Header Ads

কেন মার খাচ্ছে মুসলমান? ‘মোমিনের জন্য সুনিশ্চিত বিজয়’- এ কথার মর্মার্থ

ইসলামের প্রতিশ্রুতি: “মুমিন অবশ্যই বিজয়ী হবে”
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কুরআনে ঘোষণা করেছেন: “আমি যিক্‌রের পর যবরেও লিখে দিয়েছি, নিশ্চয়ই আমার নেক বান্দারাই এই পৃথিবীর উত্তরাধিকারী হবে” (সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:১০৫)। “এটা আমাদের দায়িত্ব যে, আমরা মুমিনদের সাহায্য করব”  (সূরা রূম, ৩০:৪৭)। সুতরাং, আল্লাহর ওয়াদা — "মুমিনের জন্য সুনিশ্চিত বিজয়" — এটি সত্য এবং অবিচল।

মোমিন বান্দার হৃদয়ে আল্লাহর অবস্থান। তাই মোমিনের জন্য সুনিশ্চিত বিজয়, বলেছে কোরান। বদরের যুদ্ধে মাত্র ৩১৩ জন মুসলমান ১০০০ ইহুদীর সঙ্গে যুদ্ধ করে বিজয় লাভ করেছেন। আবার মাত্র ৩৬০ জন মোমিন বান্দার নিকট গৌরগোবিন্দ নিয়মিত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রায় ৪০০০০ সৈন্যসহ যুদ্ধ করে সম্পূর্ণ পরাজয় বরণ করে আগুনের জ্বলন্ত শিখায় ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছিল। ৪০০ এর কিছু বেশি মোমিন মুসলমান পরশুরামের মতো প্রতাপশালী রাজা বহু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সৈন্য নিয়ে শাহ সুলতান বলখিয়া রুমির মতো সাধকের কাছে পরাজয়বরণ করে আত্মহত্যা করেছিল। এ রকমভাবে বহু মোমিনের সুনিশ্চিত বিজয়ের ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো তুলে ধরা যায় : খাজা গরিবে নেওয়াজ, গেসু দেরাজ, খানজাহান আলী, আবুল হোসেন খেরকানি এবং নুর মোহাম্মদ দারবন্দির মতো।প্রশ্ন হচ্ছে যদি বিজয় নিশ্চিত হয়, তাহলে মুসলমান আজ মার খাচ্ছে কেন? এর উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের চারটি মূল প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে:

✅ ১. “মুসলিম” আর “মুমিন” কি এক?
না। কুরআনে আল্লাহ তা’আলা সুস্পষ্টভাবে বলছেন: "বেদুঈনরা বলে, আমরা ঈমান এনেছি। বলো, তোমরা ঈমান আনোনি; বরং বলো, আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি।" (সূরা হুজুরাত, ৪৯:১৪)

সুতরাং, আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি কিন্তু মোমিন হতে পারিনি। শুধু মুসলমান নাম ধারণ করলেই কেউ মুমিন নয়। আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য আসে তাদের জন্য, যারা সত্যিকার ঈমানদার, আল্লাহভীরু ও আমলে সালেহে অভ্যস্ত।
মোমিনের জন্য সুনিশ্চিত বিজয়– কোরান-এর এই ঘোষণাটি সামনে থাকা সত্ত্বেও আজ কেন মুসলমানদের উপর আক্রমণ করে নাস্তানাবুদ করে দিচ্ছে আর মারের পর মার খেয়ে চলছে মুসলমান? তা হলে কি আমরা মুসলমান হয়েছি? ইমান এনেছি? আলবাব তথা জ্ঞানী হয়েছি, কিন্তু মোমিন মুসলমান হতে পারি নি। যদি সত্যি মোমিন হতে পারতাম, তা হলে কোরান-এর কথা সত্য হতে বাধ্য। 

পীরে কামেল শাহ সুফি বাবা শামসুদ্দিন দেওয়ানের একটি কবিতা পাঠকদের জন্য তুলে ধরলাম। কারণ তিনি প্রথমে শরিয়তের বিরাট আলেম ছিলেন এবং পরে তিনি গালবাতের হালতে থাকতেন। অনেকটা মজ্জুবের মতো। তিনি লিখেছেন-

খোদার দিদার যদি চাও মন, ভজ আগে মুর্শিদের চরণ,
মানুষ রতন কর যতন, চিনতে যদি চাও আপন।
পীর-মোর্শেদ কেবলা কাবা, তার চরণে কর সেবা,
অব-তাগু উসিলা ধর, কর তার সাধন ভজন।
জাহেরাতে মক্কা কাবা, হাকিকতে হয় মানুষ কাবা,
বিশ্বাস কর মোরাকাবা-মোশাহেদায় হয় দর্শন।
মোমিনের কলবে খোদা, দম থাকতে হবে না জুদা,
যথা মোর্শেদ তথা খোদা, বিশ্বাস কর জিন-এনছান।
আগে তুমি মোর্শেদকে মানো, তারপরেতে নিজেকে চিনো,
কোরান-হাদিস আমল কর, খোদা রয় গোপন।
ছহি হাদিসে করে বয়ান, একজন খাঁটি মুসলমান 
মক্কা কাবা হইতে উত্তম, সদায় কর তাহার স্মরণ।
অহংকারী দেমাক ছাড়ো, জায়গা চিনিয়া সেজদা করো,
আগে নিয়ত ঠিক করিয়া লও, মানুষ ছাড়া খোদা নাই। 

✅ ২. আল্লাহর সাহায্য আসার শর্ত কী?
কুরআনের বহু জায়গায় আল্লাহ তা’আলা স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন, তিনি কখন ও কাদের পাশে থাকেন, "তোমরা যদি আল্লাহর সাহায্য করো (আল্লাহর দ্বীনের জন্য কাজ করো), তবে তিনিও তোমাদের সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পা শক্ত রাখবেন।" (সূরা মুহাম্মদ, ৪৭:৭)
এছাড়াও: “আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।” (সূরা আনফাল, ৮:৪৬)
অতএব, সাহায্য পেতে হলে দরকার:
  • দৃঢ় ঈমান
  • তাকওয়া (আল্লাহভীতি)
  • দুনিয়াবি মোহ ত্যাগ
  • সুন্নাহর অনুসরণ

✅ ৩. মুসলমানদের পরাজয়ের কারণ কী?
❌ ১. ইমান ও আমলের দুর্বলতা:
  • নামাজ ছেড়ে দিচ্ছে
  • সুদ, ঘুষ, যিনা, মদ ইত্যাদিতে লিপ্ত
  • আল্লাহর বিধানকে উপেক্ষা করে কেবল দুনিয়ার পেছনে ছুটছে
❌ ২. দলাদলি ও বিভক্তি: "তোমরা পরস্পর বিবাদে লিপ্ত হয়ো না, তাহলে তোমাদের সাহস ভেঙে যাবে ও তোমাদের শক্তি কমে যাবে।" (সূরা আল-আনফাল, ৮:৪৬)
❌ ৩. আল্লাহর রসূলের সুন্নাহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া: "তোমরা যদি রাসূলের আদেশ অমান্য করো, তাহলে ফেতনায় পতিত হবে।" (সূরা নূর, ২৪:৬৩)
❌ ৪. আমরা আহলে বাইয়াতের মহব্বত থেকে অনেক দূরে আছি। বলতে গেলে আহলে বাইয়াতের মহব্বত অন্তরে থাকা তো দূরের কথা, পারলে আমরা আহলে বাইয়াতের বিরোধিতা করে থাকি।

✅ ৪. তবে কি আল্লাহ তাঁর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছেন?
না, কখনো না। আল্লাহর প্রতিশ্রুতি চিরন্তন সত্য। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি তাদের জন্য, যারা তাঁর শর্ত মানে। "আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তাদেরকে যারা ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করেছে — তিনি তাদেরকে পৃথিবীতে ক্ষমতা দান করবেন..." (সূরা নূর, ২৪:৫৫)
বাস্তব উদাহরণ: নবীজির যুগে কিভাবে বিজয় এসেছিল?

➤ বদরের যুদ্ধে:
মুসলমান মাত্র ৩১৩ জন
অস্ত্র ছিল না
কিন্তু ঈমান, তাকওয়া, তাওয়াক্কুল ছিল
➡️ আল্লাহর সাহায্য এলো: ফেরেশতা পাঠালেন

➤ ওহুদের যুদ্ধে:
মুসলমান সংখ্যায় বেশি ছিল
কিন্তু তারা রাসূলের আদেশ অমান্য করল (তীরন্দাজরা পাহারা ছেড়ে গেল)
➡️ মুসলমানরা হেরে গেল
“এটা তোমাদেরই কাজ ছিল।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৬৫)

উপসংহার: 
আমরা কাদের দোষ দিচ্ছি? কাফেরদের? ইহুদি-নাসারাদের? পশ্চিমাদের? না, আমাদের উচিত নিজেদের দিকে ফিরে তাকানো। "আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।" (সূরা রা’দ, ১৩:১১)



No comments

Powered by Blogger.