উলামা, আওলিয়া ও বুযুর্গানে কিরামের কবরের উপর ইমারত তৈরী করা জায়েয
উলামা, আওলিয়া ও বুযুর্গানে কিরামের কবরের উপর ইমারত তৈরী করা জায়েয
১) মিশকাত শরীফের কিতাবুল জানায়েযের الدفن শীর্ষক অধ্যায়ে আবু দাউদ শরীফের বরাত দিয়ে বর্ণিত আছে- হযরত উছমান ইবনে মযউন (রা:) কে যখন দাফন করা হয়, তখন হুযুর আলাইহিস সালাম তাঁর কবরের শিয়রে একটি পাথর রাখলেনএবং ইরশাদ ফরমান- আমরা এর দ্বারা নিজের ভাইয়ের কবর সনাক্ত করতে পারবো এবং এখানে স্বীয় আহলে বাইয়েত লাশ সমূহ দাফন করবো।
(২) বুখারী শরীফে কিতাবুল জানায়েয الجريد على القبرশীর্ষকঅধ্যায়ে অন্য হাদীছের সনদের সাথে সংযুক্ত একটি হাদীছ হযরত খারেজা (রা:) থেকে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন আমরা হযরত উছমানের যুগে জীবীত ছিলেন: তখন আমাদের মধ্যে সেই বড় লম্ফদানকারী ছিলেন, যিনি উছমান ইবনে মযউনের কবরকে অতিক্রম করতে পারতেন।
(৩) উলামা মাশায়িখ ও আওলিয়া কিরামের মাযারের আশ-পাশে বা এর সন্নিকটে ইমারত তৈরী করা জায়েয। কুরআনে কারীম, সাহাবায়ে কিরাম ও সাধারণ মুসলমানদের আমল ও উলামায়ে কিরামের উক্তিসমূহ থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। কুরআন কারীম আসহাবে কাহাফের কাহিনী বর্ণনা প্রসংগে ইরশাদ করেন- তিনি বললেন, তাঁরা যে কাজে নিয়োজিত ছিলেন (ইবাদত বন্দেগীতে) তাঁদের সেই স্মৃতির উদ্দেশ্যে মসজিদ নির্মাণ করা হবে।
তফসীরে রূহুল বয়ানে এ আয়াতের بُنْيَانًا ব্যাখ্যা প্রসংগে উল্লেখিত আছে- তাঁরা প্রস্তাব দিলেন, আসহাবে কাহাফের জন্য এমন একটি প্রাচির তৈরী করুন, যা তাদের কবরকে পরিবেষ্টিত করবে এবং তাদের মাযার সমূহ জনগণের আনাগোনা থেকে হিফাজতে থাকবে, যেমন হুযুর আলাইহিস সালামের রওযা পাককে চার দেয়ালেরদ্বারা পরিবেষ্টিত করা হয়েছে। কিন্তু তাদের এ প্রস্তাব আগ্রাহ্য হলো, মসজিদই নির্মাণ করা হলো। উক্ত রূহুল বয়ানে مَسْجِدًا এর তাফসীর এভাবে করা হয়েছে- জনগণ সেখানে নামায আদায় করবে এবং ওদের থেকে বরকত হাসিল করবে। কুরআন কারীম সেসব লোকদের দুটি বক্তব্য উল্লেখ করেছেন; এক আসহাবে কাহাফের আস্তানার পাশে গম্বুজ ও সমাধি তৈরী করার পরামর্শ; দুই, ওদের সন্নিকটে মসজিদ তৈরী করার সিদ্ধান্ত । কুরআন করীম কোনটাকে অস্বীকার করেননি। যার ফলে প্রতীয়মান হলো যে, উভয় কাজটা তখনও জায়েয ছিল এবং এখনও জায়েয আছে। যেমন উসুলের কিতাবসমূহ দ্বারা প্রমাণিত আছে- شَرَائِع قَبْلِنَا يَلْزِمُنَا (আগের যুগের শরীয়ত আমাদের জন্য পালনীয়) হুযুর আলাইহিস সালামকে হযরত সিদ্দীকা (রা:) এর কুটিরে দাফন করা হয়। যদি এটা নাজায়েয হতো, তাহলে সাহাবায়ে কিরাম প্রথমে ওটা ভেংগে ফেলতেন, অত:পর দাফন করতেন, কিন্তু তা করলেন না। হযরত উমর (রা:) স্বীয় খিলাফতের যুগে এর চারিদিকে কাঁচা ইটের দেওয়াল তৈরী করে দিয়েছিলেন। অত:পর ওলিদ ইবনে আবদুল মালিকের যুগে সৈয়্যদেনা হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর সকল সাহাবায়ে কিরামের জীবীত থাকা অবস্থায় ঐ ইমারতটাকে খুবই মজবুত করেছেন এবং এতে পাথর স্থাপন করেছেন। যেমন সৈয়দ সমহুদী (রহ:) স্বীয় خلاصة الوفا باخبار دار المصطفے নামক কিতাবের ১০ম পরিচ্ছেদের ১৯৬ পৃষ্টায় হুযুরা সম্পর্কিত আলোচনায় লিপিবদ্ধ করেছেন-
বুখারী শরীফের প্রথম খন্ড কিতাবুল জানায়েযের مَاجَاءَ فِىْ قَبْرِالنَّبِىِّ وَاَبِىْ بَكْرِ وعُمَرَ শীর্ষক অধ্যায়ে হযরত ওরওয়াহ (রা:) থেকে বর্ণিত আছে- ওলিদ ইবনে আব্দুল মালিকের যুগে রসুলুল্লাহ আলাইহিস সালামের রাওযা পাকের একটি দেওয়াল ধসে পড়ে গিয়েছিল। যখন اَخَذُوْا فِىْ بِنَائِه সাহাবায়ে কিরাম একে মেরামত করার কাজে নিয়োজিত হলেন- তখন একটি পা দৃষ্টিগোচর হলো। এতে তাঁরা ঘাবড়ে গেলেন এবং মনে করলেন এটা হুযুর আলাইহিস সালামের পবিত্র কদম মোবারক। শেষ পর্যন্ত হযরত ওরওয়া (রা:) বললেন, খোদার কসম, এটা হুযুর আলাইহিস সালামের কদম নয়, এটা হযরত ফারুকের (রা:) কদম।
“জযবুল কুলুব ইলা দেয়ারিল মাহবুব” গ্রন্থে শেখ আব্দুল হক (র:) লিপিবদ্ধ করেছেন যে, ৫৫০ হিজরীতে জামাল উদ্দিন ইষ্ফাহানী তথাকার উলামায়ে কিরামের উপস্থিতিতে দেয়ালের চারিদিকে চন্দন কাঠের জালী তৈরী করে দিয়েছিলেন এবং ৫৫৭ হিজরীতে কয়েকজন ইসায়ী ধার্মিকের ছদ্মবেশে মদীনা শরীফেএসেছিলেন এবং সুড়ংগ খনন করে লাশ (দেহ) মুবারক বের করে নিতে চেয়েছিলেন। হুযুর আলাইহিস সালাম তৎকালীন বাদশাকে তিনবার স্বপ্ন দেখালেন। অত:পর বাদশাহ তাদেরকে কতল করার নির্দেশ দিলেন এবং রওযা পাকের চারিদিকে পানির স্তর পর্যন্ত ভিত্তি খনন করে সীসা ঢেলে একে ভরাট করে দিয়েছিলেন। আবার ৬৭৮ হিজরীতে সুলতান কালাউন সালেহী সবুজ গম্বুজটা, যা এখনও মওজুদ আছে, তৈরীকরিয়েছিলেন। বুখারী শরীফের প্রথম খন্ড কিতাবুল জানায়েয এবং মিশকাত শরীফের البكاء على الميت শীর্ষক অধ্যায়ে বর্ণিত আছে, যখন হযরত ইমাম হাসান ইবনে আলী (রা:) ইন্তিকাল করেছিলেন- ضَرَبَتْ اِمْرَ أتُه الْقُبَّةَ عَلى قَبْرِه سَنَة তখন তাঁর স্ত্রী তাঁর কবরের উপর এক বছর পর্যন্ত গম্বুজ বিশিষ্ট ঘর তৈরী করে রেখেছেলেন। এটাও সাহাবায়ে কিরামের যুগে সবার বর্তমানে হয়েছিল। কিন্তু কেউ প্রতিবাদ করেন নি। অধিকন্তু তাঁর স্ত্রী ওখানে একবছর পর্যন্ত অবস্থান করেছিলেন, অত:পর ঘরে ফিরে আসেন। এ হাদীছ থেকে বুযুর্গানে কিরামের মাযার সমূহের কাছে খাদিমের অবস্থান করাটাও প্রমাণিত হলো। এ পর্যন্ত কুরআন হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত করা হলো।
• ফকীহ, মুহাদ্দীছ, তাফসীরকারী গণের উক্তি সমূহ রূহুল বয়ানের তৃতীয় খন্ডে দশম পারায় اِنَّمَا يَعْمُرَ مَسَجِدَ اللهِ مَنْ اَمَنَ بِاللهِ এ আয়াতের ব্যাখ্যা করেছেন। উলামা, আওলিয়া ও বুযুর্গানে কিরামের কবরের উপর ইমারত তৈরী করা জায়েয যদি মানুষের মনে শ্রেষ্ঠতম ধারণা সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে; যাতে লোকেরা ঐ কবরবাসীকে নগণ্য মনে না করে। মিরকাত শরহে মিশকাতের কিতাবুল জানায়েযে دفن الميت অধ্যায়ে বর্ণিত আছে- পূর্বসূরী আলেমগণ, মাশায়িখ ও উলামায়ে কিরামের কবর সমূহের উপর ইমারত তৈরী করা জায়েয বলেছেন, যাতে লোকেরা যিয়ারত করে এবং বসে আরাম পায়। শেখ আব্দুল হক মুহাদ্দিছ দেহলভী শরহে সফরুস সা’আদাত কিতাবে উল্লেখ করেছেন- শেষ জামানায় সাধারণ মানুষ যখন বাহ্যিক বেশভূষার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে গেল, তখন মাশায়িখ ও বুযুর্গানে কিরামের কবর সমূহের উপর ইমারত তৈরী করার প্রতিবিশেষ অভিপ্রায়ে জোর দেয়া হয়, যেন মুসলমান ও আওলিয়া কিরামের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ প্রকাশ পায়। বিশেষ করে হিন্দুস্থানে, যেথায় হিন্দু, কাফির ও অনেক শত্রুর অবস্থান, তথায় পুণ্যাত্মা মনীষীদের শান-মান প্রকাশ, সেসব কাফিরদের মনে ভীতি ও আনুগত্য সৃষ্টির সহায়ক। অনেক কাজ আগের যুগে মাকরূহ ছিল কিন্তু শেষ জামানায় মুস্তাহাবে রূপান্তরিত হয়েছে। ফতওয়ায়ে শামীর প্রথম খন্ড الدفن অধ্যায়ে লিখা আছে- যদি কবরবাসী মাশায়িখ, উলামা বা সৈয়দ বংশ থেকে কেউ হয়ে থাকেন, তার কবরের উপর ইমারত তৈরী করা মাকরূহ নয়। মীযানুল কুবরা’ গ্রন্থের প্রথম খন্ডের শেষ কিতাবুল জানায়েযে ইমাম শারানী (রহ:) বলেন- ইমাম আবু হানীফার বক্তব্য হচ্ছে এসব জায়েয। এখনতো আর কিছু বলার নেই। স্বয়ং মযহাবের ইমাম হযরত আবু হানীফার অভিমত পাওয়া গেল যে, কবরের উপর গম্বুজবিশিষ্ট ইমারত ইত্যাদি তৈরী করা জায়েয।

No comments