যিয়ারাত কী?
১. যিয়ারাত কী?
"যিয়ারাত" (زيارة) একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ: পরিদর্শন করা, সাক্ষাৎ করা, কোনো পবিত্র স্থান বা কবর পরিদর্শন করা ইত্যাদি। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে যিয়ারাত বলতে বোঝানো হয়, আল্লাহর প্রিয় বান্দা ও পুণ্য ব্যক্তিদের কবর বা স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো ভক্তিসহকারে পরিদর্শন করা, যাতে ইমান, তাকওয়া, ও আত্মিক উন্নতি সাধন হয়।
২. যিয়ারাতের প্রকারভেদ:
১) কা'বা শরীফ, রওজা শরীফ, পবিত্র স্থান যিয়ারাত : কা'বা শরীফ যিয়ারাত যথানিয়মে কাবা শরীফ যিয়ারতকে হাজ্জ বলে । ইসলাম যে পাঁচটি ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত, হাজ্জ উহাদের মধ্যে অন্যতম । ইহাতেই কা'বা শরীফ যিয়ারাতের গুরুত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব উপলভিদ করা যায় । রওজা শরীফ যিয়ারাত রওজা শরীফ মদীন শরীফে অবস্থিত । মদিনা শরীফ নানাবিধ কারনে অতি মর্যাদাসম্পন্ন শহর । কিন্তু স্থানটি বিশ্বনবী মুহাম্মাদ (সঃ) এর বাসস্থান ও রওজা শরীফ হওয়ার কারনে বিশেষ মর্যাদা সম্পন্ন ।
রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর যিয়ারত অত্যন্ত সোয়াবের কাজ, আল্লাহ্র নৈকট্য লাভের সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির উত্তম উপায় । কোন কোন আলিম সমর্থ ব্যক্তির জন্য রওজা শরীফ জিয়ারাতকে ওয়াজিবের নিকটবর্তী বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন । স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সঃ) তাহার রওজা শরীফ যিয়ারাতের জন্য উৎসাহ প্রদান করিয়াছেন এবং সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যাহারা যিয়ারাত করে না, তাহাদিগকে মনুষ্যত্বহীন বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছেন । রাসুলুল্লাহ
(সঃ) বলেন যে ব্যক্তি আমার যিয়ারত করিবে কিয়ামতে সে আমার প্রতিবেশীদের অন্তর্ভূক্ত হইবে ।
— মিশকাত তিনি অন্যত্র বলেন আমার ইন্তিকালের পর হাজ্জ করতঃ যে ব্যক্তি আমার কবর যিয়ারাত করে সে যেন জীবিতবস্থায় আবার যিয়ারত করিল ।
— মিশকাত তিনি অন্যত্র বলেনঃ যে ব্যক্তি আমার কবর যিয়ারত করে তাহার জন্য সুপারিশ করা আমার কর্তব্য হইয়া পড়ে
— ফাত্হুল কাদির, মুফতি সাইদ আহ্মাদ মুয়াল্লিমুল হুজ্জাজ, পৃঃ ৩৩৩-৩৩৪ রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর রওজা শরীফ যিয়ারতের জন্য নিম্নলিখিত দুয়া পড়া শ্রেয় আসসালামু আলাইকা ইয়া রাসুলুল্লাহ আসসালামু আলাইকা ইয়া আবা বাকর আসসালামু আলাইকা ইয়া উমার পবিত্র স্থান যিয়ারাত মক্কা ও মদিনায় আরও বহু মসজিদ, পাহাড়, কূপ ও স্থানের সহিত রাসূল (সঃ) ও সাহাবী (রাঃ) এর ইবাদা ও প্রচেষ্টার স্মৃতি বিজড়িত হইয়া রহিয়াছে । শর্মভাবে উদ্দীপত হইবার উদ্দেশ্য সেই সব যিয়ারত করা নেকীর কাজ ।
২) কামিল ব্যক্তি ও সাধারণ মুসলমানদের কবরস্থান যিয়ারাত
কবর যিয়ারাত: মুসলিম উম্মাহর মধ্যে এটি সুন্নাত হিসেবে বিবেচিত।বিশেষ করে রাসূলুল্লাহ (সা.), সাহাবা, আওলিয়া কেরাম ও নেককার বান্দাদের কবর যিয়ারাত করা হয়ে থাকে।
মাযার যিয়ারাত:
অনেক দেশে, পীর-আউলিয়ার মাযার বা মাজার পরিদর্শন করা হয়। শরিয়ত সম্মত সীমার মধ্যে থেকে এই যিয়ারাত করলে তা ইবাদতের অংশ হতে পারে।
স্থানীয় যিয়ারাত:
কেউ কেউ ঐতিহাসিক বা কুরআনে বর্ণিত স্থান যেমন বদর, উহুদ, কারবালা, জিয়ারতুল কুবুর ইত্যাদিও যিয়ারাত করেন।
৩. কবর যিয়ারাত সম্পর্কে হাদীস: বায়হাকীর একটি হাদিসে বর্নিত আছে, যে ব্যক্তি শুক্রবারে মাতাপিতা কিংবা পিতা বা মাতার কবর যিয়ারত করে তাহাকে ক্ষমা করা হইবে এবং (তাহার আমলনামায়) তাহাকে পিতামাতার খেদমতগার হিসেবে উল্লেখ করা হইবে রাওদ্বাহ (روضة) যার অর্থ বাগান, তৃণভূমি, উদ্যান ইত্যাদি। মাজার আরবি (مزار) শব্দটির অর্থ জিয়ারত বা পরিদর্শনের স্থান, মাজার শব্দের অর্থ হলো দর্শনীয় স্থান। মাজার দেখলে মন প্রাণ ভরে যায় অন্তরে ভাব চেতনায় প্রেম আলিঙ্গনে দর্শন লাভ হয়, এখন আপনি কার দর্শন নিতে যাবেন একজন মৃত মানুষের দর্শন কেও নিতে যায় না অর্থাৎ জীবিত মানবের দর্শন নিতে যায় সেই জন্য আল কোরআনে বলা হয়েছে সূরা আল বাক্বারাহ:154 - আর যারা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয়, তাদের মৃত বলো না।বরং তারা জীবিত, কিন্তু তোমরা তা বুঝ না।
হাদীস ১: "আমি তোমাদের কবর যিয়ারাত করতে নিষেধ করেছিলাম, এখন তোমরা তা করো; কারণ এটি তোমাদের আখিরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে।"— (সহিহ মুসলিম: ৯৭৭)
হাদীস ২: রাসূল (সা.) বলেন: "তোমাদের কেউ যদি আমাকে যিয়ারাত করে, আমি তার জন্য সুপারিশ করব।"— (মুসনাদে আহমদ, তাবরানী)
৪. যিয়ারাতের উদ্দেশ্য ও উপকারিতা:
কামিল ব্যক্তি ও সাধারণ মুসলমানদের কবরস্থান যিয়ারাত মৃত্যুকে ও পরকালকে স্মরণ করার উদ্দেশ্যে কবর যিয়ারাত মুস্তাহাব বা ছাওয়াবের কাজ । কারণ ইহাতে দুনিয়ার প্রতি আকর্ষণ কমে এবং পরকালের কথা মনে উদয় হয় । ইহাতে পাপের প্রতি আকর্ষন কমে ও পূন্যের প্রবণতা বাড়ে । কবর জিয়ারতের ফজিলত সহীহ হাদিছে হাকিম হইতে বর্নিত আছে যে, রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ তোমরা কবর যিয়ারত করো । কারণ ইহাতে মন নরম হইয়া থাকে এবং অন্তরের নম্রতা হইতে পূন্য কর্ম সম্পন্ন হয় । আর কবর জিয়ারত চক্ষুকে অশ্রুসিক্ত করে এবং পরকালকে স্মরণ করাইয়া দেয় । অপর এক হাদিসে বর্নিত আছে, রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ তোমরা কবর যিয়ারত করো । কারণ ইহা সংসারের প্রতি বিরাগজাজন করিয়া তোলে এবং পরকালকে স্মরণ করাইয়া দেয় ।
|
উদ্দেশ্য |
ব্যাখ্যা |
|
আত্মিক উন্নতি |
পুণ্যবানদের কবর
দর্শনে আত্মা
শুদ্ধ হয় |
|
ইবরত গ্রহণ |
কবর দেখলে মৃত্যু
স্মরণ হয়,
যা মানুষকে
গুনাহ থেকে
বিরত রাখে |
|
দোয়া ও মাগফিরাত কামনা |
মৃতদের জন্য
দোয়া করা
ইসলামে পুণ্যের
কাজ |
|
ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা |
আল্লাহর প্রিয়
বান্দাদের প্রতি
শ্রদ্ধা ইমানের
নিদর্শন |
৫. যিয়ারাতের আদব বা শিষ্টাচার:
যিয়ারাত করার সময় যেগুলো পালন করা উচিৎ:
· সালাম প্রদান করা (যেমন: السلام عليكم يا أهل القبور)
· মৃত্যুর কথা স্মরণ করা
· কুরআন তিলাওয়াত করা (যেমন সূরা ফাতিহা, ইয়াসিন, ইখলাস)
· মৃতদের জন্য দোয়া করা:
যেগুলো থেকে বিরত থাকতে হবে:
· কবর বা মাযারের সামনে সিজদাহ করা
· কবরের মাটি বা দেয়ালে চুম্বন করা
· সেখানে সাহায্যের জন্য সরাসরি মৃতকে ডাকা
· গান-বাজনা, বাতিল কর্মকাণ্ড, বেদআত প্রথা পালন
৬. রাসূল (সা.) এর যিয়ারাত:
· মসজিদে নববী পরিদর্শনের সময় অনেক মুসলিম মদীনায় রওজা মোবারক যিয়ারাত করেন।
· সালাম জানান: السلام عليك يا رسول الله، السلام عليك يا نبي الله، السلام عليك يا حبيب الله(হে আল্লাহর রাসূল, আপনার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক।)
৭. নারীদের যিয়ারাত সম্পর্কে:
· অনেক আলেম বলেন, নারীরা যিয়ারাত করতে পারেন, যদি তা ইবরতের উদ্দেশ্যে হয় এবং পর্দা ও শালীনতা বজায় রাখেন।
· অন্যরা বলেছে, নারীদের কবর যিয়ারাত নিরুৎসাহিত করা হয়েছে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে।
উপসংহার:
যিয়ারাত হলো একটি নৈতিক, আত্মিক এবং ইসলামি সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন। এটি যদি শরিয়তের সীমার মধ্যে থেকে করা হয়, তবে তা এক অনন্য ইবাদত ও ইমান বৃদ্ধি করার মাধ্যম। তবে তা যেন মাযারপূজা, কুসংস্কার বা বিদআতে পরিণত না হয়, সেদিকে দৃষ্টি রাখা অপরিহার্য।

No comments