যে কারনে মহান আল্লাহপাক মাটি/আরবা আনাছের দ্বারা আদম অজুদ তৈরী করে
আল্লাহ তাআলা পৃথিবীতে মানবজাতির প্রথম পিতা হজরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করেছেন মাটি বা "আর্বা" দিয়ে। এটি কেবল একটি সৃষ্টি প্রক্রিয়া নয়, বরং এতে লুকিয়ে আছে অসংখ্য তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা। কুরআনের বহু আয়াতে এবং সহীহ হাদীসে এই বিষয়টি বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে।
তাসাউফ বা সুফিবাদ হলো ইসলামের আধ্যাত্মিক দিক, যেখানে বাহ্যিক কর্মের পেছনের অন্তর্নিহিত অর্থ ও আত্মিক বাস্তবতা অনুধাবনের চেষ্টা করা হয়। সুফিদের মতে, আল্লাহ তাআলা মাটি বা আরবা আনাছ (আদিম মাটির নির্যাস) দিয়ে আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করেছেন একটি গভীর আধ্যাত্মিক রহস্যের অংশ হিসেবে।
কুরআনের আলোকে আদম (আ.)-এর সৃষ্টির ধাপসমূহ:
আল্লাহ তাআলা কুরআনের বিভিন্ন স্থানে আদম (আ.)-এর সৃষ্টিকে বিভিন্ন রূপে উল্লেখ করেছেন। একাধিক আয়াত একত্রে করলে আমরা দেখতে পাই আদম (আ.)-এর সৃষ্টির ধাপগুলো ছিল নিম্নরূপ:
১. মাটি (ত্বীন): “আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে।” সূরা আল-আন‘আম (৬:২)
২. পানি মিশ্রিত কাদামাটি (ত্বীন লাজিব): “আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি আঠালো কাদামাটি থেকে।” সূরা আস-সাফফাত (৩৭:১১)
৩. পচনশীল মাটি (হামা’ মাসনুন): “আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি পচনশীল কর্দম থেকে।”
সূরা হিজর (১৫:২৬)
৪. শুকনো মাটি বা মাটির পাত (সালসাল): “তিনি তাকে সৃষ্টি করেছেন শুকনো শব্দদায়ী মাটি থেকে।” সূরা রহমান (৫৫:১৪)
উল্লেখ্য যে, এসব শব্দ মাটির বিভিন্ন অবস্থা ও গুণগত বৈচিত্র্যকে বোঝায়।
হাদীসের আলোকে বিস্তারিত:
আবু মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আল্লাহ আদমকে পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকে বিভিন্ন রঙ ও প্রকৃতির মাটি সংগ্রহ করে সৃষ্টি করেছেন। এর ফলে আদম সন্তানদের কেউ সাদা, কেউ লাল, কেউ কালো; কেউ কোমল স্বভাবের, কেউ কঠোর; কেউ পবিত্র, কেউ অপবিত্র।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৬৫১)
এই হাদীস থেকে বোঝা যায় — মানবজাতির বৈচিত্র্য (রঙ, স্বভাব, মনোভাব) আদম (আ.)-এর সৃষ্টির সময় ব্যবহৃত মাটির বৈচিত্র্যের কারণে।
কোরান হাদিস মোতাবেক কেন মাটি দ্বারা আদমকে সৃষ্টি করা হলো?
১. নম্রতা ও বিনয় শিক্ষা: মাটি সবকিছুকে গ্রহণ করে, নিজে থেকে কিছু দাবি করে না। মানুষ মাটি থেকে এসেছে — এ থেকে শিক্ষা হয় যে, তাকে বিনয়ী ও নম্র হতে হবে।
২. বৈচিত্র্যময়তা: বিশ্বের মাটি যেমন বিভিন্ন রঙ, গঠন ও গন্ধযুক্ত — তেমনি মানুষও নানা ভাষা, বর্ণ ও স্বভাবের। এটি আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন।
৩. পরীক্ষার উপযোগিতা: মাটি পরিবর্তনশীল, চাপে গঠিত হয় — মানুষের চরিত্রও এমনই। দুনিয়ায় পরীক্ষার জন্য মানুষকে উপযোগীভাবে গঠন করা হয়েছে।
৪. নশ্বরতার প্রতীক: মাটি থেকে সৃষ্টি, আবার মাটিতেই ফিরে যাওয়া — এটি মানুষকে মনে করিয়ে দেয় সে চিরস্থায়ী নয়। মৃত্যু ও আখিরাত স্মরণে রাখার শিক্ষা মাটির সৃষ্টি থেকে পাওয়া যায়।
“তোমাদেরকে আমি সৃষ্টি করেছি মাটি থেকে, তারপর তোমাদেরকে সেখানেই ফিরিয়ে দেব, এবং পুনরায় সেখান থেকে বের করব।” সূরা ত্বাহা (২০:৫৫)
সুফী মোতে কেন মাটি দ্বারা আদমকে সৃষ্টি করা হলো?
১. মাটি: বিনয় ও আত্মসমর্পণের চূড়ান্ত প্রতীক
সুফিরা বলেন, মাটি সর্বাধিক নম্র ও আত্মসমর্পণকারী উপাদান। আল্লাহর নিকট প্রিয় বান্দা হতে হলে আত্মাকে দম্ভহীন ও বিনয়ী করতে হয়। মাটি সবকিছুকে গ্রহণ করে — অপবিত্রকেও, কিন্তু নিজে কিছুই দাবি করে না।
আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা: “আল্লাহ তাঁর খলিফা (আদম)-কে এমন উপাদান থেকে সৃষ্টি করেছেন, যা নিজেকে শূন্য করে দেয় — যেন সে আল্লাহর প্রেমে নিজেকে বিলীন করতে পারে।”
২. মাটি আত্মশুদ্ধির মাধ্যম
মাটি যেমন বীজ ধারণ করে ও ফল দেয়, তেমনি মানুষকেও আত্মিক উন্নতির জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। সুফিদের মতে: “মানুষের দেহ মাটি থেকে, কিন্তু আত্মা আরশ থেকে। এই দ্বৈত প্রকৃতি তাকে পরিশুদ্ধ করে আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার অনন্য পথ দিয়েছে।”
কুরআন: “আল্লাহ তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর আত্মা ফুঁকে দিয়েছেন।” (সূরা সাজদা, ৩২:৯)
৩. ইবাদতের আগ্রহ ও দীনতার প্রশিক্ষণ
সুফিবাদে দীনতা বা নিজেকে “নির্বিশেষ” মনে করাকে এক মহান গুণ ধরা হয়। মাটি সব থেকে নিচু — তাই আল্লাহ আদম (আ.)-কে মাটি দিয়ে সৃষ্টি করে বান্দাকে শিক্ষা দিয়েছেন, “নিচে থেকে উঠে ওপরে যাওয়াই আসল আরেফের পথ।”
ইশারত: আল্লাহ চান মানুষ দেহগতভাবে মাটি থাকলেও আত্মাগতভাবে ‘নূর’ হোক।
৪. মাটি হল 'ফানার' প্রতীক — নিজেকে বিলীন করা
সুফি দর্শনে, আল্লাহর প্রেমে নিজেকে বিলীন করে দেওয়া (ফানা) হলো মূল সাধনা। মাটি নিজেকে ফেনায়িত করে দেয় অন্য কিছুর জন্য (গাছ জন্মায়, পানি শোষণ করে, পথ গড়ে দেয়) — তার কোনো নিজস্ব অহংকার নেই।
“আল্লাহ চান, তাঁর প্রেমে আদম তাঁর ‘নফস’ বিলীন করুক — যেমন মাটি করে দেয়।”
৫. ভালোবাসার নির্যাস দিয়ে গড়া — ইশক ও মাটির মিলন
সুফিরা বিশ্বাস করেন, আল্লাহ যখন আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করলেন, তখন তা কেবল কুদরতের নয়, বরং ইশকের প্রকাশ। মাটি হলো সেই মাধ্যম, যা আল্লাহর ভালোবাসা ধারণের উপযুক্ত। দেহ মাটি দিয়ে গঠিত, কিন্তু তার মধ্যে আল্লাহর প্রেম (রূহ) বিরাজ করছে।
রুমির কবিতায় আছে: “মাটি থেকে গড়া হলেও তুই তুচ্ছ নস, কারণ তোর মাঝে রূহে ইলাহী আছে।”
মাটি দ্বারা আদম সৃষ্টির বিস্ময়কর কাহিনী
হাদিস শরীফে আরো বর্ণিত আছে যে, আল্লাহপাক নূরনবী (সাঃ)-কে সৃষ্টি করার পর একদিন বললেন , “হে আমার হাবীব ! আমি চারটি জিনিস সৃষ্টি করেছি আর তা হলো : ১) মাটি ২) পানি ৩) আগুন ও ৪) বাতাস। এর মধ্যে হতে একটাকে আপনার অধিকার করতে হবে, বাকি তিনটার শুধু প্রভাবই থাকবে। এর একটা দিয়ে আমি মানবজাতি সৃষ্টি করবো এবং বাকি তিনটিও তাতে সংমিশ্রণ থাকবে। আপনার যে কোন একটা পছন্দ করতে হবে।
পানির জবাব : নবীজি (সাঃ) তখন পানিকে দেখে বললেন, আচ্ছছালামু আলাইকুম। পানি জবাব দিল ওয়া আলাইকুম ছালাম বলে। পানি জানতে চাইলো আপনি কে? নূরনবী (সাঃ) বললেন, আমি আল্লাহ পাকের সৃষ্টি। তুমিও তাঁর সৃষ্টি। শোন হে পানি ! আল্লাহপাক এক জগৎ সৃষ্টি করবেন এবং তোমাকেও সেখানে পাঠাবেন। তুমি সেখানে গিয়ে কি কাজ করবে আমার নিকট বলো। পানি তখন উত্তর করলো আমার যা ইচ্ছা হয় তা-ই করবো। পানির কথা শুনে নূরনবী (সাঃ) দেখলো পানি ধ্বংশের নেশায় ভরপুর। হে পানি তোমার এ ইচ্ছা ত্যাগ করো। আমাদের ইচ্ছা বলতে কিছু রাখা ভাল নয়। আল্লাহর ইচ্ছাই ইচ্ছা। আল্লাহকে খুশী করাই আমাদের কাজ, তুমি এখন তোমার দোষ ত্রুটি গুলো জানো। পানি বললো, আপনি বলুন আমার কি দোষ ক্রটি আছে। নূরনবী বললো তোমার মাঝে ধ্বংশের গৌরব আছে, তুমি তা ত্যাগ করে পবিত্র হও। কারণ, তোমার দ্বারা আল্লাহপাক দুনিয়ার সব কিছু পবিত্র করবেন। তোমাকে ছাড়া দুনিয়াতে কোন জীব বা অন্যান্য কিছুই বাঁচবেনা। তোমাকে পাক করবে বাতাস। তখন নূরের কথা শুনে পানি খুশী হলো এবং কলেমা শাহাদাৎ পড়ে মুসলমান বা আত্মসমর্পণকারী হয়ে গেল।
বাতাসের জবাব : এরপর আল্লাহপাকের হুকুমে নূরনবী (সাঃ) গেল বাতাসের নিকট। এখানেও ছালাম বিনিময়ের পর নূর জানতে চাইলো বাতাসের কি গুণ আছে। বাতাস বললো আমি সব উড়িয়ে ধ্বংশ করে দিতে পারি। আর আমাকে দুনিয়ায় নিলে আমার যা ইচ্ছা তা-ই করবো। নূর তখন বললো, হে বাতাস, তুমি তোমার গৌরব নিজ ইচ্ছায় পরিত্যাগ করো, একমাত্র আল্লাহই আমাদের প্রভু, তাঁর ইচ্ছাই আমাদের ইচ্ছা হওয়া উচিত অন্যথায় আমরা ধ্বংশ হয়ে যাবো। এখন তুমি তোমার গৌরব ছাড় তাহলে পৃথিবীতে যেয়ে খুব গুণী হতে পারবে। জন্ম হতে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি জীব তোমার উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকবে। তুমি কাহারো নজরে পড়বে না। এভাবে বুঝানোর পর বাতাস কলেমা পড়ে মুসলমান হয়ে গেল।
আগুনের জবাব : তারপর নূরনবী (সা.) গেল “আগুনের কাছে সেখানেও ছালাম বিনিময়ের পর নূরনবী (সা.) আগুনের কি গুণ ক্ষমতা আছে তা জানতে চাইলেন। আগুন তখন খুব গর্ব করে বললো যে, তার এমন ক্ষমতা যে সে ইচ্ছা করলে সব পুড়ে ছাই করে ধ্বংশ করে দিতে পারে। আরো দেখলো আগুনের মধ্যে প্রচণ্ড অহংকার বিরাজ করছে, নূর এসমস্ত কিছু লক্ষ্য করে আগুনকে খুব ভাল করে উপদেশ দিল তার মিথ্যা অহংকার ত্যাগ করার জন্য। আল্লাহর গুণগান শোনালেন আগুনকে এবং তার কি কি দোষ আছে তাও জানালেন। আগুন দিয়ে আল্লাহপাক কি কি করবেন তাও বললেন। আগুন নূরের সমস্ত কথা শুনে কলেমা তাইয়্যেবা' পড়ে মুসলমান হয়ে গেল।
মাটির জবাব : শেষে নূরনবী (সা.) গেল “মাটির" নিকট। নূরনবী মাটির নম্রতা, নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার অসীম ক্ষমতা, ধৈৰ্য্যশীলতা, শান্ত স্বভাব ইত্যাদি মহৎ গুণাবলী দেখে খুব খুশী হলেন, নূরনবী (সা.) মাটিকে ছালাম দিলেন। মাটি উত্তরে বললো, ‘ওয়া-আলাইকুম ছালাম-মারহাবা" স্বাগতম। নূর তার গুণ জানতে চাইলে মাটি বললো আমার কোন গুণ নেই। আল্লাহর গুণেই গুণান্বিত। আল্লাহপাক যখন যে অবস্থায়ই রাখেন সে অবস্থায়ই খুশী।
এ কথা শুনে নূর খুশী হলেন এবং মাটিকে কলেমা পড়িয়ে মুসলমান করা হলো। মহান আল্লাহপাক উক্ত আরবা আনাছের দ্বারা আদম অজুদ তৈরী করে তাতে ফিল আরদে খলিফা রূপে বসালেন আদমকে এবং তা সমস্ত সৃষ্টি কার্য সমাধা করে চলেছেন অনাদি কাল হতে।
উপসংহার:
আদম (আ.)-এর মাটি থেকে সৃষ্টি নিছক একটি ঘটনা নয়। এটি এক মহান পাঠ। এতে রয়েছে আল্লাহর অসীম কুদরতের নিদর্শন, মানুষের দায়িত্বশীলতার শিক্ষা, বিনয় ও আত্মশুদ্ধির উপদেশ, এবং পার্থিব জীবনের ক্ষণস্থায়ীত্বের স্মরণ। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই শিক্ষাগুলো অন্তরে ধারণ করে জীবন গড়ার তৌফিক দিন। আমিন।
.jpg)
No comments