Header Ads

শরীয়তের হুকুমকে দুই ভাগে ভাগকরা হয়েছে

 

ইসলামী ফিকহ বা শরীয়তের জ্ঞান অনুযায়ী, আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে মানবজাতির প্রতি যেসব বিধান বা নির্দেশ এসেছে, সেগুলিকে মূলত দুইটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। যথা : আদেশ ও নিষেধ।  

শরীয়তের পরিভাষায় আদেশ
আল্লাহ এবং রাসূল (সা.) যে সকল কাজ করার জন্য আদেশ করেছেন এবং সাহাবাগণ সে অনুযায়ী পালন করেছেন তাহাই শরীয়তের আদেশ হিসেবে গণ্য হয়েছে। আল্লাহর দেয়া এই আদেশ কাজগুলোকে আবার চার ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যেমন- ১. ফরজ,  ২. ওয়াজিব,  ৩. সুন্নত,  ৪. নফল।

০১. শরীয়তের প্রথম আদেশ ফরজ
শরিয়তের যেসব বিধান অকাট্যভাবে অবশ্যই পালনীয় তাকে ফরজ বলে। ফরজ এর হুকুম শরীয়তে বর্ণিত কোনো ওজর কারণ ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে ফরজ ত্যাগ করা কবিরা গুনাহ। কারও যদি কোনো ফরজ আমল ছুটে যায় তাহলে সেটা কাজা করা জরুরি। কোনো ওজর ব্যতীত তা ত্যাগকারীকে ‘ফাসিক’ বলে গণ্য করা হয় এবং তার অস্বীকারকারী ‘কাফির’ বলে গণ্য হয়। (রদ্দুল মুহতার : ১/৩৯৭,(উসুলে সারখসি : ১/১১০) । এই ফরজ আইনকে আবার দুই প্রকার- ১.ফরজে আইন। ২.ফরজে কেফায়া।

ফরজে আইন : যেসব কাজ প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক বিবেকবান নারী-পুরুষ সবার ওপর সমভাবে ফরজ তাকে ফরজে আইন বলে। যেমন-নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, প্রয়োজন পরিমান জ্ঞান অর্জন করা ইত্যাদি।

ফরজে কেফায়া : শরিয়তের যেসব বিধান পালন করা সবার জন্য আবশ্যক নয়; বরং সমাজের কিছুসংখ্যক লোক আদায় করলে সবার পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যায় তাকে ফরজে কিয়ায়া বলে। যেমন- জানাজার নামাজ, দ্বীনের গভীর জ্ঞান অর্জন।

ফরজে কেফায়ার হুকুম যদি কেউ আদায় না করে তা হলে সবার ফরজ তরক করার গুনাহ হবে। (জাওহিরাতুন নাইয়িরাহ : ১/৪)

০২. শরীয়তের পরিভাষায় দ্বিতীয় আদেশটি ওয়াজিব 
ইসলামি পরিভাষায় যে বিধান সুনির্ধারিত দলিল-প্রমাণের আলোকে প্রমাণিত নয়; বরং প্রবল ধারণাগত দলিলের ভিত্তিতে প্রমাণিত তাকে ওয়াজিব বলা হয়।

ওয়াজিব ফরজ বিধানের মতোই অবশ্য কর্তব্য। ওয়াজিব ত্যাগকারী কবিরা গুনাহগার হিসেবে গণ্য হবে। তবে এর অস্বীকারকারী কাফের সাব্যস্ত হবে না।ওয়াজিব অস্বিকারকারী গোমরা এবং ফাসিক হয়। যেমন-বিতরের সালাত ও দুই ঈদের সালাত ইত্যাদি। (মুজামুল ফকিহ : ৩১৯)

০৩. শরীয়তের তৃতীয় আদেশ সুন্নত 
যে সকল কাজ রাসুলুল্লাহ (সা.) সরাসরি আদেশ করেছেন এবং তাঁর সাহাবাগণ তাহা যথাযথ ভাবে পালন করেছেন তাকে সুন্নত বলা হয়। এই সুন্ননকে আবার দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যেমন- ১.সুন্নাতে মুয়াক্কাদা, ২.সুন্নাতে গাইরে মুয়াক্কাদা বা সুন্নাতে যায়েদা।

সুন্নাতে মুয়াক্কাদা : যেসব কাজ রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং তাঁর সাহাবাগণ সর্বদা পালন করতেন, অন্যদেরও পালনের তাগিদ দিতেন। যেমন- তারাবির নামাজ, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে মোট বারো রাকাত সুন্নাত ইত্যাদি।

সুন্নতে মুআক্কাদা ওয়াজিবের মতই। অর্থাৎ ওয়াজিবের ব্যাপারে যেমন জবাবদিহী করতে হবে, তেমনি সুন্নতে মুআক্কাদার ক্ষেত্রে জবাবদিহী করতে হবে। তবে ওয়াজিব তরককারীর জন্য সুনিশ্চিত শাস্তি পেতে হবে, আর সুন্নতে মুআক্কাদা ছেড়ে দিলে কখনো মাফ পেয়েও যেতে পারে। তবে শাস্তিও পেতে পারে।

ফরজ নামাযের আগে পরের সুন্নতে মুআক্কাদার অত্যধিক গুরুত্ব দেয়া উচিত। এ কারণেই সুফিয়ায়ে কেরামগন লিখেন যে, যদি কেউ সুন্নতকে হক মনে না করে এটাকে ছেড়ে দেয়, তাহলে এ কর্ম তাকে কুফরী পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে। তবে কেউ যদি সুন্নতকে সহীহতো মনে করে, কিন্তু অলসতা করে ছেড়ে দেয়। তাহলে সে গোনাহগার হবে।

সুন্নাতে গাইরে মুয়াক্কাদা বা সুন্নাতে যায়েদা : যেসব কাজ রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং তাঁর সাহাবাগণ মাঝে মধ্যে করতেন কিন্তু অন্যকে তা করতে তাগিদ দেননি সেগুলোকে সুন্নতে গায়রে মুয়াক্কাদা বা সুন্নতে জায়েদা বলে। যেমন- এশা ও আসরের ফরজ নামাজের আগে চার রাকাত সুন্নত, সালাতুত তাহাজ্জুদ, এশরাক ও আউয়বিনের নামাজ ইত্যাদি।
সুন্নতে গায়রে মুয়াক্কাদা তরক করার দ্বারা কোনো গুনাহ হবে না, তবে আমল করলে সওয়াব পাওয়া যায়। (রদ্দুল মুহতার : ১/৭৭)

০৪. শরীয়তের চতুর্থ আদেশ নফল  
নফল এমন আমল যা পালন করলে সওয়াব রয়েছে কিন্তু ছেড়ে দিলে কোনো গুনাহ নেই। যেমন-জুমার দিন বেশি বেশি দরুদ পড়া, প্রতি আরবি মাসের তিন দিন রোজা রাখা, শাওয়াল মাসের ছয় রোজা ইত্যাদি।
সুন্নাত ফরজের সহায়ক। আর নফল সুন্নাতের সহায়ক। তাই ফরজের পরিপূর্ণতার জন্য সুন্নত আর সুন্নতের পরিপূর্ণতার জন্য নফলের প্রতি গুরুত্ব প্রদান জরুরি।

শরীয়তের পরিভাষায় নিষেধ 
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরানে কিছু কাজ করার জন্য নিষেধ করেছেন এবং রাসূল (সা.) এর শরীয়তেও পালন করার জন্য নিষেধ করেছেন তা পালন করা শরীয়ত বিরোধী কাজ। এই নিষেধকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যেমন- ১. হারাম এবং ২. মাকরূহ । 

০১. শরীয়তের প্রথম নিষেধ হারাম 
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরানে সরাসরি যাহা করতে নিষেধ করেছেন এবং রাসূল (সা.) ও সাহাবাগণ যাহা পালন করেননি তাহাই হারাম। 

০2. শরীয়তের দ্বিতীয় নিষেধ মাকরূহ 
ইসলামি শরিয়তে যে সকল কাজ অপছন্দনীয় সাব্যস্ত হয়েছে এবং রাসূল (সা.) সরাসরি সাহাবাগণকে পালন করতে নিষেধ করেছেন তাকে মাকরুহ বলে। মাকরুহ সাধারণত দুই প্রকার। যেমন- ১.মাকরুহ তাহরিমি, ২.মাকরুহ তানযিহি।

মাকরুহে তাহরীমি : যেসব কাজ হারামের নিকটবর্তী তাকে মাকরুহ তাহরিমি বলা হয়। যেমন- সূর্যোদয়, দ্বিপ্রহর ও সূর্যাস্তের সময় নামাজ পড়া ইত্যাদি। মাকরুহ তাহরিমি হারাম বিধানের মতোই পরিত্যাজ্য। যদি কেউ বিনা কারণে মাকরুহে তাহরিমি কাজে অভ্যস্ত থাকে তবে সে ফাসেক হিসেবে সাব্যস্ত হবে (কামুসুল ফিকহ : ৩/২৪৭)।

মাকরুহে তানযিহি : যে সকল কাজ হালালের নিকটবর্তী তাকে মাকরুহে তানযিহি বলে। যেমন-কোনো কিছু বাম হাতে গ্রহণ করা ও বাম হাতে প্রদান করা।

মুবাহ  
যে সকল কাজ সম্পাদন করা বা ত্যাগ করা কোনটাই ইসলামের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ নয় তাকে মুবাহ বলে।
মুবাহ’ শ্রেণির অনেক কাজকেই ইবাদতে রূপান্তরিত করে পুণ্য হাসিল করা সম্ভব যদি নিজের মনের নিয়তকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের দিকে ডাইভার্ট করা হয়। যেমন-ক্রয়-বিক্রয় করা, সাধ্যমতো দামি পোশাক পরিধান করা।

উপসংহার:
আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে ইসলামি শরীয়তের হুকুমসমূহ মেনে চলার তাওফিক দান করুন। এবং সবাই এগুলোর পরিচয় মুখস্থ করে নিবেন, যদি এগুলোর পরিচয় না জানেন কখনো বই পড়লে বা কোন উস্তাদ বললেও বুঝবেন না এজন্য এগুলোর পরিচয় মুখস্থ করতেই হবে। 



No comments

Powered by Blogger.