১৯৪৮ সালের আগে ইসরায়েল কী ছিল এবং কীভাবে এর সৃষ্টি
অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালে ব্রিটেন ‘প্যালেস্টাইন’ (ফিলিস্তিন) নামে পরিচিত ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। মধ্যপ্রাচ্যের এই অংশ দীর্ঘকাল অটোমান শাসকদের অধীনে ছিল।
ফিলিস্তিনে আগে থেকেই সংখ্যাগরিষ্ঠ আরব ও সংখ্যালঘু ইহুদিদের পাশাপাশি অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করত।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেন ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। পরে সেখানাকার সংখ্যালঘু ইহুদি জনগোষ্ঠীর জন্য এ ভূখণ্ডে তারা একটি ‘জাতীয় আবাস’ প্রতিষ্ঠায় নীতিগতভাবে সম্মত হয়। এই সম্মতি বা অঙ্গীকার কালক্রমে ‘বালফোর ঘোষণাপত্র’ নামে পরিচিতি পায়।
ইহুদিদের সঙ্গে সংখ্যাগরিষ্ঠ এই আরব জনগোষ্ঠীর উত্তেজনা গভীর হয় তখন, যখন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড আর্থার বালফোর ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর জায়নবাদী নেতা ব্যারন রথচাইল্ডকে একটি পত্র পাঠান। এর মধ্য দিয়ে তিনি ‘জায়নবাদ’ নামক উগ্র ইহুদিবাদ বা ইহুদি জাতীয়তাবাদকে স্বীকৃতি দেন। এটি এক মহাবিপর্যয়ের দুয়ার খুলে দেয়।
এ স্বীকৃতির মাধ্যমে ব্রিটেন নীতিগতভাবে সংখ্যালঘু ইহুদি জনগোষ্ঠীর জন্য ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে একটি ‘জাতীয় আবাস’ প্রতিষ্ঠায় সম্মত হয়। এই সম্মতি বা অঙ্গীকার কালক্রমে বালফোর ঘোষণাপত্র নামে পরিচিতি পায়।
এ ভূমির সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে ইহুদিদেরও একটা যোগসূত্র ছিল। কিন্তু ভূখণ্ডটির ওপর ফিলিস্তিনি আরবদের দাবি ছিল কয়েক শতকের পুরোনো। তাঁরা ব্রিটেনের ওই উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করেন। ওই তৎপরতার পক্ষে ব্রিটেন এ অজুহাত দাঁড় করায় যে ভূখণ্ডটিতে বসবাসকারী ফিলিস্তিনি আরবদের অধিকার এমনিতেই সুরক্ষিত।
ব্রিটেনের মদদে ১৯২০–এর দশক থেকে ১৯৪০–এর দশকের মধ্যে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে ইহুদিদের আগমন বেড়ে যায়। তাঁদের অনেকেই ইউরোপ থেকে বিতাড়িত হয়ে এখানে পালিয়ে আসেন। ১৯৩৯-৪৫ সময়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোল আর জার্মানিতে শাসক হিটলারের চরম ইহুদিবিদ্বেষ জায়নবাদীদের বড় সুযোগ এনে দেয়।
ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের ওপর ব্রিটিশ শাসন শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে সেখানকার ইহুদি নেতারা একটি স্বাধীন ইসরায়েল রাষ্ট্রের একতরফা ঘোষণা দেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান সঙ্গে সঙ্গে একে স্বীকৃতি দেন। এর মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনিদের ওপর অনিঃশেষ বিপর্যয় নেমে আসে। পরের বছর জাতিসংঘ ইসরায়েলকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেয়।
বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ইউরোপে ৬০ লাখের মতো ইহুদি নিধন করা হয় (ইতিহাসে ‘হলোকাস্ট’ নামে পরিচিত)। বিশ্বযুদ্ধ শেষে এ হলোকাস্টকেই ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইহুদিদের একটা নিরাপদ ও স্বতন্ত্র আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার যৌক্তিকতা হিসেবে তুলে ধরা হয়। জায়নবাদী আন্দোলন ও হলোকাস্টের ধারাবাহিকতায় ১৯৪৭ সালের মধ্যে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইহুদিদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬ লাখ ৩০ হাজারে; যা সেখানকার জনসংখ্যার ৩০ শতাংশের কিছু বেশি।
ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইউরোপীয় ইহুদিদের স্রোত বাড়তে থাকায় একপর্যায়ে স্থানীয় ফিলিস্তিনি আরবদের সঙ্গে তাদের সংঘাত দেখা দেয়। ১৯৩৩ সালে ফিলিস্তিনিরা বড় আকারে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ শুরু করলে ব্রিটিশ সরকার কঠোরভাবে তা দমন করে। পাশাপাশি ফিলিস্তিনে স্বতন্ত্র ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের নানামুখী পরিকল্পনা ও কর্মকাণ্ড চলতে থাকে।
১৯৪৭ সালে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে আরব ও ইহুদিদের মধ্যে সহিসংতা বেড়ে যাওয়া এবং ব্রিটিশ শাসনের প্রেক্ষাপটে ফিলিস্তিনকে ইহুদি ও আরব রাষ্ট্র—এ দুভাগে ভাগ করার পক্ষে ভোট দেয় জাতিসংঘ; যেখানে জেরুজালেমকে একটি আন্তর্জাতিক শহর হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
ব্রিটিশ ম্যান্ডেটে শাসিত ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের ৫৬ শতাংশ ইহুদি ও ৪৩ শতাংশ ফিলিস্তিনি আরবদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার এ পরিকল্পনা কোনো আরব দেশ মেনে নেয়নি। তাদের যুক্তি ছিল, ইহুদিরা জনসংখ্যায় কম হলেও তাঁদের বেশি ভূখণ্ড দেওয়া হয়েছে পরিকল্পনাটিতে। সাধারণ পরিষদে ৩৩-১৩ ভোটে গৃহীত এ প্রস্তাবে চীনসহ ১০ দেশ ভোট দানে বিরত এবং থাইল্যান্ড অধিবেশনে অনুপস্থিত থাকে।
ভোটাভুটিতে অনুপস্থিত থাকে ব্রিটেনও। এ পরিকল্পনা প্রত্যাহার করে ১৯৪৮ সালের ১৪ মে জাতিসংঘের হাতে ফিলিস্তিন সমস্যা সুরাহার ভার তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় দেশটি।
ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের ওপর এভাবে ব্রিটিশ শাসন শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে সেখানকার ইহুদি নেতারা একটি স্বাধীন ইসরায়েল রাষ্ট্রের একতরফা ঘোষণা দেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান সঙ্গে সঙ্গে একে স্বীকৃতি দেন। এর মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনিদের ওপর অনিঃশেষ বিপর্যয় নেমে আসে। পরের বছর জাতিসংঘ ইসরায়েলকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেয়।
.jpg)
No comments