Header Ads

সুফী দর্শনে আমরা মাজারে কেন যাই?

 

সুফীবাদ, বা তাসাউউফ, ইসলামের অন্তর্গত এক আধ্যাত্মিক ধারা, যার মূল লক্ষ্য হলো আল্লাহর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করা, আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে অন্তর্দৃষ্টি অর্জন এবংফানা’ (আত্মবিলয়) বাকা’ (আল্লাহর অস্তিত্বে টিকে থাকা)-এর স্তরে পৌঁছানো এই দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ এক অনুশীলন হলো অলিদের (সাধু-সন্তদের) মাজার জিয়ারত বা ভিজিট করা

মাজার কি শুধুই কবর?

অনেকেই মনে করেন, মাজারে যাওয়া মানে কেবল একটি কবর পরিদর্শন করা। কিন্তু সুফী দৃষ্টিতে মাজার হলো আধ্যাত্মিক এক কেন্দ্রযেখান থেকে আল্লাহর প্রেম রহমতের স্রোত প্রবাহিত হয়। মাজার হচ্ছে সেই সকল আল্লাহপ্রেমিক ব্যক্তিদের স্মৃতিচিহ্ন, যাঁরা ইহজগতে থেকে আল্লাহর পথে নিজেকে নিঃশেষ করে দিয়েছেন

সুফী দর্শনে মাজারের গুরুত্ব

. আল্লাহর বন্ধুদের (আওলিয়া) প্রতি শ্রদ্ধা

সুফীবাদে বিশ্বাস করা হয়, "আল্লাহর বন্ধুদের জন্য কোনো ভয় নেই, তাদের কোনো দুঃখ নেই" (সূরা ইউনুস ১০:৬২) এই আওলিয়ারা আল্লাহর ঘনিষ্ঠ বান্দা। তাদের প্রতি ভালোবাসা সম্মান দেখানো মানে আল্লাহকেই ভালোবাসা

আল্লাহ তাআলার বাণী "যে ব্যক্তি আল্লাহর নিদর্শন সমূহকে তাজিম বা সম্মান করল তার নিশ্চয়ই উহা অন্তরের তাকওয়া বা খোদাভীতির অন্তর্ভুক্ত।" (আল কোরআন) আর যেহেতু আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণ তার নিদর্শনের অন্তর্ভূক্ত সেহেতু তাদের প্রতি সম্মান করা মূলত খোদা ভীতির অন্তর্ভূক্ত ব্যপারে আশরাফ আলী থানবী বলেন, "অলীগণের জ্ঞান ক্ষমতাকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করে তাদের নিকট যে সাহায্য প্রার্থনা করা হয় তা শিরক কিন্তু অলীগণের জ্ঞান ক্ষমতাকে স্বয়ং সম্পূর্ণ মনে না করে বরং আল্লাহ প্রদত্ত মনে করে যদি তাদের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা হয় এবং যেকোন প্রমাণ উদাহরণ দ্বারা তাদের উক্ত খোদা প্রদত্ত জ্ঞান ক্ষমতা প্রমাণিত হয় তাহলে তাদের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা জায়েয চাই তিনি জীবিত হোন অথবা মৃত" [ইমদাদুল ফতোয়া , খণ্ড , আকায়েদ কালাম অধ্যায় ]

. ইলম আধ্যাত্মিক শিক্ষার কেন্দ্র

অতীতে অনেক মাজার ছিল তাসাউউফ ইলমের কেন্দ্র। মুরিদগণ (সুফী শিষ্যরা) এখানে বসে জ্ঞান অর্জন করতেন, এবং পীরদের সংস্পর্শে এসে আত্মিক উন্নতির পথ খুঁজে নিতেন। আজও অনেক মাজার এই ঐতিহ্য বহন করে চলেছে

. রূহানী সংযোগ ধ্যানের স্থান

সুফীরা বিশ্বাস করেন, আল্লাহর প্রেমে আত্মাহুতি দেওয়া অলির রূহ মাজারে উপস্থিত থাকে। এখানে বসে ধ্যান, জিকির, তাওয়াজ্জুহ চর্চা করলে আত্মিক তৃপ্তি আল্লাহর সান্নিধ্য অনুভব করা যায়

. দোয়া কবুলের স্থান

সুফী বিশ্বাসে, আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের সম্মানার্থে আল্লাহ অনেক সময় মাজারে করা দোয়া কবুল করেন। যদিও চূড়ান্ত ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর, তথাপি এই স্থানগুলো বিশেষভাবে বরকতময়

আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণের রওযা হল দোআ কবুলের বিশেষ স্থান। যেমন ইমাম শাফেয়ী রহঃ বলেন,  নিশ্চয়ই আমি ইমাম আবু হানিফা রঃ হতে বরকত হাসিল করি এবং আমি তার রওজায় জিয়ারত করতে আসি আমার যখন কোন প্রয়োজন পড়ে তখন আমি দুই রাকাত নামাজ পড়ে তার কবরে আসি এবং তার পাশে দাড়িয়ে আল্লাহর নিকট মুনাজাত করি অতঃপর আমি সেখান থেকে আসতে না আসতেই আমার প্রয়োজন পূর্ণ হয়ে যায় সুবহানাল্লাহ ! (ফতোয়ায়ে শামী , খন্ড পৃঃ .তারিখে বাগদাদ , খন্ড পৃঃ ১২৩ রুদ্দুল মুখতার খন্ড পৃঃ ৪১ আল খায়রাতুল হাসান , পৃঃ ৯৪)

শাহ আব্দুল হক মোহাদ্দেস দেহলবী রহঃ যিনি সকলের কাছে মান্য গ্রহণযোগ্য এবং যিনি প্রচ্যের বুখারী হিসেবে পরিচিত। তিনি তার কিতাবে ইমাম শাফেয়ী রহঃ এর একটি উক্তি উল্লেখ করে বলেন, হযরত মুছা কাজেম এর কবর শরীফ দোআ কবুল হবার জন্য পরশ পাথরের মত পরীক্ষিত !  সুবহানাল্লাহ! আশিয়াতুল লুমআত ( খন্ড পৃঃ ৯২৩ )

মাজারে যাত্রার অন্তর্নিহিত শিক্ষা

আত্মদমন বিনয় : মাজারে গিয়ে মানুষ নিজের অহংকার আত্মম্ভরিতা ভুলে যায়। একজন সাধকের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে সে উপলব্ধি করেসাফল্যের চূড়ান্ত অর্থ আত্মসমর্পণ

ইন্তেকালের পরও জীবিত থাকার ধারণা : সুফীবাদে বলা হয়, “মরে গিয়েও অলিরা মৃত নন, বরং তাদের রূহ সক্রিয় থাকে।মাজারে গিয়ে আমরা তাঁদের কাছে সাহায্য চাই না; বরং তাঁদের মাধ্যমে আল্লাহর রহমত আশা করি

মানবিক ঐক্য সংস্কৃতির কেন্দ্র : বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ উপমহাদেশে বহু মাজার বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ শ্রেণির মানুষের মিলনস্থল এটি সহনশীলতা, ভালোবাসা মানবিক সহাবস্থানের এক উজ্জ্বল প্রতীক

ইসলাম মাজার দর্শন: বিতর্ক সমন্বয়

অনেক ইসলামি চিন্তাবিদ মনে করেন, মাজারে যাত্রা বা তাওয়াস্সুল করা বিদআত বা শরিয়ত বিরুদ্ধ। কিন্তু সুফীবাদ বলে, যতক্ষণ পর্যন্ত কেউ অলিকে উপাস্য রূপে না মানে, বরং তাকে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হিসেবেই দেখে, তখন তা শরিয়তের সীমার মধ্যে থাকে। প্রাচীন বহু ফকীহও ধরনের মাজার জিয়ারতের অনুমোদন দিয়েছেন

উপসংহার

সুফী দর্শনে মাজারে যাওয়া মানে কোনো কবরের সামনে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করা নয়এটি আত্মার ভেতরে এক জাগরণ, বিনয়, এবং আল্লাহর প্রেমে নিমগ্ন একজন অলির জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়ার এক গভীর সাধনা। মাজার আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, যে পথ ধরে একজন সাধক আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছেছেন, সেই পথ আমরাও অনুসরণ করতে পারি



No comments

Powered by Blogger.