ইয়াজুজ–মাজুজের কাহিনি
কুরআনে ইয়াজুজ–মাজুজ:
কুরআনে ইয়াজুজ–মাজুজের কাহিনির উল্লেখ এসেছে ধুনুক পর্বতের (জবাল-আছ-সালাসী) কাছাকাছি এক সুরঙ্গের মধ্যে। হযরত দুল-কারনাইন (আঃ) নামে একজন শাসক তাদের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী বাধা তৈরি করেছিলেন। তাঁর শাসনকালে, ইয়াজুজ–মাজুজের এই দানবীয় জাতি পৃথিবী জুড়ে ভয়ঙ্কর অশান্তি সৃষ্টি করেছিল। তারা এমন একটি জাতি ছিল, যারা অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক ছিল এবং তাদের দ্বারা অন্যদের জন্য অশান্তি সৃষ্টি হচ্ছিল।
কোরআনে আছে, ‘সে (জুলকারনাইন) বলল, আমার প্রতিপালক আমাকে যে ক্ষমতা দিয়েছেন, তা-ই যথেষ্ট। সুতরাং তোমরা আমাকে শ্রম দিয়ে সাহায্য করো, আমি তোমাদের ও তাদের মাঝখানে এক মজবুত প্রাচীর গড়ে দেব। তোমরা আমার কাছে লোহার তাল নিয়ে আসো। তারপর মধ্যবর্তী ফাঁকা জায়গা পূর্ণ হয়ে যখন লোহার ঢিবি দুটি পাহাড়ের সমান হলো, তখন জুলকারনাইন বলল, তোমরা হাপরে দম দিতে থাকো। যখন তা আগুনের মতো গরম হলো, তখন সে বলল, তোমরা গলানো তামা নিয়ে আসো, আমি তা ওর ওপর ঢেলে দেব। এরপর ইয়াজুজ-মাজুজ তা পার হতে পারল না বা ভেদ করতেও পারল না। জুলকারনাইন বলল, এ আমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ। যখন আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হবে, তখন তিনি তাদের চূর্ণবিচূর্ণ করে দেবেন, আর আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি সত্য। সেদিন আমি (আল্লাহ) তাদের দলে দলে তরঙ্গের আকারে ছেড়ে দেব, আর শিঙায় ফুঁ দেওয়া হবে। তারপর আমি তাদের সবাইকে একত্র করব।’ (সুরা কাহাফ, আয়াত: ৯৩-৯৯)
কুরআনে (সূরা আল-কালম ১৮:৯৪-৯৫) বলেছে: "তখন [দুল-কারনাইন] বললেন, ‘এটা আমার কাছে যা কিছু ছিল, তা দিয়ে আমি তোমাদের জন্য এ বাধাটি তৈরি করব।’ এবং তারা সেগুলো তৈরির পরে, তারা প্রমাণিত করল যে, ইয়াজুজ-মাজুজ তাদের পিছনে সীমাবদ্ধ রয়ে গিয়েছে।"
হাদীসে ইয়াজুজ–মাজুজ:
হাদীসসমূহে ইয়াজুজ-মাজুজের কাহিনি আরও বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। প্রখ্যাত হাদীস বর্ণনায় এসেছে, যে সময়ে ইয়াজুজ-মাজুজ বের হবে, পৃথিবী ভারী বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে। তাঁরা প্রচণ্ড শক্তিশালী এবং গণনা করা যায় এমন সীমাহীন সংখ্যক লোক হতে পারে। তারা পৃথিবীকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাবে।
হাদীসের মধ্যে উল্লেখিত ইয়াজুজ–মাজুজের অবস্থা:
তারা মানুষের জন্য এক অবর্ণনীয় বিপদ সৃষ্টি করবে।
এক দিনে একাধিক দেশ দখল করতে পারবে।
তাজা পানি ও খাদ্য সম্পদ নষ্ট করে ফেলবে।
বিশেষভাবে তারা মদিনা এবং মক্কাকে ঘেরাও করবে।
ইয়াজুজ–মাজুজের মুক্তি:
হাদীসে আরও বলা হয়েছে, ইয়াজুজ–মাজুজের মুক্তি কিয়ামতের একটি বড় নিদর্শন হবে। তারা এক সময় এই বাঁধা (যেটি দুল-কারনাইন নির্মাণ করেছিলেন) পার হয়ে পৃথিবীজুড়ে অশান্তি সৃষ্টি করতে শুরু করবে।
নবী (সা.) বলেছিলেন যে, ইয়াজুজ-মাজুজ যখন বের হবে, তখন তারা সবচেয়ে দ্রুত গতিতে পৃথিবী জুড়ে ধ্বংস করবে।
ইয়াজুজ–মাজুজের প্রকৃতি ও অবস্থান
ইয়াজুজ-মাজুজ দুটি জাতি বা গোষ্ঠী যারা বর্ণিত হয়েছে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও মিথবিজ্ঞানী সংবেদনশীল কাহিনিতে। তবে ইসলামী ব্যাখ্যায় এই জাতি পৃথিবীর এক অজানা স্থানে বাস করে এবং সেগুলো কঠোর বাধার মধ্যে আছেঃ
স্থান: ইয়াজুজ–মাজুজের অবস্থান সঠিকভাবে নির্ধারণ করা যায় না, তবে কুরআন এবং হাদীসে তা একটি দুর্গম পাহাড়ী এলাকায় বা ভূগর্ভস্থ অঞ্চলে অবস্থান করছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলামী ঐতিহ্যে দুল-কারনাইন নামক এক শাসক তাদের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী বাঁধ বা বাধা তৈরি করেছিলেন, যা আজও তাদের অগ্রসর হতে বাধা দেয়।
সেনা বাহিনী: ইয়াজুজ–মাজুজের বাহিনী প্রচুর সংখ্যক এবং অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক। তাদের সংখ্যা এতটাই বেশি যে, তাদের কর্মকাণ্ড পৃথিবীজুড়ে তীব্র অশান্তি ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি করবে।
দুল-কারনাইন এবং বাঁধ
ইসলামী ঐতিহ্যে দুল-কারনাইন (যাকে কিছু মুসলিম ঐতিহাসিকেরা আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটও মনে করেন) একজন মহান শাসক ছিলেন, যিনি বিশ্বের নানা প্রান্তে তাঁর শাসন বিস্তার করেছিলেন। এক সময় তিনি ইয়াজুজ–মাজুজের আস্তানা আবিষ্কার করেন, যারা মানব জাতির জন্য বিপদজ্জনক ছিল।
দুল-কারনাইন যখন তাদের শক্তির ব্যাপারে জানলেন, তখন তিনি আল্লাহর সাহায্য নিয়ে তাদের থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য একটি বিশাল বাধা বা বাঁধ তৈরি করেছিলেন। কুরআনে (সূরা আল-কালম, ১৮:৯৩–৯৮) বলা হয়েছে:
"তবে তারা দেয়ালের ওপাশে যেতে পারেনি, তারা কিছুই করতে পারেনি।"
এই বাঁধটি তাদের অগ্রসর হতে বাধা দেয়, কিন্তু কিয়ামতের পূর্বে আল্লাহর ইচ্ছায় এই বাধা ভেঙে যাবে এবং তারা পৃথিবীতে ধ্বংস ও বিপর্যয় সৃষ্টি করবে।
ইয়াজুজ–মাজুজের মুক্তি এবং কিয়ামত
ইয়াজুজ-মাজুজ সম্প্রদায় আদম (আ.)-এর বংশধর। শাসক জুলকারনাইন ইয়াজুজ-মাজুজদের প্রাচীর দিয়ে আটকে রেখেছেন (সুরা কাহাফ, আয়াত ৯২-৯৭)। কিয়ামতের আগে হজরত ঈসা (আ.)-এর পৃথিবীতে পুনরাগমনের সময় তারা ওই প্রাচীর ভেঙে বেরিয়ে আসবে এবং সামনে যা পাবে, সব ভক্ষণ করবে। ইসলামি আখিরাতের ধারণা অনুসারে, ইয়াজুজ–মাজুজ কিয়ামতের চূড়ান্ত সময়ে মুক্তি পাবে এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করবে। হাদীসে তাদের মুক্তি সম্পর্কে বর্ণনা রয়েছে:
হাদীসের বর্ণনা: নবী (সা.) বলেছেন:
"ইয়াজুজ-মাজুজ যখন বের হবে, তারা পুরো পৃথিবী জুড়ে অশান্তি ও হিংসা সৃষ্টি করবে। তারা এমনভাবে পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে পড়বে, যা অদেখা।"
তাদের বিপদ: তাদের আগমনের সময় তারা শুধু ধ্বংসাত্মক কাজ করবে না, বরং তারা সমস্ত জলাধার, ফসল এবং সম্পদ নষ্ট করবে। পুরো পৃথিবী বিপর্যস্ত হবে।
হযরত ঈসা (আঃ)-এর আগমন
ইয়াজুজ–মাজুজের দ্বারা পৃথিবী ধ্বংসের শিকার হওয়ার পর, হযরত ঈসা (আঃ) পুনরায় পৃথিবীতে আগমন করবেন। ঈসা (আঃ)-এর আগমনের উদ্দেশ্য হবে ইয়াজুজ-মাজুজকে ধ্বংস করা এবং পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। হাদীস থেকে জানা যায়: "ইয়াজুজ-মাজুজ যখন পৃথিবীজুড়ে অশান্তি সৃষ্টি করবে, তখন হযরত ঈসা (আঃ) তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন এবং আল্লাহর রহমতে তাদেরকে ধ্বংস করবেন।" (সহীহ মুসলিম)
ঈসা (আঃ)-এর আগমন: নবী (সা.) বলেছেন: "যখন ইয়াজুজ-মাজুজ বের হবে, তখন ঈসা (আঃ) তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করবেন এবং আল্লাহর সাহায্যে তাদের ধ্বংস করবেন।"
ঈসা (আঃ)-এর বিজয়: ঈসা (আঃ) পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করবেন এবং ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য একটি বিশাল কর্মসূচি গ্রহণ করবেন। তিনি তাদের ধ্বংসের পর, পৃথিবী পুনরায় শান্তিপূর্ণ এবং সুশৃঙ্খল হবে।
ইয়াজুজ–মাজুজ এবং শেষ সময়
ইয়াজুজ–মাজুজের কাহিনি কিয়ামতের সবচেয়ে বড় নিদর্শনগুলোর একটি হিসেবে ইসলামে উল্লেখিত হয়েছে। তাদের মুক্তি এবং ঈসা (আঃ)-এর আগমন একটি বৃহৎ দ্বিতীয় জীবন এবং পুনরুত্থানের সূচনা হিসেবে গণ্য করা হয়। ইয়াজুজ-মাজুজ নদীর পানি খেয়ে শেষ করে ফেলবে। তাদের সঙ্গে কেউ লড়াই করে পারবে না। একসময় তারা বায়তুল মুকাদ্দাসের এক পাহাড়ে গিয়ে বলবে, দুনিয়ায় যারা ছিল, তাদের হত্যা করেছি। এখন আকাশে যারা আছে, তাদের হত্যা করব। তারা আকাশের দিকে তির নিক্ষেপ করবে। এ সময় ঈসা (আ.) তাদের জন্য দোয়া করবেন। এতে ইয়াজুজ-মাজুজের কাঁধের দিক থেকে একপ্রকার পোকা সৃষ্টি করে আল্লাহ তাদের ধ্বংস করবেন। পৃথিবীজুড়ে তাদের লাশ পড়ে থাকবে। আল্লাহ নখযুক্ত পাখি পাঠিয়ে লাশগুলোকে সরিয়ে নেবেন। (বুখারি ও মুসলিম)
ভয়াবহ পরিস্থিতি: তাদের আগমনের পর, পৃথিবীকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে এবং মানুষকে বিপদে ফেলতে তারা দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়বে। আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী, তাদের কর্মকাণ্ড পৃথিবীজুড়ে ভয়াবহ বিপর্যয় সৃষ্টি করবে।
ঈসা (আঃ) এর সাথে সংযোগ: ঈসা (আঃ)-এর আগমনের পর, আল্লাহ তাদের ধ্বংস করবেন, এবং পৃথিবী পুনরায় শান্তিপূর্ণ এবং সুশৃঙ্খল হবে।
উপসংহার:
ইয়াজুজ–মাজুজের কাহিনি ইসলামের শেষ সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ আংশিক ঘটনা। কিয়ামতের পূর্বে তাদের আগমন পৃথিবীতে বিশাল বিপর্যয় এবং অশান্তি সৃষ্টি করবে, এবং এর পরপরই হযরত ঈসা (আঃ)-এর আগমন হবে, যিনি আল্লাহর সাহায্যে ইয়াজুজ-মাজুজকে ধ্বংস করবেন এবং পৃথিবীকে শান্তি ও সুশৃঙ্খলতা ফিরিয়ে দেবেন। ইয়াজুজ-মাজুজের কাহিনি ইসলামের শেষ সময় সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ আখ্যান। এটি কিয়ামতের পূর্বের চিহ্ন হিসেবে মুসলিম সমাজে বিবেচিত, এবং একদিকে মানুষের জন্য সতর্কতা এবং শিক্ষা, অন্যদিকে আল্লাহর শক্তি ও বিচার প্রতিফলিত হয়। ইয়াজুজ-মাজুজের বিপর্যয় এবং ঈসা (আঃ)-এর বিজয় পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করবে, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহান উপহার হিসেবে আসবে।

No comments