Header Ads

যুলহজ্জের প্রথম দশ দিনের ফজিলত

 

যুলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিন ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ সময়। আল্লাহ তাআলার প্রত্যেক কাজ বা সৃষ্টি হিকমতে ভরপুর প্রত্যেক বস্তুতে তাঁর প্রতিপালকত্বের দলীল এবং একত্বের সাক্ষ্য বিদ্যমান। কিছু সৃষ্টিকে কিছু মর্যাদা ও বিশেষ গুণ দ্বারা নির্দিষ্ট করা, কিছু সময় ও স্থানকে অন্যান্যের উপর প্রাধান্য ও গুরুত্ব দেওয়ার কর্মও তাঁর ঐ হিকমত ও মহত্বের অন্যতম। আর আল্লাহ পাক কিছু দিন-মাস ও সময় বান্দার জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন যাতে বান্দা মৃত্যু আসার পূর্বে যথা সময়ে তার প্রস্তুতি এবং পুনরুত্থানের জন্য যথেষ্ট পাথেয় সংগ্রহ করে নিতে পারে। কুরআন ও হাদীসের আলোকে এই দশ দিনে আল্লাহ তায়ালা বান্দার জন্য যেসব নিয়ামত ও ফজিলত রেখেছেন, তা নিচে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা হলো।

যুলহজ্জের প্রথম দশ দিন: গুরুত্বপূর্ণ রুহানী সময়

যুলহজ্জের প্রথম দশ দিন ইসলামের অত্যন্ত পবিত্র ও বরকতপূর্ণ দিন হিসেবে বিবেচিত। এই সময় আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের জন্য বিশেষ রহমত ও নিয়ামত প্রদান করেন। আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় দিনগুলো হিসেবে বিবেচিত হয় এগুলো। উক্ত দিনগুলোতে ইবাদত, তাওবা ও আমল করার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর কাছে নৈকট্য লাভ করতে পারেন।

যুলহজ্জের প্রথম দশ দিন: আল্লাহর কাছে প্রিয়তম

১. এই দশ দিনে সবচেয়ে বড় ফজিলত:

হাদীসে এসেছে, "এই দশ দিনের তুলনায় পৃথিবী ও আসমান ছাড়া কোন দিন নেক আমলের জন্য এত উত্তম নয়, যে দিনগুলোতে আল্লাহর ইবাদত করা হয়।" [ইবনে মাজাহ]

অর্থাৎ, এই দশ দিনে যে কোনো নেক আমল—যেমন সালাত, সাদাকা, তিলাওয়াত বা জিকির—আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়। এই সময় আল্লাহ বান্দার প্রতি বিশেষ দয়া ও রহমত মঞ্জুর করেন।

ঐ ধরনের প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ মৌসমেরই নির্দিষ্ট এক একটা ওযীফাহ ও করণীয় আছে; যার দ্বারায় আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করা যায়। সেই সময়ে আল্লাহ পাকের বিশেষ অনুগ্রহ ও করুণা আছে; যার দ্বারায় আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা পুরস্কৃত করে থাকেন। অতএব সৌভাগ্যশালী সেই হবে, যে ঐ নির্দিষ্ট মাস বা কয়েক ঘণ্টার মৌসমে নির্দিষ্ট ওযীফাহ ও ইবাদতের মাধ্যমে নিজ মওলার সামীপ্য অর্জন করতে সক্ষম হবে। আর সম্ভবতঃ তাঁর অনুগ্রহের অধিকারী হয়ে পরকালে জাহান্নাম ও তাঁর ভীষণ অনলের কবল হতে নিষ্কৃতি পাবে।

২. কোরবানি: 

যুলহজ্জের দশম দিন ঈদুল আযহা পালন করা হয়, যেটি মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি অন্যতম বড় উৎসব। কোরবানি করা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, যা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য পালন করা হয়। হাদীসে এসেছে: "যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য কোরবানি করে, তার কোরবানি আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয়।" [সহীহ মুসলিম]

কোরবানির মাধ্যমে আমরা আমাদের সেরা সম্পদ, অর্থাৎ পশু উৎসর্গ করি আল্লাহর পথে।

মুসলিমের উচিত, আয়ুর মর্যাদা ও জীবনের মূল্য সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত হওয়া এবং সেই সঙ্গে আল্লাহর ইবাদত অধিকরূপে করা ও মরণাবধি সৎকার্যে অবিচল প্রতিষ্ঠিত থাকা। আল্লাহ তাআলা বলেন, (وَاعْبُدْ رَبَّكَ حَتّى يَأْتِيَكَ الْيَقِيْن) অর্থাৎ, ‘‘তোমার ইয়াকীন উপস্থিত হওয়া পর্যন্ত তুমি তোমার প্রতিপালকের উপাসনা কর।’’ (কুঃ ১৫/৯৯)

সালেম বিন আব্দুল্লাহ (রহ.) বলেন, ‘ইয়াকীন’ (সুনিশ্চয়তা) অর্থাৎ মৃত্যু। অনুরূপ বলেছেন মুজাহিদ, হাসান, কাতাদাহ প্রভৃতি মুফাসসিরগণও।

৩. আরাফার রোজা:

৯ যুলহজ্জ—যেটি আরাফা দিবস—এতে রোজা রাখা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "আরাফার দিনের রোজা দুই বছরের গুনাহ মুছতাগিত করে, এক বছর আগের এবং এক বছর পরের।" [সহীহ মুসলিম]

এই দিনটি হজের মূল অংশ। হজ্বের জন্য যারা উপস্থিত না, তাদের জন্য এই দিনটির রোজা রাখা সুন্নত।

আল্লাহ তাআলা যুলহাজ্জের প্রথম দশ দিনকে অন্যান্য দিনের উপর শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা দান করেছেন। আল্লাহর রসূল (সা.) বলেন। ‘‘এই দশ দিনের মধ্যে কৃত নেক আমলের চেয়ে আল্লাহর নিকট অধিক পছন্দনীয় আর কোন আমল নেই।’’ (সাহাবাগণ) বললেন, ‘আল্লাহর পথে জিহাদও নয় কি?’ তিনি বললেন, ‘‘আল্লাহর পথে জিহাদও নয়। তবে এমন কোন ব্যক্তি (এর আমল) যে নিজের জান-মাল সহ বের হয় এবং তারপর কিছুও সঙ্গে নিয়ে আর ফিরে আসে না।

৪. তাওবা ও ইস্তিগফার:

যুলহজ্জের প্রথম দশ দিনে তাওবা ও ইস্তিগফার করা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা বলেন, "তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা কর, তিনি তো তোমাদের পাপ মাফ করবেন।" [সুরা তাহরীম: ৮]

এই দশ দিনে আল্লাহর কাছে বেশি বেশি তাওবা করতে হবে এবং গুনাহ মাফের জন্য সঠিক ইস্তিগফার করা উচিত। আল্লাহ তাঁর বান্দাকে ক্ষমা করতে সদা প্রস্তুত।

ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন, ‘মোট কথা বলা হয়েছে যে, এই দশদিন সারা বছরের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম দিন; যেমনটি হাদীসের উক্তিতে প্রতীয়মান হয়। অনেকে রমযানের শেষ দশ দিনের উপরেও এই দিনগুলিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কারণ, যে নামায, রোযা, সাদকাহ ইত্যাদি আমল এই দিনগুলিতে পালনীয় ঐ আমলসমূহই ঐ দিনগুলিতেও পালনীয়। কিন্তু (যুলহাজ্জের) ঐ দিনগুলিতে ফরজ হাজ্জ আদায় করার অতিরিক্ত বৈশিষ্ট্য রয়েছে।’

৫. প্রতিদিনের আমল:

নফল রোজা রাখা: যুলহজ্জের প্রথম ৯ দিন নফল রোজা রাখা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। বিশেষ করে ৯ যুলহজ্জের রোজা, অর্থাৎ আরাফার রোজা।

যিকির ও দোয়া: এই দশ দিনে বেশি বেশি আল্লাহর নাম স্মরণ করা, জিকির করা এবং দোয়া করা গুরুত্বপূর্ণ।

"তোমরা আল্লাহর প্রতি আনুগত্যশীল হও, তাহলে তোমরা সফল হবে।" [সুরা আলে ইমরান: ২০০]

কুরআন তিলাওয়াত: এই সময় কুরআন তিলাওয়াত করা এক গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। প্রতিদিন অন্তত একটি পৃষ্ঠা পড়ার চেষ্টা করুন।

বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত:

যুলহজ্জের প্রথম দশ দিনে মুসলমানদের বিশেষ দোয়া এবং মোনাজাতের গুরুত্ব রয়েছে। আল্লাহর কাছে নিজের নফস, পরিবার ও সমাজের জন্য মাগফিরাত (ক্ষমা) এবং রহমত প্রার্থনা করা উচিত। কিছু বিশেষ দোয়া যা এই সময়ের জন্য উপযুক্ত:

হে আল্লাহ, তুমি আমাকে এবং আমার পরিবারকে দয়া করো।

হে আল্লাহ, তুমি আমাকে আমার গুনাহ মাফ করো।

হে আল্লাহ, এই পবিত্র সময়ের বরকত দ্বারা আমার জীবনকে আরো সঠিক পথে পরিচালিত করো।

এছাড়া, যুলহজ্জের প্রথম দশ দিন বিশেষভাবে কুরআন ও হাদীসের আমল সমূহে নিমগ্ন থাকার জন্য একটি সুযোগ সৃষ্টি করে।

কোন বস্তুকে যখন সাধারণভাবে শ্রেষ্ঠ বলা হয়, তখন তার এই অর্থ নয় যে, ঐ বস্তু সর্বাবস্থায় ও সকলের পক্ষেই শ্রেষ্ঠ। বরং অশ্রেষ্ঠও তার নির্দেশিত বিধিবদ্ধ স্থানে সাধারণ শ্রেষ্ঠ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর হতে পারে। যেমন, জিহাদ সাধারণভাবে শ্রেষ্ঠ আমল। কিন্তু অশ্রেষ্ঠ কোন নেক আমল তার নির্দেশিত নির্দিষ্ট ঐ দশ দিনে করা হলে তা জিহাদ থেকেও শ্রেষ্ঠতর।

উপসংহার:

যুলহজ্জের প্রথম দশ দিন মুসলিমদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ সময়। এই সময়ে আল্লাহর কাছে নেক আমল করার মাধ্যমে বান্দা তাঁর পাপ মাফ করার এবং আল্লাহর সান্নিধ্যে আসার একটি বিশেষ সুযোগ লাভ করে। কোরবানি, রোজা, জিকির, দোয়া, এবং তাওবা—সবই এই বিশেষ দিনগুলোর জন্য বিশেষ ইবাদত হিসেবে গণ্য। আমাদের উচিত এই সময়টিকে কাজে লাগিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা এবং পুণ্য অর্জনের চেষ্টা করা।




No comments

Powered by Blogger.