Header Ads

সুফী মতে মানব দেহের খান্নাসরূপী শয়তানটি কিভাবে বিতাড়িত করা যায়?

প্রতিটা মানুষের ভেতর যে খান্নাসরূপী শয়তানটি আছে, উহাকে কিভাবে তাড়াতে হবে? কোন পথ ও মত অবলম্বন করলে খান্নাসরূপী শয়তানটিকে চিরতরে বিতাড়িত করা যায়? এই খান্নাসরূপী শয়তানটিকে তাড়িয়ে দেবার প্রেসক্রিপশন তথা ব্যবস্থাপত্রটি একমাত্র সুফিবাদের মনিরেষীগণ দিয়ে গেছে। সুতরাং সুফিবাদই হল ইসলামের মূল বিষয়। ইসলামের প্রথম যুগ তথা হজরত আদম (আ.) হতে শুরু করে সকল জাতি ও সম্প্রদায়ের মাঝে আল্লাহ্ পাক রাব্বুল আল আমিন নবী ও রসুল প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আল আমিন মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য উদ্দেশ্যমূলক ভাবে আপনার-আমার ভিতরে দেওয়া এই খান্নাসরূপী শয়তানটিকে কেমন করে তথা কী উপায়/কোন পথ অবলম্বন করলে তাড়িয়ে দেওয়া যায় তারই ব্যবস্থাপত্রটি যুগে যুগে, কালে কালে, সর্বসময়ে তাঁরা দিয়ে গেছেন।

খান্নাসরূপী শয়তানকে তাড়িয়ে দেওয়ার প্রেসক্রিপশন কোথায় পাওয়া যায় 
আজ হতে অনুমানিক সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগে যমদগ্নি মুনি যখন ধ্যান-সাধনা করার মধ্য দিয়ে সিদ্ধি লাভ করেছেন, তথা আপনার-আমার ভিতরের খান্নাসরূপী শয়তানকে তাড়িয়ে দিতে পারলেন, তখনই যমদগ্নি মুনি বলে ফেললেন, ‘সোহহম সোহমী’ তথা তিনিই আমি, আমিই তিনি। সুতরাং পীর তথা গুরু ধরতেই হবে। এই পীর তথা গুরুর মাধ্যমে শিষ্যকে তথা মুরিদকে শিখে নিতে হবে, জেনে নিতে হবে, কেমন করে কীভাবে কী উপায়ে নিজের ভিতরের খান্নাসরূপী শয়তানটিকে তাড়িয়ে দেওয়া যায়। আরবি ভাষায় যাকে আমরা খান্নাসরূপী শয়তান বলি উহাকেই বৈদিক যুগের মুনি ঋষিরা ‘মায়া’ বলে থাকেন। বৈদিক যুগের মুনি-ঋষিরা এই মায়ার বন্ধনকেই ছিন্ন করতে উপদেশ দিয়ে গেছেন।

খান্নাস কী?
"খান্নাস" শব্দটি এসেছে কুরআনের সূরা নাস থেকে, যার অর্থ—"যে গোপনে কুমন্ত্রণা দেয় ও পিছিয়ে যায়"। ইসলামী আধ্যাত্মিকতায় এটি এমন এক শয়তানি শক্তিকে বোঝায়, যা মানুষের হৃদয়ে নিঃশব্দে কুমন্ত্রণা দেয়। সুফীরা মনে করেন, এই শয়তান আমাদের নফসের (আত্মার নিচু প্রবৃত্তি) সঙ্গে জোট বেঁধে কাজ করে এবং মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিচ্যুত করে।

সুফী দর্শনে খান্নাসের প্রভাব
সুফীগণ বলেন, খান্নাস মানুষকে ঈমান দুর্বল করা, অহংকারে ডোবানো, লোভ ও হিংসা জাগানো, শরীয়তের পথ থেকে সরানো, ও আল্লাহর ভালোবাসা ভুলিয়ে দেওয়া—এসবের মাধ্যমে বিভ্রান্ত করে। এটি একধরনের “অদৃশ্য আত্মিক ভাইরাস” যা চিন্তা, অনুভূতি ও ইচ্ছায় ধীরে ধীরে প্রভাব বিস্তার করে।

বৈদিক যুগের মুনি-ঋষিরা বলেছেন যে, কর্ম করা বন্ধন নয়, বরং কর্মের মাঝে যখন মায়া বা খান্নাস এসে উপস্থিত হয় তখনই কর্ম বন্ধন হয়ে যায়। মায়া/খান্নাস কর্মকে কলুষিত করে। হাঁস জলের পুকুরে সারাদিন অবস্থান করে, কিন্তু সাঁঝের বেলায় পুকুর হতে যখন উঠে আসে তখন হাঁসের শরীরে আর জল থাকে না। কর্মের পুকুরে অবস্থান করো, কিন্তু মায়ার জল যেন গায়ে না লাগে। এ বড় কঠিন পরীক্ষা। এ বড় প্রতিজ্ঞা নিয়ে সাধনরাজ্যে অগ্রসর হওয়া। মায়ার বন্ধন হতে মুক্তি পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়, কোনো মামুলি বিষয় নয় বা কোনো ছেলের হাতের মোয়া খাওয়ার মত নয়। তাই অতি অল্প সংখ্যক মানুষই কামিয়াব হতে পারে, তথা সিদ্ধিলাভ করতে পারে, তথা কামালিয়াত হাসিল করতে পারে। তাই পবিত্র কোরান বলছে যে, যাকে হেকমতের জ্ঞানদান করা হয় তাকে যথেষ্ট রহমত তথা কল্যাণ দান করা হয়।

সুফী মতে বিতাড়নের উপায়

১. জিকিরুল্লাহ (আল্লাহর স্মরণ)
  • প্রতিনিয়ত আল্লাহর নাম স্মরণ করলে হৃদয় আলোকিত হয় এবং শয়তান দূরে সরে যায়।
  • সুফী তরিকার লোকেরা নির্দিষ্ট নিয়মে জিকির করেন—যেমন "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ", "আল্লাহু", "হু"।
  • জিকির উচ্চারণের সঙ্গে হৃদয়ের একাগ্রতা গুরুত্বপূর্ণ।
২. তাজকিয়া (আত্মার পরিশুদ্ধি)
  • আত্মাকে লালসা, হিংসা, অহংকার, রাগ ইত্যাদি থেকে মুক্ত করার চেষ্টা।
  • নিয়মিত আত্মসমালোচনা, পাপের অনুশোচনা, এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে মনোযোগ।
৩. মুরাকাবা (আধ্যাত্মিক ধ্যানচর্চা)
নিজের আত্মাকে বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণ করা—এই জ্ঞানের আলোতে শয়তানি প্রভাব ধরা পড়ে।
"আল্লাহ আমাকে দেখছেন" এই চেতনায় ধ্যান করাই মুরাকাবার মূল।

৪. তাওবা ও ইস্তেগফার (ক্ষমা প্রার্থনা)
  • ভুল স্বীকার ও ক্ষমা চাওয়ার মধ্য দিয়ে আত্মা পরিশুদ্ধ হয়।
  • হৃদয় যত বেশি পরিশুদ্ধ হয়, শয়তানের প্রভাব তত দুর্বল হয়।
৫. রিয়াজত ও মুজাহাদা (আত্মসংযম ও কু-প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ)
  • নিজেকে নিয়ন্ত্রণের কঠোর অনুশীলন (যেমন—কম খাওয়া, কম কথা বলা, কম ঘুমানো, নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন)।
  • এই সাধনার মাধ্যমে নফস দুর্বল হয় এবং খান্নাসের আগ্রাসন কমে।
৬. সুফী পীর বা মুরশিদের দীক্ষা গ্রহণ
  • একজন আধ্যাত্মিক গাইড বা পীরের তত্ত্বাবধানে থাকলে আত্মিক পথের বিভ্রান্তি কমে।
  • পীর বা শায়েখ নিজের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের আলোতে মুরিদকে (অনুসারী) খান্নাসের পথ চিনিয়ে দেন।
  • পীর তথা গুরু ধরেই মোরাকাবা-মোশাহেদার পথেই এগিয়ে যেতে হয়। পীর তথা গুরুর আচার-আচরণের বিষয়টি এখানে মুখ্য নয়, বরং মুখ্য বিষয়টি হল কেমন করে নিজের ভেতর হতে খান্নাসরূপী শয়তানটিকে তাড়িয়ে দেওয়া যায়।
বাস্তবিক প্রয়োগের দিক
সাধারণভাবে খান্নাসের প্রভাব থেকে মুক্তি পেতে প্রতিদিনের জীবনে কিছু অভ্যাস গড়ে তোলার কথা সুফীরা বলেন:
  • ফজরের পর কিছু সময় নির্জনে জিকির করা।
  • রাতে ঘুমানোর আগে আত্মসমালোচনা করা: "আজ আমি কী ভালো করলাম? কোথায় আমি দুর্বল?"
  • কুরআন পাঠের সময় অন্তর দিয়ে ভাবা এবং বুঝে পড়া।
  • আল্লাহর প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে নফসের বিরুদ্ধে আত্মসংযমী হওয়া।
  • অহংকার ও আত্মপ্রশংসা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা।
সুফিবাদ বাকিতে বিশ্বাস করে না
সুফিবাদ বাকিতে পাবার কথাতে বিশ্বাস করে না; তথা মরে গেলে পাবে এ রকম উদ্ভট আজগুবি কথায় সুফিবাদ বিশ্বাস করে না। মহানবী হেরাগুহায় যে ধ্যানসাধনাটি করেছেন উহাতে নবুয়ত নগদই পেয়েছেন, বাকিতে নয়; পবিত্র কোরান নগদই পেয়েছেন, বাকিতে নয়; জিবরিল আমিনকে নগদই দেখেছেন, বাকিতে নয়। সুতরাং সুফিবাদ নগদ পাবার একটি মূল্যবান দর্শন। সুফিবাদ বলে যে, দুনিয়াতে যে অন্ধ আখেরাতেও সে অন্ধ থাকবে। হজরত বাবা বু আলী শাহ্ কালান্দার সরাসরি বলেছেন যে, আমার কথা মত মোরাকারা-মোশাহেদা কর মাত্র একশত বিশ দিন, তারপর দেখ সত্যের রহস্যের দর্শন পাও কি না। এই একশত বিশ দিনের ধ্যান-সাধনায় তুমি কামেল হবে না সত্যি, কিন্তু কামালিয়াতের কিছুটা রহস্য অবশ্যই বুঝতে পারবে। ধোঁয়া যেমন আগুনের কথা মনে করিয়ে দেয়, সে রকম একটানা একশত বিশ দিন মোরাকাবায় অবশ্যই রহস্যলোকের কিছুটা পরিচয় বুঝতে পারবে। বু আলী শাহ কালান্দার যদিও সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে মারেন নি, কিন্তু আশার আলোর কথাটি জানিয়ে দিলেন। এ রকম খাড়াধাড়া কথা খুব কম অলী বলে থাকেন। পবিত্র কোরানও একশত বিশটি দিন আপন দেহের মাঝে ভ্রমণ করার উপদেশ দিয়েছেন।

উপসংহার
সুফী মতে, খান্নাসরূপী শয়তানকে একমাত্র আধ্যাত্মিক সাধনা ও আল্লাহর প্রেম দিয়েই পরাজিত করা সম্ভব। শরীয়ত, তারিকত, হাকিকত এবং মারিফাত—এই চার স্তরের মাধ্যমে আত্মা পরিপূর্ণ হয় এবং শয়তান তার দেহে স্থান পায় না। এই পথ কঠিন হলেও ফল অত্যন্ত শান্তিময় ও চিরস্থায়ী।


 

No comments

Powered by Blogger.