কোরআন, হাদীস ও সুফী মতে “মাওলা” কথাটির তাৎপর্য ও গভীরতা
"মাওলা" (مَوْلَىٰ) আরবি শব্দ, যার শাব্দিক অর্থ বহুবিধ হতে পারে। "মাওলা" - কথাটি ছোট্ট হলেও গভীরতা অতি ব্যাপক। যেমন- প্রভু, অভিভাবক, বন্ধু, দাস-মুক্তিদাতা, সাহায্যকারী, উত্তরাধিকারী ইত্যাদি। এটি "ওলা" (و ل ي) মূল ধাতু থেকে এসেছে, যার মূলার্থ হচ্ছে "ঘনিষ্ঠতা", "নিকটতা" বা "অভিভাবকত্ব"।
সঙ্গত কারনে "মাওলা" কথাটি সর্বপ্রথম সর্বশক্তিমান আল্লাহর সাথে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত । কারন নিঃসন্দেহে মহান আল্লাহ হচ্ছেন সকল সৃষ্টিজগতের "মাওলা" । প্রায়োগিক অর্থে "মাওলা" কথাটি আল্লাহ ছাড়াও আরও অনেকের ক্ষেত্রে ব্যবহার হতেই পারে । উদাহরনস্বরুপ আমাদের জন্মদাতা পিতা আমাদের অভিভাবক । একজন শিক্ষক তার ছাত্রের অভিভাবক । এরকমভাবে অনেকেই আমাদের অভিভাবক বা বন্ধু হতেই পারেন । আরবি ব্যাকরণ অনুযায়ী, "মাওলা" একটি ইসমে-ফাঈল ও ইসমে-মাফউল অর্থাৎ একই শব্দ দিয়ে কখনো কর্তা, আবার কখনো কর্ম বোঝানো হয়। এজন্য এই শব্দটি প্রসঙ্গনির্ভর, এবং এর সঠিক অর্থ নির্ধারণের জন্য ব্যাকরণ ও প্রসঙ্গ উভয়ের বিবেচনা জরুরি।
১. কোরআনের দৃষ্টিতে “মাওলা”
কোরআনে "মাওলা" শব্দটি প্রায় ১৮টি ভিন্ন ভিন্ন স্থানে ব্যবহৃত হয়েছে। এখানে কিছু প্রসঙ্গ তুলে ধরা হলো:
(ক) আল্লাহর একটি গুণরূপে: "এটা এই কারণে যে, আল্লাহ মু’মিনদের মাওলা।" (সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:১১) । এখানে ‘মাওলা’ মানে সহায়, অভিভাবক ও রক্ষাকর্তা।
(খ) উত্তম সহায় হিসেবে: "উত্তম মাওলা এবং উত্তম সাহায্যকারী।" (সূরা আনফাল ৮:৪০) । এখানে আল্লাহর প্রশংসায় "মাওলা" শব্দ এসেছে, বোঝানো হয়েছে তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ সহায়ক।
(গ) দুনিয়া ও আখিরাতে সম্পর্ক: "অতঃপর তোমরা তোমাদের প্রকৃত মাওলার দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে।" (সূরা আল-আন'আম ৬:৬২) । এখানে বোঝানো হচ্ছে, মানুষের মূল ও চূড়ান্ত আশ্রয় হল আল্লাহ, যিনি প্রকৃত মাওলা।
২. হাদীসের আলোকে "মাওলা"
হাদীস-এ-গাদীর (Hadith al-Ghadir) : নবী মুহাম্মদ (সা.) বিদায় হজের পর গাদীর খুম নামক স্থানে সাহাবিদের সামনে ঘোষণা করেন। "আমি যার মাওলা, আলীও তার মাওলা।" এই হাদীসটি ইসলামী চিন্তাধারায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে পরিগণিত।
"আমি যার মাওলা এই আলীও তার মাওলা বা অভিভাবক”। অর্থাৎ আল্লাহর রাসুল (সাঃ) স্বয়ং নিজে সোয়ালক্ষ হজ্ব ফেরৎ হাজী সাহাবাগনের সম্মুখে হযরত আলীকে (আঃ) "মাওলা" বলে ঘোষনা দিয়েছেন"। এই হাদিস সম্পর্কে মুসলমানদের মধ্যে কোনরকম সন্দেহ অবিশ্বাস কখনও ছিল না । সমস্যা শুরু হয়ে গেল নবীজীর (সাঃ) শাহাদাত বরণের বেশ কিছু বছর পরে। "মাওলা" কথাটির অর্থ নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এবং ঠান্ডা মাথায় অনেক মতপার্থক্য সৃষ্টি করে দেওয়া হয়েছে ।
শিয়া ব্যাখ্যা: "মাওলা" শব্দটিকে রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব বোঝাতে ব্যবহার করা হয়েছে। তাঁদের মতে, এই হাদীস দ্বারা ইমাম আলী (আ.)-কে নবী (সা.)-এর উত্তরসূরি ঘোষণা করা হয়।
সুন্নি ব্যাখ্যা: অনেক সুন্নি আলেম "মাওলা" অর্থ নিয়েছেন প্রিয়জন, বন্ধু, বা সহচর হিসেবে। হাদীসটি আলী (রা.)-এর মর্যাদা ও ভালোবাসা প্রচারে ছিল, নেতৃত্বের ঘোষণা নয়।
অন্যান্য হাদীসে "মাওলা":
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত: নবী (সা.) বলেন, "প্রত্যেক দাসের জন্য মুক্তিকর্তা মাওলা হয়ে যায়।"
(তিরমিজী) । এখানে "মাওলা" শব্দটি দাসমুক্তিদাতা বা অভিভাবক হিসেবে এসেছে।
৩. সুফী মতে "মাওলা" — আত্মার প্রভু
সুফীবাদে "মাওলা" শব্দটি আল্লাহ ও বান্দার মধ্যকার প্রেমের বন্ধন ও আত্মিক ঘনিষ্ঠতার প্রতীক। এখানে আল্লাহ একজন পরম প্রিয়, যাঁর সাথে আত্মার মিলন ঘটে।
রুমীর মতে: “মাওলা এমন একজন, যাঁর প্রেমে পড়লে নিজের অস্তিত্ব বিলীন হয়।”
বায়েজিদ বোস্তামী: "আমি সেই মাওলার খোঁজে ঘুরে বেড়াই, যাঁর প্রেমে আত্মা জেগে ওঠে।"
সূফীবাদের মূল ব্যাখ্যা: মাওলা অর্থ পরম আত্মা/রুহানী প্রেমিক, যার সাথে আত্মার মিলনই হচ্ছে ফানা বা আত্মবিলীনতা। মাওলার উদ্দেশ্যে ধ্যানে, জিকিরে ও প্রেমে সৃষ্টির সকল বন্ধন ছাড়ার শিক্ষা পাওয়া যায়।
৪. বিভিন্ন ধর্মতাত্ত্বিক মতপার্থক্য
মতবাদ মাওলার অর্থ ব্যাখ্যা
সুন্নি বন্ধু, সহায়, অভিভাবক নবী (সা.)-এর ভালোবাসা ও আলী (রা.)-এর মর্যাদা
শিয়া নেতা, খলিফা, আধ্যাত্মিক গাইড ইমামত ও নেতৃত্বের ঘোষণা
সুফী প্রেমিক প্রভু, আত্মিক সত্তা আত্মার প্রভু ও আধ্যাত্মিক মুক্তির কেন্দ্রবিন্দু
৫. ইসলামের প্রথমদিকে "মাওলা" কথাটির ব্যবহার
প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর : "ইসলামের প্রথম দিকে "মাওলা" কথাটি দিয়ে কি বুঝানো হত । হাদিসে গাদীরে "মাওলা" কথাটির ব্যবহার রাসুল (সাঃ) করেছেন তার মূল ক্রিয়া হচ্ছে "ওয়ালি" । আর এই কথাটি খেলাফতের জন্যও ব্যবহার করা হয়ে থাকে । আর ইসলামের প্রথমদিকে এ কথাটি খেলাফতের জন্যই ব্যবহৃত হত । "প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর বলেছিলেন , আমি তোমাদের কাজের জন্য খলীফা নির্ধারিত হয়েছি" । সূত্র: আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৬ষ্ঠ খন্ড, পৃষ্ঠা: ৩৩৩। এ হাদিসের দ্বারা আমরা জানতে পারি যে , "হযরত আবু বকর "ওয়ালি" কথা দিয়ে খলীফা বুঝিয়েছেন । আর কেউ তখন আপত্তি বা প্রতিবাদ করে নাই । কারণ সাধারনত "ওয়ালি" কথাটি খলীফার জন্যই ব্যবহৃত হত ।
দ্বিতীয় খলীফা হযরত ওমর : অপর এক হাদিসে আছে, "আমি হযরত ওমরকে তোমাদের উপর খলীফা নির্ধারণ করেছি" । সূত্র: ইবনে আসিরের জামেউল উসুল , ৪র্থ খন্ড , পৃষ্ঠা - ১০৯ । তখনও কিন্ত আপত্তি বা প্রতিবাদমূলক কোন কথা হয় নাই । কারন সব মুসলমানরাই এ কথার অর্থের সাথে খুবই সুপরিচিত ছিলেন । "আবারও তিনি বলেন , "হে আল্লাহ , আমি তাকে (ওমরকে) তোমার নবীর (সাঃ) হুকুম ছাড়া খলীফা বানিয়েছি" । সূত্র: ইবনে হাইয়ানের আস সিকাত, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা: ১৯৩ । এখানেও কেউ অন্য কোন অর্থের সম্ভাবনা হতে পারে বলে কথা বলেন নাই ।
দ্বিতীয় খলীফা হযরত ওমর বলেছিলেন । "যখন আল্লাহর রাসুল (সাঃ) মৃত্যুবরণ করেন আবু বকর বললেন , আমি আল্লাহর রাসুলের (সাঃ) খলীফা । অতঃপর আবু বকর মৃত্যুবরণ করলেন । এখন আমি হচ্ছি আল্লাহর রাসুলের (সাঃ) খলীফা ও আবু বকরের খলীফা"। সূত্র - সহীহ মুসলিম , ৫ম খন্ড, পৃষ্ঠা: ১৫২ , হাদিস: ৪৪৬৮ ।
উপসংহার
"মাওলা" শব্দটি একটি বহুমাত্রিক ইসলামি ধারণা: কোরআনে আল্লাহর গুণরূপে ব্যবহৃত — অভিভাবক, প্রভু, সহায়। হাদীসে সাহাবিদের সাথে সম্পর্ক ও নেতৃত্ব বোঝাতে ব্যবহৃত। সুফী সাধনায় প্রেম, আত্মসমর্পণ ও আত্মার মুক্তির চূড়ান্ত লক্ষ্যের প্রতীক।
‘মাওলা’ মানে শুধু প্রভু নয়, বরং এমন এক সম্পর্ক, যেখানে রয়েছে ঘনিষ্ঠতা, প্রেম, অভিভাবকত্ব, আত্মিক সমর্পণ এবং আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনা।

No comments