কৃষ্ণের দেহত্যাগ ও ভালকা তীর্থ নামকরণের কাহিনি, অভিশাপের জালেই ধ্বংস হয় যদুবংশ!
মহাভারত যুদ্ধের পর ৩৬ বছর পর্যন্ত দ্বারকায় রাজত্ব করেন কৃষ্ণ। গান্ধারীর অভিশাপে যদুবংশে কলহ শুরু হয়েছে। মদ্যপানে মত্ত যাদবরা পরস্পরের সংহার শুরু করে দেন। স্বজাতির এমন দুর্দশা দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে সোমনাথের কাছে ভালকা তীর্থে বিশ্রামের জন্য যান কৃষ্ণ। এখানেই তাঁর পায়ে জরা নামক ব্যাধের এই তীর লাগার কারণে শ্রী কৃষ্ণের মৃত্যুর কোলে যান। তার পরই নিজধামে প্রস্থান করেন কৃষ্ণ এবং ধ্বংস হয় দ্বারকা নগরী। ২ অভিশাপের জালে জরিয়ে দ্বারকা থেকে যদুবংশীয়দের চিহ্ন মুছে যায়।
১. গান্ধারীর অভিশাপ
যুদ্ধ শেষে ভারাক্রান্ত হয়েও গান্ধারী কৃষ্ণকে তীব্রভাবে দোষারোপ করেন কারণ তিনি যুদ্ধ রোধ করতে না পারা এবং ‘ধর্মের সমর্থন’ করে শুধু দাঁড়িয়ে ছিলেন । তাঁর অভিশাপ ছিল, “তোমার যদুবংশও এক দিবসে হাতে-কলহে পরস্পর বিন্দু ছাড়া বিনষ্ট হবে। তুমি অবশেষে একাকি বনে ফিরবে, তোমার মৃত্যু হবে সাধারণ মানুষের মতো।”
গান্ধারীর চরম কষ্ট ও অভিশাপ কৃষ্ণ মেনে নেন, কারণ এটি যুগান্তকারী নিযতি—ধর্মচক্রের অগ্রগতি মানে পুরাতন কালের অবসান ।
২. সাম্বার লোহার তীর ও রিষির অভিশাপ
সাম্বা, কৃষ্ণের পুত্র, একটি কৌতুকের অংশ হিসেবে গর্ভবতী স্ত্রীর বেশ ধারণ করে ঋষিদের কাছে যায়। রূঢ় কায়দায় লোহার রড গর্ভে ধারণ করার ফলে ঋষিমুনিরা ক্ষুব্ধ হয়ে সাম্বাকে অভিশাপ দেন যে, তিনি এমন এক লোহার তীর প্রসব করবে, যা তাঁর কুল এবং সাম্রাজ্যকে ধ্বংস করে দেবে। রডটি সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে সমুদ্রে ফেলা হয়; কিন্তু সেখান থেকে এক টুকরো রড মাছের পেটে পড়ে, যা পরে তাকেই কৃষ্ণের জন্য শেষ তীর হিসেবে পরিণত করে ।
৩. যদুবংশের ধ্বংসের ট্র্যাজেডি
প্রায় ৩৬ বছর পরে (যুদ্ধ থেকে কৃষ্ণের মৃত্যুর সময়), যদুদের মধ্যে মাদক এবং অলসতার কারণে শক্তিশালী পরস্পরের গলায় মৃত্যু হয়:
মদ্যপান ও তর্ক: সম্মেলনে সত্তায়কী ও কৃতি রাম্বা–ক্রিটতর্বর্মার মত মহারণ যুদ্ধের ভেতরের উচ্ছৃঙ্খলতা প্রকাশ পায় ।
তীক্ষ্ণ ক্লাব ঘাস: সমুদ্র থেকে আসা রড খণ্ড থেকে তৈরি ইরাকা ঘাস এমন শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে তা জ্বলজ্বল করে তীক্ষ্ন অস্ত্রের মতো রূপ নেয় ।
আগ্নেয় ধ্বংস: ঘাস-সদৃশ রড দিয়ে গলা কেটে তারা একে অপরকে ধ্বংস করে, শুধু কৃষ্ণ, বালারাম ও ডারুক ছিলেন বেঁচে থাকা ।
রেডডিটেও একজন বর্ণনা করেন, “যদিনা মদ্যপান করে তারা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে, ঘরে থাকা রড মাড়িয়ে একে অপরকে শেষ করে ... বুঝতে পারলো না তারা অস্ত্র নয়, ঘাস।”
৪. কৃষ্ণের মৃত্যু ও ভালকা তীর্থ
প্রাচীনকালের প্রভাসপাটন অর্থাৎ বর্তমানের সোমনাথ মন্দির থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ভালকা তীর্থ। এখানেই দেহত্যাগ করেন কৃষ্ণ। যাদবরা মদ্যপান, দুরাচারে মত্ত যাদবরা পরস্পরের রক্তপিপাসু হয়ে ওঠেন। শুরু করেন নরসংহার। যাদবদের এমন পরিণতি দেখে রুষ্ট কৃষ্ণ সোমনাথ ভালকা তীর্থে অশ্বত্থ গাছের তলায় বসে পড়েন। সেখানে জরা নাম ব্যাধ এসে উপস্থিত হয়। কৃষ্ণের পাকে হরিণের মুখ ভেবে তীর চালিয়ে দেয় জরা। পরে কাছে এসে দেখে সেটি কৃষ্ণের পা, কোনও হরিণের মুখ নয়। এর পর ব্যাধ ভয় পেয়ে কৃষ্ণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তখন কৃষ্ণ জরাকে জানান যে, সব তাঁর ইচ্ছাতেই হয়েছে বলে কৃষ্ণ ব্যাধকে ক্ষমা করে নিজধামে প্রস্থান করেন।
ধ্বংসের পরে দুঃখগ্রস্ত কৃষ্ণ বন থেকে ফিরে আসেন ভালকা/বাল্কা তীর্থে, যেখানে জরা নামের এক শিকারি (পূর্বজন্মে বালি হিসেবে পরিচিত) তীর চালান এবং কৃষ্ণের ওজ-বিহীন পায়ে ছুড়ে মারা তীর তাঁর মৃত্যুর কারণ হয় ।
সম্পূর্ণ ঘটনাচক্রের বাস্তব আয়োজন হলো, গান্ধারীর অভিশাপের কারণে যদুবংশের ধ্বংস, রিষির অভিশাপে ওজ-শূন্য লোহার তীর, জরা শিকারির ফলে কৃষ্ণের মৃত্যু।
এই পবিত্র স্থান পরে পরিচিত হয় ‘বাল্কা তীর্থ’ শব্দার্থে ‘বল্ল’ বা ‘বাল্ল’ অনুষঙ্গে ‘তীর’ (তীর দ্বারা আহত)’ অর্থাৎ সেই সুনির্দিষ্ট স্থানে যাকে আহত করা হয়।
সামগ্রিক সন্নিবেশ
গান্ধারীর অভিশাপ : যুদ্ধ রোধ না করতে পারার জন্য কৃষ্ণকে দেখে রোষান্বিত হয়ে তিনি যদুবংশের ধ্বংসের পূর্বাভাস দেন
রিষিদের অভিশাপ : সাম্বার কৌশল—ইরাকা রডের জন্ম ও ধ্বংসের সূত্রপাত
সাম্প্রতিক ট্র্যাজিডি : মদ-তর্কে রক্তক্ষয়ী যদুধূলি; কৃষ্ণ, বালারাম, ডারুক ছাড়া সবাই নিহত
কৃষ্ণের মৃত্যু : ভালকা তীর্থে জরা ব্যাধের তীরে; কৃষ্ণ ব্যাধকে ক্ষমা করেন
ভালকা তীর্থ : মৌখিক নাম ও আধ্যাত্মিক গুরুত্ব—স্তব্ধতার দেশ, যেদিন কৃষ্ণ নিজেকে ছেড়ে যান
উপসংহার
কৃষ্ণের দেহত্যাগ ও যদুবংশের বিনাশ একটি জটিল ছক নির্ধারিত ছিল—মহাকাব্যীয় পরম্পরা অনুযায়ী, গান্ধারীর অভিশাপ ও মহাপুরুষের ব্যাধী-শিকারি-তীরের সঙ্গে মিলিত হয়ে ধ্বংস হয়ে যায় এক যুগান্তকারী বংশ। এই কাহিনি 'মৌসাল পার্ব' এবং 'ভালকা তীর্থ'র পূরাণকাহিনী পাঠে পাওয়া যায়, যা মূলত 'মহাভারত' ও 'হারিবংশ'এর অন্তর্ভুক্ত।
.jpg)
No comments