কোরআনের আলোকে বিয়ের কিছু বিধান
ইসলাম বিয়েকে একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। কোরআনের আলোকে বিয়ে কেবল একটি সামাজিক চুক্তি নয় — বরং এটি দায়িত্ব, দয়া, প্রেম, নিরাপত্তা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির পথ।
ইসলামের আগেও একাধিক নারীকে বিয়ের প্রচলন ছিল, তবে স্ত্রীর সংখ্যা সুনির্দিষ্ট ছিল না। ইসলাম ও সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেয় এবং কিছু কঠোর শর্ত আরোপ করে। বস্তুত কড়ায়–গন্ডায় হিসাব করে শর্তগুলো মেনে চলা এতই দুরূহ যে প্রকৃতপক্ষে এক স্ত্রীর সংসারই নিরাপদ। নইলে আল্লাহর দেওয়া শর্ত যেকোনো সময় লঙ্ঘন ফেলার আশঙ্কা থাকে।
জাহিলিয়া যুগে আরবে অবাধে বহুসংখ্যক বিয়ে করার প্রচলন ছিল। চারটি পর্যন্ত বিয়ে করার অনুমতি দেওয়া হলেও একটির বেশি বিয়ে করা শর্তসাপেক্ষ করা হয়েছে, যাতে স্ত্রীদের মধ্যে সুবিচার করতে পারার ব্যাপারে কোনো ভেদ না ঘটে।
১. বিয়ে একটি মহান সুন্নাহ ও আল্লাহর নির্ধারিত নিয়ম: “তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত, তাদের বিবাহ দাও...” [সূরা আন-নূর: ২৪:৩২]
ইসলাম বিয়েকে একটি পবিত্র ও মানবিক বন্ধন হিসেবে দেখায়, যা নৈতিকতা, আত্মিক প্রশান্তি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা আনে।
২. বিয়ের উদ্দেশ্য: আত্মিক প্রশান্তি ও ভালোবাসা: “তাঁর নিদর্শনের মধ্যে একটি হলো, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন...” [সূরা আর-রূম: ৩০:২১]
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কেবল দৈহিক নয়, বরং এটি ভালোবাসা, করুণা ও শান্তির ভিত্তিতে গঠিত।
৩. মুশরিক বা কুফরকারী নারী-পুরুষদের সঙ্গে বিবাহ নিষিদ্ধ: “তোমরা মুশরিক নারীদের বিয়ে করো না যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে...” [সূরা আল-বাকারা: ২:২২১]
ঈমান ছাড়া বৈবাহিক সম্পর্ক টেকসই হয় না এবং তা একজন মুসলিমের দীনী জীবনকে বিপন্ন করতে পারে।
৪. মহিলা ও পুরুষের সম্মতি ছাড়া বিয়ে বৈধ নয়: “তোমরা তাদেরকে জোর করে দাম্পত্যে বাধ্য করো না...” [সূরা আন-নূর: ২৪:৩৩]
কোরআনে সরাসরি বলা হয়েছে, কাউকে জোর করে বিবাহে বাধ্য করা যাবে না।
৫. মাহর (মোহরানা) দেওয়া ফরজ (আবশ্যিক): “তোমরা নারীদের মোহর (মাহর) খুশি মনে দাও...” [সূরা আন-নিসা: ৪:৪] “...আর যখন তোমরা নারীদের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হও, তখন তাদের মোহর নির্ধারণ করো…” [সূরা আন-নিসা: ৪:২৪]
মাহর হলো বিয়েতে স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীর জন্য নির্ধারিত সম্মানী উপহার, যা সে নিজ ইচ্ছায় গ্রহণ করে।
৬. বিয়ের আগে চরিত্র ও ধর্মীয়তা বিবেচনা করতে হবে: “সৎচরিত্রের নারী পুরুষের জন্য এবং সৎচরিত্রের পুরুষ নারী জন্য...” [সূরা আন-নূর: ২৪:২৬]
নৈতিকতা, তাকওয়া ও দীনদারি বিবাহের ক্ষেত্রে প্রধান বিবেচ্য হওয়া উচিত।
৭. রক্ষিতা বা অবৈধ সম্পর্ক নিষিদ্ধ: “তারা ব্যভিচার করে না, আর না গোপন বন্ধুত্ব স্থাপন করে...” [সূরা আন-নিসা: ৪:২৫]
ইসলাম চায় বৈধ বিবাহের মাধ্যমে সম্পর্ক স্থাপিত হোক, অবৈধ মেলামেশা পুরোপুরি হারাম।
৮. একাধিক স্ত্রী গ্রহণের শর্ত (ন্যায়বিচার): “...তোমরা যদি ন্যায়বিচার করতে না পারো, তাহলে একজনই যথেষ্ট...” [সূরা আন-নিসা: ৪:৩]
একাধিক স্ত্রী রাখার অনুমতি থাকলেও শর্ত হলো: সকল স্ত্রীর প্রতি সমান আচরণ ও ইনসাফ করা।
৯. বিয়েতে পাত্র-পাত্রীর সম্মতি অপরিহার্য:
ইসলামে বিবাহের জন্য পাত্র ও পাত্রীর পূর্ণ সম্মতি ও ইচ্ছা থাকা আবশ্যক। কোরআনে বলা হয়েছে কাউকে ‘বাধ্য করা’ যাবে না।
১০. বিবাহ একটি ইবাদত ও সামাজিক দায়িত্ব:
বিয়ে শুধুই সম্পর্ক বা চুক্তি নয়, এটি একটি ইবাদত ও দ্বীনের অর্ধেক পূর্ণ করার উপায়।
১১. বিয়ে গোপনে নয়, জনসমক্ষে হওয়া উচিত (ঘোষণা):
🔹 যদিও কোরআনে সরাসরি বিয়ের ঘোষণার কথা নেই, তবে হাদীসে বিয়েকে জনসমক্ষে ঘোষণার কথা বলা হয়েছে। কোরআন থেকেও স্পষ্ট হয়, নিকাহকে গোপন না রেখে প্রকাশ্য করা উত্তম।
🔹 এটি ইঙ্গিত করে বিয়ের স্বচ্ছতা ও সামাজিক স্বীকৃতি জরুরি।
১২. স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে দায়িত্ব ও অধিকার নির্ধারণ: “পুরুষেরা নারীদের অভিভাবক, কারণ আল্লাহ তাদের এককে অন্যের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং তারা তাদের অর্থ ব্যয় করে...” [সূরা আন-নিসা: ৪:৩৪]
🔹 স্বামী হচ্ছেন পরিবারের প্রধান, যিনি স্ত্রীর নিরাপত্তা, খাদ্য, বাসস্থান ও মৌলিক চাহিদা পূরণের দায়িত্ব নেন।
🔹 স্ত্রীকে স্বামীর অধিকার ও সম্মান রক্ষা করতে বলা হয়েছে।
১৩. স্ত্রীর সঙ্গে সদ্ব্যবহার ফরজ: “তোমরা নারীদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করো...” [সূরা আন-নিসা: ৪:১৯]
🔹 কোরআন স্বামীকে পরিষ্কারভাবে স্ত্রীর প্রতি দয়া ও শ্রদ্ধার সাথে চলার নির্দেশ দিয়েছে। নারীদের সঙ্গে সদাচরণ এবং পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে তাদের অংশসংক্রান্ত আলোচনার পর ওই সব নারীর আলোচনা করা হয়েছে, আত্মীয়তা, বৈবাহিক বা দুধসম্পর্কের কারণে যাদের বিয়ে করা হারাম। (সুরা নিসা আয়াত: ২৩-২৪)
১৪. কাউকে জোর করে তালাক দেওয়া বা আটকে রাখা নিষিদ্ধ: “তোমরা যদি তাদেরকে (নারীদের) অপছন্দ করো, তবুও হতে পারে, তোমরা যা অপছন্দ করো, আল্লাহ তাতে অনেক কল্যাণ রেখেছেন।” [সূরা আন-নিসা: ৪:১৯]
🔹 স্ত্রীর প্রতি ঘৃণা বা অবিচারের ভিত্তিতে তালাক বৈধ নয়; ধৈর্য, পরামর্শ এবং সমাধানের পথ খোলা রাখতে বলা হয়েছে।
১৫. বিয়েতে পরিবার ও অভিভাবকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ: “তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত, তাদের বিবাহ দাও…” [সূরা আন-নূর: ২৪:৩২]
🔹 কোরআনে নারীর অভিভাবক বা ‘ওয়ালি’র সম্মতি নেওয়ার বিষয়টি প্রচ্ছন্নভাবে রয়েছে — তারা যেন যথাযথ পাত্র নির্বাচন করে।
১৬. বিয়ের মাধ্যমে পবিত্রতা বজায় রাখা: “তারা তাদের যৌন অঙ্গ সংযত রাখে, শুধুমাত্র তাদের স্ত্রী অথবা মালিকানাধীন দাসীদের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়…” [সূরা আল-মু’মিনূন: ২৩:৫–৬]
🔹 ইসলাম বিয়েকে একমাত্র বৈধ উপায় হিসেবে নির্দেশ দিয়েছে দেহমিলনের জন্য।
১৭. স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের জন্য ‘লিবাস’ বা আবরণ: “তারা তোমাদের জন্য পোশাক, আর তোমরা তাদের জন্য পোশাক।” [সূরা আল-বাকারা: ২:১৮৭]
🔹 এখানে বোঝানো হয়েছে, স্বামী-স্ত্রী একে অপরের দোষ ঢেকে দেয়, আত্মিক প্রশান্তি দেয় এবং নিরাপত্তার উৎস হয়।
১৮. নারীর সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করার নির্দেশ: “আর তোমরা নারীজাতির সঙ্গে অপছন্দ হলেও সুন্দর ব্যবহার করো...” [সূরা আন-নিসা: ৪:১৯]
🔹 ইসলাম নারীকে শুধুমাত্র বিবাহের বস্তু বানায়নি, বরং মর্যাদা, সম্মান ও স্বীকৃতি দিয়ে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে।
১৯. তালাক দেওয়ার সময়ও ন্যায়বিচার ও সম্মানের সাথে: “তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সম্মানের সঙ্গে তালাক দাও এবং তাদের কষ্ট দিয়ো না...” [সূরা আত-তালাক: ৬৫:২]
🔹 কোরআন তালাককে হালকা মনে করতে নিষেধ করে দিয়েছে; সম্মান বজায় রেখে তা সম্পন্ন করতে বলা হয়েছে।
২০. বিয়ের উদ্দেশ্য কেবল দেহগত সুখ নয়, বরং দীন প্রতিষ্ঠা:
🔹 একজন স্বামী বা স্ত্রী একে অপরের দীন প্রতিষ্ঠার সাথী — পরস্পরের পূর্ণতা ও জান্নাতের পথে সহযাত্রী।
উপসংহার (সারাংশ): ইসলামে বিয়ে একটি পবিত্র বন্ধন, যা আল্লাহর বিধানে পরিচালিত হয়। কোরআনের আলোকে বিয়ের মাধ্যমে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে শান্তি, নিরাপত্তা এবং নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা পায়। এটি দাম্পত্য জীবনের জন্য শুধু বৈধতা নয়, বরং আধ্যাত্মিক সফলতার পথ।
.jpg)
No comments