Header Ads

শ্রীকৃষ্ণ যেভাবে জন্ম নিলেন

হিন্দু ধর্মে ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে বিষ্ণু পুরণের অষ্টম অবতার হিসেবে পূজা করা হয়। তাঁর জন্ম একটি অলৌকিক ও মহাজাগতিক ঘটনাবলী যা পাপ ও অন্যায়ের বিনাশ এবং ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য ঘটে।

ভগবদ্গীতা অনুসারে, কৃষ্ণ বা শ্রীকৃষ্ণ বিষ্ণুর অষ্টম অবতার। সনাতন ধর্মের বিশ্বাস অনুসারে তাঁকে স্বয়ং ভগবান এবং বিষ্ণুর পূর্ণাবতারও মনে করা হয়। গীতায় বলা হয়েছে যে, অধর্ম ও দুর্জনের বিনাশ এবং ধর্ম ও সজ্জনের রক্ষার জন্য তিনি যুগে যুগে পৃথিবীতে আগমন করেন এবং কৃষ্ণের এই আগমন ঘটে কখনো মানুষ, কখনো বা মানবেতর প্রাণির রূপে। একেই বলা হয় অবতার।

১. পটভূমি

কংস ছিল মথুরার স্বৈরাচারী রাজা, যিনি তাঁর নিজের বোন দেবকী ও তাঁর স্বামী ভাসুদেবকে কারাগারে বন্দী করে রাখেন। কংসের বোন দেবকীর অষ্টম সন্তানের হাতে নিজের বিনাশের দৈববাণী শুনে সে সর্বদাই আতঙ্কে থাকত। ফলে সে তার বোনের গর্ভে সদ্যভূমিষ্ট প্রতিটি সন্তানকেই নৃশংসভাবে হত্যা করত। 

২. ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্ম

একদিন দেবকীর গর্ভে শ্রীকৃষ্ণের অবতার শুরু হয়। জন্মের সময়, কারাগারের চারপাশ অন্ধকারে ঢেকে যায় এবং প্রাকৃতিক ঘটনাবলি ঘটে। দেবী ধরিত্রী থেকে বৃষ্টি হয়, এবং ভূমিকম্পের শব্দ শোনা যায়। দেবকীর কষ্টময় প্রসব যন্ত্রণার সময় ভাসুদেব তাঁর সদ্যজাত পুত্রকে নিয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে যমুনা নদীর পাড়ে পৌঁছান। সবশেষে অধর্মের বিনাশ ঘটাতে জন্ম হয় কৃষ্ণের। 

৩. যমুনা পারাপার ও গোপীগণের কাছে

যমুনার প্রবাহ স্বয়ংশ্চ বন্ধ হয়ে যায় যেন ভাসুদেব নির্বিঘ্নে নদী পার হতে পারেন। ভাসুদেব গোকুলে পৌঁছে নবজাতক শ্রীকৃষ্ণকে গোপী নন্দ ও যশোদের কাছে রেখে আসেন। শিশুটিকে দেবী যশোদা ও নন্দবাবুর পোষ্যের জন্য হস্তান্তর করা হয়। তার প্রাণরক্ষার্থে ভগবান বিষ্ণুর নির্দেশ অনুসারে বাসুদেব কৃষ্ণপক্ষের সেই দুর্বার প্রলয়ের রাতে সদ্যভূমিষ্ট সন্তানকে মা যশোদার কাছে রেখে আসেন। পাশাপাশি মা যশোদার কন্যাকে নিয়ে আসেন।

এদিকে দেবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তানের ভুমিষ্ঠ হওয়ার সংবাদ পেয়ে কংস ছুটে আসেন কারাগারে। তারপর যখনই সেই কন্যা সন্তানকে আছাড় মারার উদ্দেশ্যে ঊর্ধ্বে তুলে ধরলেন, তখনই সেই কন্যা মহাশূন্যে ভাসতে ভাসতে বললেন, ‘কংস, তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে!’ এই কন্যাসন্তান ছিলেন স্বয়ং দেবী যোগমায়া।

তার পর থেকেই আমাদের সমাজে যে কোনো অন্যায়কারী ও অপশাসককে উদ্দেশ করে বলা হয়, ‘তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে!’ এটা আমাদের দেশের একটি জনপ্রিয় প্রবচন।

৪. দেবকী ও কংসের প্রতিক্রিয়া

কারাগারে ফেরার পর দেবকী দেখতে পান তাঁর সন্তানটি হারিয়ে গেছে। এই সময়েই জন্ম নেয় দেবকীর অষ্টম সন্তান — বলরাম, যাকে ভাসুদেবের অন্য স্ত্রী রোহিনী জন্ম দেন। কংস জানতে পারেন শ্রীকৃষ্ণ বেঁচে আছেন, তখন থেকে তিনি শ্রীকৃষ্ণকে হত্যার জন্য নানা পরিকল্পনা করেন।

কৃষ্ণের সন্ধান না পাওয়ায় রাজা কংস কুখ্যাত পুতনা রাক্ষসীকে ছয়মাস বয়সী সব শিশুকে হত্যার আদেশ দেন। রাজা কংসের নির্দেশমতো রাক্ষসী পুতনা বিষাক্ত স্তন পান করানোর ছলে একের পর এক শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করতে থাকে। অবশেষে যখন পুতনা কৃষ্ণের সন্ধান পান এবং তাকে স্তন পান করাতে যান, তখন মাত্র ছয়মাস বয়সেই কৃষ্ণ স্তনপানের মাধ্যমে সব বিষ শুষে নিয়ে পুতনার প্রাণনাশ করেন। এরপর একে একে তিনি কালীয়া নাগ, রাজা কংসসহ জগতের নানা দুষ্টকে তাঁর অসীম লীলার মাধ্যমে নিঃশেষ করেন।

৫. শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকা

শ্রীকৃষ্ণ তাঁর কৈশোর থেকে শুরু করে যুবক অবস্থায় বহু অলৌকিক কাজ করেন, যেমন কালিয়নাগ নামক বিষধর সাপকে মারার কাহিনী, গোবর্ধন পাহাড় ধরা, এবং অবশেষে কংসের আত্মসমর্পণ ও ধ্বংস। শ্রীকৃষ্ণ ধর্ম ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছিলেন।

উপসংহার

শ্রীকৃষ্ণের জন্ম কাহিনী আমাদের শেখায় জীবনে পাপ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হবে এবং ধর্ম-নীতির পথে চলতে হবে। তিনি মানবজীবনে শান্তি, ভালোবাসা এবং সততা প্রতিষ্ঠার এক অনন্য প্রতীক। ভগবদ্গীতায় ভগবান কৃষ্ণ মন্দের বিরুদ্ধে জয়ের প্রতীক। তিনি উল্লেখ করেছেন, যখনই পৃথিবীতে মন্দের উত্থান ঘটে এবং ধর্মের অবনতি ঘটে, তখন তিনি মন্দের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য পুনর্জন্ম লাভ করবেন এবং মানুষকে সঠিক পথে নিয়ে যাবেন। জন্মাষ্টমী অশুভের উপর শুভবুদ্ধির জয় হিসাবে পালিত হয়।




No comments

Powered by Blogger.