঃ) আযানের প্রথম ধ্বনি উচ্চারণ করলেন, "আল্লাহু আকবর" এই ধ্বনি সকলের কানে এমন ভাবে গেল যেন কোনো বিষাদ বেদনার ইঙ্গিত। আযানের শব্দ কন্যাদের গৃহেও পৌছে, তারা বলে "বাবার কন্ঠে আজ কতো বেদনার বহিঃপ্রকাশ!

হত্যার ঘটনা

হিজরি ৪০ সনের ১৯ রমযান (মতান্তরে ১৭ রমযান) ফজরের নামাজের সময়, ইমাম আলী (আঃ) যখন সিজদায় ছিলেন, তখন খারেজি ঘাতক ইবনে মুলজিম বিষমাখানো তরবারি দিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করে। " ইমাম নামায শুরু করেন কিরাআতের পরে সিজদায় গেলেন। এমন সময় ইবনে মুলজেম চিৎকার করে বলে উঠলো (বিচার-ফয়সালা ও হুকুমতের অধিকার একমাত্র আল্লাহর, তোমার নয়, হে আলী) বলে ইমাম (আঃ)-এর পবিত্র শির মোবারকের  ওপর বিষাক্ত তলোয়ারের আঘাত হানলো। তিনি তখন বলেছিলেন: "ফুয্তু ওয়া রাব্বিল কা‘বা"(কাবার প্রভুর শপথ! আমি সফল হলাম) এই বাক্যই তাঁর আত্মত্যাগের চূড়ান্ত প্রতিফলন, তিনি শাহাদাতকে বিজয় হিসেবে গ্রহণ করেন।

তলোয়ারের বৈশিষ্ট্য ছিলো অত্যন্ত ভারী ও মোটা, এই তলোয়ারে ১০০০ দিরহাম দিয়ে কেনা বিষ বেয়ে বেয়ে পড়ছিলো, ঘটনাক্রমে তলোয়ার দিয়ে সেখানে আঘাত হানলো যেখানে ইতিপূর্বে এক যুদ্ধে আমর বিন আবদূদ-এর তলোয়ার আঘাত হেনেছিলো। সেই আঘাতের সাথে এই আঘাত গভিরতা মিলে মাওলার পবিত্র মস্তক কপাল পর্যন্ত ফেটে যায়। মাথার দুই-তৃতীয়াংশ ফেটে যায় । ইমাম আলী (আঃ) সিজদারত থাকাকালে ইবনে মুলজেম তার পবিত্র মস্তকে আঘাত হানে, মাথার পিছন ভাগে একেবারেই ভারী তলোয়ার টি ঢুকে যায়।

মেহরাবের মধ্যে মাওলা আলী (আঃ)-এর মাথা থেকে রক্ত প্রবাহিত হলো এবং তাতে তাঁর পবিত্র দাড়ি রঞ্জিত হয়ে উঠলো। এ অবস্থায় ইমাম (আঃ) বললেন-[ফুজতো বে রাব্বিল কা'বা] “কা’বার রবের শপথ, আমি বিজয়ী হয়েছি।” অতঃপর তিনি এ আয়াতটি তেলাওয়াত করলেন- তোমাদেরকে এ (মাটি) থেকে সৃষ্টি করেছি, এতেই আবার তোমাদের প্রত্যাবর্তন ঘটাবো, আর পুনরায় এ থেকেই তোমাদেরকে উথিত করবো। ইমাম আলী (আঃ) যখন আঘাতপ্রাপ্ত হলেন তখন চিৎকার করে বলে উঠলেন, “ তাকে আটক কর। ” লোকজন ইবনে মুলজেমকে ধাওয়া করলো । যে কেউ তার নিকটবর্তী হচ্ছিলো সে স্বীয় তলোয়ার দিয়ে তাকেই আঘাত করছিলো। অতঃপর কুসাম ইবনে আব্বাস সামনে এগিয়ে গেলেন এবং তাকে জাপটে ধরে মাটিতে ফেলে দিলেন। তাকে আলী (আঃ)-এর কাছে আনা হলে তিনি তাকে বললেন- “তুমি মুলজেমের পুত্র?” সে বললো, “হ্যা।” মাওলা আলী(আঃ) কে আঘাত করার সাথে সাথেই মাওলা নিজের দুই হাত কে মাটিতে রাখেন আর ডান দিকে পড়ে যান, ইমাম হাসান(আঃ) ও ইমাম হুসাইন(আঃ) মাওলা আব্বাস(আঃ), হযরত হানাফিয়া(আঃ) মিলে মাওলা কে উঠান, মাওলার রক্তে সকল পুত্রের পোষাকেই রক্ত লেগে ভিজে যায়।

শাহাদাত

এই আঘাতের পর মাওলা আলী (আঃ) এর দু'হাত ইমাম হাসান (আঃ) ও ইমাম হুসাইন(আঃ) এবং দু'পা দুইপুত্র আব্বাস(আঃ) ও মুহাম্মাদ হানাফিয়া (আঃ) ধরে ঘরের দিকে দ্রুত অগ্রসর হতে লাগলেন, মাওলা আলী(আঃ) আহত অবস্থায় বলতে লাগলেন পিছনে যারা যাচ্ছিলেন তাদেরকে , "আমার একটি অনুরোধ আমার পিছে তোমরা এসোনা, আমাকে আমার পুত্রদের সাথে যেতে দাও, আমার গৃহের দরজার থেকে আমার কন্যাদের কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে, আমি চাইনা ওদের আওয়াজ তোমাদের কানে যাক । "

ইমামের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে কেউ আর উনার সাথে ঘর পর্যন্ত গেলো না, শুধু ইমামদ্বয় ও উনার পুত্ররা উনাকে নিয়ে দরজায় পৌছলেন, শাহজাদী যাইনাব (আঃ) ও উম্মে কুলসুম (আঃ) তাদের বাবা আলী-এ-মুরতাযা (আঃ) কে দেখলেন রক্তে ডুবা ও ভাই হাসান-হুসাইন(আঃ) কে দেখলেন রক্তভেজা জামায় দরজায় এসেছেন, বনি হাশিমের সকলেই উচ্চারণ করছিলেন, "আল্লাহর কসম, আজ হেদায়েতের স্তম্ভ ভেঙে গেলো " (তা'হাদদা বাদ ওয়াল্লাহ আরকানিল হুদা) ইমাম(আঃ) কে বিছানায় শোয়ানোর জন্য সবাই চেষ্টা করল কিন্তু ইমাম(আঃ) বললেন, "আমাকে মাটিতে একটি মাদুরের উপর শুইয়ে দাও।"

৩ দিনান্তে ২১শে রমযান মাওলা আলী আমীরুল মুমিনীন (আঃ) নিজের পরিবার সহ সমস্ত ভক্তদের কে বিদায় দেন ও শাহাদাত বরণ করেন ।  আল্লাহুম্মা লা আন কাতালাতা আমিরুল মোমেনিন আস-সালামু আলাইকা ইয়া শাহিদ-এ-কুফা, আস-সালামু আলাইকা ইয়া আমীরুল মুমিনীন (আঃ)। 

কবরস্থান

তাঁর পবিত্র দেহ গোপনে কুফা থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার উত্তরে নজাফে দাফন করা হয়, কারণ সেই সময় তাঁর অনুসারীদের নিরাপত্তা ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। আজ সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইমাম আলীর পবিত্র মাজার - যা শিয়া ও সুন্নি উভয়ের জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থান।

উপসংহার

মাওলা আলী (আঃ)-এর শাহাদাত ইসলামের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়, তবে তাঁর জীবনের আদর্শ আজও সকল মুমিনদের জন্য প্রেরণা। ২১শে রমযান শুধু শোকের দিন নয়, বরং ন্যায়, সত্য ও ত্যাগের মূল্যবোধের প্রতীক। তাঁর বাণী, চরিত্র ও নীতির অনুসরণেই রয়েছে আমাদের প্রকৃত মুক্তির পথ।

স্মরণীয় কিছু বাণী : "মানুষ দু'ধরনের - হয় সে তোমার ধর্মের ভাই, নয়তো সে তোমার সৃষ্টির ভাই।" ইমাম আলী (আঃ) "ন্যায়বিচার হলো শাসনের ভিত্তি।"




No comments

Powered by Blogger.