শ্রীকৃষ্ণের স্বশরীরে বৈকুন্ঠে গমন
শ্রীকৃষ্ণ, যিনি ভগবান বিষ্ণুর পূর্ণ অবতার হিসেবে স্বীকৃত, তাঁর পৃথিবীতে আগমন ও প্রস্থান—দুই ঘটনাই অসাধারণ এবং গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্যে পূর্ণ। তাঁর বৈকুন্ঠে গমন সম্পর্কিত বিষয়টি নিয়ে বহু পুরাণ, মহাকাব্য ও ভক্তিমূলক সাহিত্যে বিশদ আলোচনা রয়েছে। এই বিষয়ে আমরা বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ থেকে তথ্য বিশ্লেষণ করে বুঝতে পারি।
শ্লোক উদাহরণ : ত্রিজগতের পূজনীয় মহাযশস্বী স্বয়ং বিষ্ণু লোকের প্রতি অনুগ্রহ করিবার জন্য বসুদেব-দেবকীতে আবির্ভূত হইয়া ছিলেন। ( মহাভারত, আদিপর্ব, ৫৮/১৩৮ )
তার পরেও কিছু অজ্ঞানী মানুষেরা তাদের আসুরিক মতকে প্রচার করতে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অন্তর্ধান লীলা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা অপপ্রচার করে, যা অশাস্ত্রীয়, ঘৃন্য এবং আসুরিক। অথচ মহাভারত শাস্ত্রের মৌষলপর্ব পাঠ করে আমরা সহজে জানা যায়, পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজে তার অন্তর্ধানের সময় নির্ধারন করেছিলেন। তখন তিনি একটি বৃক্ষের উপর চতুর্ভূজ বিষ্ণুরুপে অবস্থান করেছিলেন। শ্রীকৃষ্ণের ইচ্ছার প্রভাবে শ্রীকৃষ্ণ স্বশরীরে প্রথমে স্বর্গে এবং পরে বৈকুন্ঠ জগতে প্রবেশ করেন।
১. শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণের বিবরণ
শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ (একাদশ স্কন্ধ, ৩০-৩১ অধ্যায়) অনুসারে, দ্বারকা নগরী যখন ধ্বংসের পথে, তখন শ্রীকৃষ্ণ তাঁর লীলার সমাপ্তি ঘোষণা করেন। তিনি এক নির্জন স্থানে যান এবং সেখানেই তাঁকে একজন শিকারি (জরা নামক ব্যক্তি) ভুলবশত একটি তীর নিক্ষেপ করে, যা তাঁর পদদেশে বিদ্ধ হয়।
কিন্তু এই ঘটনা সাধারণ মানুষের মৃত্যুর মতো নয়। এটি ছিল তাঁর ইচ্ছানুযায়ী দেহরূপ ত্যাগ এবং আত্মপ্রকাশের একটি রূপান্তর। কৃষ্ণ তখন নিজের দিব্য রূপে প্রকাশিত হয়ে স্বশরীরে বৈকুন্ঠে প্রত্যাবর্তন করেন।
শ্লোক উদাহরণ : "তদা তমাৎমানং লোককল্যাণপার্থয়ঃ, স্বশরীরেন বৈকুণ্ঠং যোগমায়ো বিরাজতে।" (শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ ১১.৩১.১১): অর্থ: তখন ভগবান স্বশরীরেই বৈকুন্ঠে প্রত্যাবর্তন করেন, যা সাধারণ দেহ নয় বরং যোগমায়িক।
শ্লোক উদাহরণ : লোকাভিরামাং স্বতনুং ধারানাধ্যানমঙ্গলম। যোগধারনয়াগ্নেয়্যাদগ্ধা ধামাবিশ্য স্বকর্ম।।
অনুবাদ: সর্বজগতের সর্বাকর্ষক বিশ্রামস্থল, এবং সর্বপ্রকারের ধ্যান ও মননের বিষয়, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তার দিব্য শরীরে আগ্নেয় নামক অলৌকিক ধ্যানের প্রয়োগে দগ্ধ না করে তার স্বীয় ধামে গমন করেছিলেন। ( শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ ১১/৩১/০৬ )
২. মহাভারতের মৌসলপর্ব
মহাভারতের মৌসলপর্বে কৃষ্ণের দেহত্যাগ এবং যাদব বংশের পতনের বিশদ বিবরণ আছে। সেখানে বলা হয়েছে যে, শ্রীকৃষ্ণ একটি পিপুল গাছের নিচে বিশ্রাম নেন এবং সেই সময় এক শিকারি তাঁকে হরিণ ভেবে তীর ছোঁড়ে। কৃষ্ণ শিকারিকে ক্ষমা করে দেন এবং সেই ঘটনার মধ্য দিয়েই তিনি এই লীলা সমাপ্তি করেন।
শ্লোক উদাহরণ : দেবোহপি সন্দেহবিমোক্ষহেতোনির্ণীত মৈচ্ছৎ সকলার্থতত্ববিৎ। স সং নিরুদ্ধেন্দ্রিয়বাঙ মনাস্তু শিশ্যে মহাযোগমু পেত্য কৃষ্ণঃ।। জরোহথতং দেশমুপাজগাম লুব্ধস্তদানীং মৃগলিপ্সুরুগ্রঃ।স কেশবং যোগযুক্তং শযানং মৃগশঙ্কী লুব্ধুকঃ সাযকেন।।জরাহবিধ্যৎ পাদতলে ত্বরাবাংস্তৎ চাভিতাস্তজ্জিঘৃক্ষুর্জগাম অথাপশ্যৎ পুরুষং যোগযুক্তং পীতাম্বরধরং লুব্ধকোহনেকবাহুম।। ( মহাভারত, মৌষলপর্ব-৪/২১-২৩ )
অনুবাদ: সকলার্থতত্ত্বজ্ঞ শ্রীকৃষ্ণ সন্দেহ দূর করবার জন্য নিশ্চিত বিষয় কামনা করলেন। তখন কৃষ্ণ মহাযোগ অবলম্বন করে ইন্দ্রিয়,বাক্য ও মনকে নিরুদ্ধ করে ভূতলে শয়ন করলেন। তারপর উগ্রমূর্তি ও হরিণলিপ্সু জরা নামক এক ব্যাধ সেই সময়ে সেই স্থানে আগমন করে এবং মৃগ মনে করে বাণদ্বারা যোগযুক্ত অবস্থায় শায়িত কৃষ্ণের পদতলে বিদ্ধ করে। পরে ত্বরান্বিত হয়ে সেই বিদ্ধ মৃগকে গ্রহণ করতে ইচ্ছা করে তার নিকট গমন করলেন এবং তারপর সে (জরা ব্যাধ) দেখল- অনেক বাহু পীতাম্বরূপ বিধায়ী ও যোগযুক্ত একটি পুরুষ শায়িত রয়েছেন।
ভগবান বলরামের এরুপ অন্তর্ধানের পর:- সেনে ততঃ সংত্রয়মনস্য কালং ততশ্চকারেন্দ্রিয়ং নিরোধম। যথা চ লোকত্রয়পালনার্থং দূর্বাসাবাক্য প্রতিপালনায়।। ( মহাভারত, মৌষলপর্ব ৪/২০ )
অনুবাদ: ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সেই সময়টিকেই নিজের প্রস্থানের সময় মনে করেছিলেন।পরে তিনি ত্রিভুবন পালন করবার জন্য এবং দূর্বাসা মুনির বাক্য রক্ষা করার নিমিত্তে ইন্দ্রিয়সমূহকে নিরুদ্ধ করেছিলেন।
বিশ্লেষণ: উপরোক্ত বর্ণনা থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যখন দর্শন করলেন বলরাম সমুদ্রে লীন হলেন তখন তিনি সেই সময়টিকেই নিজের প্রস্থানের সময় মনে করেছিলেন। অর্থাৎ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই জড় জগত ত্যাগ করার সময় তিনি নিজেই নির্ধারণ করেছিলেন।
তবে, অনেক ব্যাখ্যায় একে আধ্যাত্মিকভাবে দেখা হয় — এটি কোনো দেহত্যাগ নয় বরং অবতার রূপে তাঁর মর্ত্যলীলা শেষ হওয়া মাত্র।
৩. বৈকুন্ঠে গমন: স্বশরীরে না আত্মরূপে?
হিন্দু দর্শনে পরমপদ বা বৈকুন্ঠ হলো সেই স্থান যেখানে বিষ্ণু ও তাঁর অবতাররা অধিষ্ঠান করেন। যেহেতু শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং বিষ্ণু, তাই তিনি সাধারণ জীবের মতো আত্মা হিসেবে নয়, নিজের দিব্য দেহসহ সেই ধামে প্রত্যাবর্তন করেন।
শ্লোক উদাহরণ : দৃষ্টা তথা দেবমন্তবীর্য্যং দেবৈঃ স্বর্গং প্রাপিতস্ত্যক্তদেহ।গণৈমুনীণাং পূজিতস্তত্র কৃষ্ণো গচ্ছন্নদ্ধং ব্যাপ্য লোকান স লক্ষ্যা।। দিব্যং প্রাপ্তয় বাসবোহথাশ্বণৌ চ রুদ্রাদিত্যা বসবশ্চাথ বিশ্বে।প্রত্যু্যদৃযষুমুর্নয়শ্চাপি সিদ্ধা গন্ধর্বমুখ্যাশ্চ সহাপ্সরোভব।। ততো রাজন! ভগবানুগ্রতেজা নারায়নঃ প্রভবশ্চাব্যয়শ্চ।যোগাচার্য্যো রোদসী ব্যাপ্য লক্ষ্যা স্থাং প্রাপ স্বং মহাত্মহপ্রমেয়ম।। ( মহাভারত, মৌষলপর্ব ৪/২৫-২৭ )
অনুবাদ: দেবগণ অনন্তবীর্য নারায়ণকে দর্শন করে ব্যাধের দেহকে রেখে ব্যাধকে স্বর্গে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং শ্রীকৃষ্ণ আপন কান্তিদ্বারা জগদব্যাপ্ত করে উর্দ্ধদিকে গমন করতে লাগলেন তখন মুনিগণ শ্রীকৃষ্ণের পূজা করতে লাগলেন। শ্রীকৃষ্ণ স্বর্গে উপস্থিত হলে ইন্দ্র,অশ্বিনীকুমারদ্বয়, একাদশ রুদ্র, দ্বাদশ আদিত্য, অষ্টবসু, বিশ্বদেবগণ, সিগ্ধ মুনিগণ এবং অপ্সরাদের সাথে গন্ধর্বশ্রেষ্ট গণ তার (কৃষ্ণের) প্রত্যুদ্গমন (আরাধনা) করেছিলেন। তার পর ভীষণতেজা, জগতের, উৎপাদক, অবিনশ্বর, যোগ শিক্ষক, মহাত্মা ভগবান নারায়ন ( শ্রীকৃষ্ণ) আপন কান্তিদ্বারা স্বর্গ,মর্ত্ত্য ব্যাপ্ত করে সাধারণের অর্জ্ঞেয় স্বকীয় বৈকুণ্ঠধাম গমন করেছিলেন।
বিশ্লেষণ: উপরোক্ত মহাভারতের আলোচনায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ চতুর্ভুজরুপ ধারন করে স্বশরীরে প্রথমে স্বর্গ এরপর তার স্বীয় চিন্ময় বৈকুন্ঠ জগতে প্রবেশ করেছিলেন। এ সম্পর্কে ভাগবতেও একই তথ্য পরিবেশিত হয়েছে।
ভক্তরা বিশ্বাস করেন, কৃষ্ণের শরীর কোনো জড় পদার্থ নয় — এটি চিরন্তন, সচেতন এবং আনন্দময় (সচ্চিদানন্দময়)। ফলে, তাঁর "মৃত্যু" এক ধরনের মহাজাগতিক অন্তর্ধান মাত্র।
৪. গৌড়ীয় বৈষ্ণব ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের দৃষ্টিভঙ্গি
গৌড়ীয় বৈষ্ণব মত অনুসারে, শ্রীকৃষ্ণ কখনো প্রকৃত অর্থে "দেহ ত্যাগ" করেননি। তাঁর সব কর্মকাণ্ডই লীলাময়।
রামানুজ ও মাধ্ব সম্প্রদায় একইভাবে বিশ্বাস করে যে কৃষ্ণ স্বশরীরে দিব্য ধামে গমন করেছেন।
অনেকে বলেন, জরা শিকারীর তীর ছিল এক প্রতীক — কৃষ্ণের অবতারের শেষ পর্ব, এবং এইভাবে তিনি তাঁর কর্ম-লীলা সম্পূর্ণ করেন।
উপসংহার
শ্রীকৃষ্ণের বৈকুন্ঠে গমন ছিল কোনো সাধারণ মৃত্যুর ঘটনা নয়। এটি ছিল এক পরম ঐশ্বরিক অন্তর্ধান। তিনি তাঁর দিব্য শরীরেই বৈকুন্ঠ ধামে ফিরে যান, যেখানে তিনি চিরকাল লীলা করেন। শাস্ত্র মতে, তাঁর শরীর জড় পদার্থ নয়, বরং তা পরমতত্ত্বের প্রকাশ। তাঁর গমন একমাত্র ঈশ্বরীয় ঘটনাই নয়, বরং ভক্তদের জন্য এটি এক চিরন্তন আশ্বাস — ঈশ্বর যখন আসেন, তখন তিনি ইচ্ছায় আসেন, এবং ইচ্ছায়ই চলে যান।
.jpg)
No comments