Header Ads

মীলাদ শরীফ-কিয়াম শরীফ

মীলাদ শরীফ কী?

মীলাদ শরীফ (মাওলিদুন নবী) হলো প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র জন্মদিন উদযাপন। মুসলমানগণ মহান এই দিনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ভক্তি প্রদর্শন করে থাকেন। এই দিনে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত, নাতে রাসূল (সা.) পাঠ, তাঁর জীবনী আলোচনা এবং দোয়া মাহফিল আয়োজন করা হয়। এটি এক প্রকার ভালোবাসার প্রকাশ এবং রাসূলের (সা.) প্রতি আনুগত্যের প্রতীক

সুফি ধারায় মীলাদ শরীফ পালন করা হয় হৃদয়ের গভীর থেকে নবীজির প্রতি প্রেম শ্রদ্ধা প্রকাশের মাধ্যমে এটি কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয় বরং এটি এক আত্মিক মিলনযেখানে নফস পরিশুদ্ধ হয় নবীজির স্মরণে এই অনুষ্ঠানে:

·         দুরুদ সালাম পাঠ করা হয় বহুবার

·         কাসিদা, হামদ নাতে রাসূল পরিবেশিত হয়

·         প্রিয় নবী (সা.)-এর শানে গাওয়া হয় 'কওয়ালী' (বিশেষ করে ভারত পাকিস্তানে)

·         তাঁর জীবন, গুণাবলি আধ্যাত্মিক শিক্ষা নিয়ে আলোচনা হয়

মীলাদ শরীফ পালন কেন গুরুত্বপূর্ণ?

প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ এবং তাঁর আদর্শ অনুসরণের অঙ্গীকার নবায়নের একটি অনন্য সুযোগ এটি। এই আয়োজন তরুণ প্রজন্মকে ইসলামের মহান আদর্শ ইতিহাস সম্পর্কে অবগত করে

মীলাদ শরীফ-কিয়াম শরীফ নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের যামানাতেই ছিল মীলাদ শব্দের অর্থ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ছানা-ছিফত করা তাঁর প্রতি ছলাত-সালাম পাঠ করা অতএব, তা আল্লাহ পাক তাঁর রসূল হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামসহ সবারই সুন্নতের অন্তর্ভুক্তআমরা যেভাবে মজলিস করে মীলাদ মাহফিল করে থাকি তা খোদ আল্লাহ পাক-এর হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুগণের যামানাতেই ছিল

কিয়াম শরীফ কী?

কিয়াম শব্দের অর্থ দাঁড়ানো। কিয়াম শরীফ হলো একটি বিশেষ আধ্যাত্মিক রীতিনীতি, যেখানে উপস্থিত মুসলমানগণ দাঁড়িয়ে প্রিয় নবীর (সা.) আগমনের মুহূর্ত স্মরণ করেন। এটি সাধারণত মীলাদ শরীফের শেষ অংশে অনুষ্ঠিত হয়। কিয়ামের সময় সবাই দাঁড়িয়ে নবীজির (সা.) জন্য দুরুদ শরীফ পাঠ করে থাকেন এবং তাঁর আগমনের প্রতি ভক্তি প্রদর্শন করেন

সুফিদের মতে, কিয়াম শরীফ হলো এক সম্মানজনক মুহূর্ত, যখন দাঁড়িয়ে নবীজির আত্মিক আগমনকে স্বাগত জানানো হয় অনেক সুফি তরিকা বিশ্বাস করেন, এই সময় নবীজির রুহানিয়াত উপস্থিত থাকেন কিয়ামের সময় সবাই দাঁড়িয়ে "মুহাম্মাদ (সা.) এসেছেন!" – এই অনুভূতির সাথে দুরুদ পাঠ করেনসুফি বিশ্বাস:যেখানে রাসূলুল্লাহর নাম নেয়া হয়, সেখানে তাঁর নূর উপস্থিত হয়।

ইসলামী ইতিহাসে গুরুত্ব

মীলাদ কিয়াম শরীফ শত শত বছর ধরে মুসলিম সমাজে পালন হয়ে আসছে। বিশেষ করে সুফি ধারার অনুসারীরা এগুলোকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে পালন করে থাকেন। কিয়াম শরীফের সময়মোহাম্মদ (সা.) এসেছেনএই চেতনায় সবার মধ্যে আবেগ ভক্তি জাগ্রত হয়

হাদীছ শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি একদা তাঁর নিজ গৃহে সমবেত ছাহাবীগণকে আল্লাহ পাক-এর হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিলাদত শরীফ-এর ঘটনাসমূহ শুনাচ্ছিলেন। এতে শ্রবণকারীগণ আনন্দ খুশী প্রকাশ করেছিলেন এবং আল্লাহ পাক-এর প্রশংসা তথা তাছবীহ তাহলীল পাঠ করছিলেন এবং আল্লাহ পাক-এর হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর (ছলাত-সালাম) দুরূদ শরীফ পাঠ করছিলেন। এমন সময় হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তথায় উপসি হলেন। (তিনি যখন উপসি হলেন, সমবেত লোকজন দাঁড়িয়ে অর্থাৎ ক্বিয়াম শরীফ করে ছলাত সালাম পেশ করতঃ আসনে বসালেন) তিনি লোকজনের মীলাদ শরীফ পাঠের অনুষ্ঠান দেখে তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “তোমাদের জন্য আমার শাফায়াত ওয়াজিব। (সুবুলুল হুদা ফি মাওলিদে মোস্তফা ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, হাক্বীক্বতে মুহম্মদী মীলাদে আহমদী, পৃষ্ঠা ৩৫৫)

আরো ইরশাদ হয়েছে, হযরত আবূ দারদা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত আছে যে, একদা তিনি হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে হযরত আবূ আমের আনছারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর গৃহে উপসি হয়ে দেখতে পেলেন যে, তিনি তাঁর সন্তানাদি এবং আত্মীয়-স্বজন, জ্ঞাতী-গোষ্ঠী, পাড়া-প্রতিবেশীদেরকে রসূল পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিলাদত শরীফের ঘটনাসমূহ শুনাচ্ছেন এবং বলছেন, এই দিবস অর্থাৎ এই দিবসে রসূল পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যমীনে তাশরীফ এনেছেন। (তিনি যখন উপসি হলেন সমবেত লোকজন দাঁড়িয়ে কিয়াম শরীফ করে ছলাত সালাম পেশ করতঃ আসনে বসালেন।)

তিনি লোকজনের মীলাদ শরীফ পাঠের অনুষ্ঠান দেখে তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা তাঁর রহমতের দরজা তোমাদের জন্য উন্মুক্ত করেছেন এবং সমস্ত ফিরিস্তাগণ তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছেন এবং যে কেউ কিয়ামত পর্যন্ত তোমাদের মত এরূপ করবেন। তোমার মত সেও নাজাত ফযীলত লাভ করবে।” (কিতাবুত তানবীর ফী মাওলিদিল বাশীর ওয়ান নাযির, ছুবুলুল হুদা ফী মাওলিদে মোস্তফা ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)

কীভাবে উদযাপন করা হয়?

  • মসজিদ বা বাসায় আয়োজন: আলোকসজ্জা, ফুল দিয়ে সাজানো হয়
  • নাতে রাসূল দুরুদ পাঠ: বিভিন্ন বয়ানে নবীজির (সা.) জীবনী গুণাবলি বর্ণনা করা হয়
  • তবরুক বিতরণ: খাবার বিতরণ করা হয় মুসল্লিদের মাঝে
  • দোয়া মোনাজাত: মুসলিম উম্মাহর শান্তি সমৃদ্ধির জন্য দোয়া করা হয়

মীলাদ কিয়ামের সুফি দর্শন

  • ভক্তির প্রকাশ: শুধু জ্ঞানের মাধ্যমে নয়, ভালোবাসার মাধ্যমে আল্লাহর পথে চলাএটিই সুফিবাদ
  • রূহানিয়াত: মীলাদ কিয়াম হলো আত্মা পরিশুদ্ধ করার উপায়, যেখানে দুনিয়াবি আসক্তি ভুলে আত্মা আল্লাহ রাসূলের প্রেমে নিমগ্ন হয়
  • ওয়াসিলা: নবীজির প্রতি ভালোবাসা তাঁর স্মরণকে সুফিরা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম (ওয়াসিলা) মনে করেন

সুফি তরিকার মীলাদ আয়োজন

সুফি খানকা দরবারগুলোতে মীলাদ শরীফ পালন করা হয় অত্যন্ত ভাবগম্ভীর পরিবেশে। অনেক সময় এই উপলক্ষে চলতে থাকে:

  • রাতভর জিকির-মজলিশ
  • কওয়ালী পরিবেশনা
  • গোসল ইসালে সাওয়াব
  • ফকির-মিসকিনদের খেদমত

 শেষ কথা

সুফিবাদ বলে, যে হৃদয়ে রাসূলের ভালোবাসা নেই, সে হৃদয় মাটি সমান। মীলাদ কিয়াম শরীফ আমাদের হৃদয়কে জীবিত করে, প্রেমের আলোয় আলোকিত করে এবং আত্মিকভাবে রাসূলের (সা.) সান্নিধ্যে নিয়ে যায়

উপরোক্ত হাদীছ শরীফদ্বয়ের দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হলো যে, হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ স্বয়ং মীলাদ শরীফ পাঠ করতেন এবং হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর তাযীম বা সম্মানার্থে কিয়াম করতেন। বর্তমানে যে সুনির্দিষ্ট তর্জ-তরীকায় মীলাদ মাহফিল হয় তাতে নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ছানা-ছিফত সংক্ষিপ্তভাবে করা হয়ে থাকে যা খাছ সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত



No comments

Powered by Blogger.