Header Ads

শয়তান কীভাবে মানুষকে ধোকা দেয়? কোরআনে বর্ণিত চার প্রকার শয়তানের কাজ কি?

আল্লাহ তাআলা মানুষকে এই দুনিয়ায় পরীক্ষা করার জন্য পাঠিয়েছেন। সেই পরীক্ষার বড় একটি চ্যালেঞ্জ হচ্ছে শয়তানের ধোঁকা ও কুমন্ত্রণা। শয়তান মানুষের চিরশত্রু — সে চায় মানুষ যেন সত্য ও ন্যায়ের পথ থেকে সরে গিয়ে জাহান্নামে চলে যায়। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বহুবার শয়তানের কৌশল ও মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার পদ্ধতি ব্যাখ্যা করেছেন। এখানে আমরা কুরআনের আলোকে শয়তানের চারটি প্রধান কাজ ব্যাখ্যা করবো।

শয়তান কে?
শয়তান শব্দের অর্থ বিদ্রোহী, বিপথগামী। আসল শয়তান হলো ইবলিস, যে আদম (আঃ)-কে সিজদা করতে অস্বীকার করেছিল এবং আল্লাহর রহমত থেকে বিতাড়িত হয়। "সে ছিল জিনদের মধ্য থেকে; তাই সে তার প্রতিপালকের আদেশ অমান্য করেছিল।" (সূরা কাহফ, ১৮:৫০)
যখন শয়তান অহংকার করে তখন শয়তানের রূপটির নাম হল ইবলিস। কারণ আদমকে সেজদা দিবার হুকুমটি সরাসরি অমান্য করার দরুণ সে অহংকারী হয়ে গেল, তথা ইবলিস হয়ে গেল। তাই ইবলিসই হল শয়তানের প্রথম এবং আদিরূপ। মানুষ জীবন ধারণের প্রশ্নে যখন বিভিন্ন প্রকার লোভ-লালসার খপ্পরে পড়ে যায় এবং জীবন ধারণের প্রশ্নে বৈষয়িক বিষয়ের ঘাত-প্রতিঘাতের আঘাতে প্রতিনিয়ত জর্জরিত হতে থাকে, সেই আঘাত-খাওয়া অবস্থানটির নাম শয়তান। 

শয়তানের অবস্থান কোথায়

জিন এবং মানুষের অন্তর ছাড়া শয়তানের অবস্থানটির কথা যদি অন্য কোথাও আছে বলে কেউ লিখে তো ধরে নিতে হবে যে, সে ইসলামের বিন্দু-বিসর্গও জানে না, কেবল হাউকাউ করে বড় বড় কথার ফুলঝুড়ি ছড়ায়ে, আরবি ব্যাকরণের তেলেসমাতি দেখিয়ে সরল মানুষগুলোকে লিখনির মাধ্যমে বিভ্রান্ত, দিশেহারা করে তুলছে। যে মানুষটি কেবলমাত্র দুনিয়াই চায় এবং যার দুনিয়া চাওয়া ছাড়া আর কোন চাওয়াই থাকে না, তাকে মরদুদ বলা হয়। মরদুদের স্থান হাবিয়া দোজখ। হাবিয়া দোজখের তলা থাকে না। যে মানুষটির দুনিয়া চাওয়ার সীমা থাকে না সেই মানুষটিকে তলা-ছাড়া হাবিয়া দোজখে যেতে হয়। 
কুরআনে শয়তানের চার প্রকার কাজ

০১. ওয়াসওয়াসা দেওয়া (কুমন্ত্রণা)
শয়তানের প্রধান অস্ত্র হলো মনের ভিতরে কুমন্ত্রণা দেওয়া — যেন মানুষ ভুল সিদ্ধান্ত নেয়, আল্লাহর কথা ভুলে যায়। "সে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে।" (সূরা নাস, ১১৪:৫)
"অবশ্যই আমি তাদের সামনে, পেছনে, ডানে ও বামে থেকে তাদের ওপর আসব..." (সূরা আ'রাফ, ৭:১৭)
ওয়াসওয়াসা দিয়ে শয়তান মানুষকে —
  • গুনাহে উৎসাহ দেয়
  • গাফেল বানায়
  • সংশয়ে ফেলে
  • অহংকারে ডোবায়

০২. সুন্দর করে গুনাহ দেখানো
শয়তান সবসময় মানুষকে দুনিয়া লোভী করে তোলে। গাড়ি-বাড়ি, বিল্ডিং, ধন-সম্পত্তি, নারী ইত্যাদির মোহে ফেলে দেয়। কোনো লোক একবার দুনিয়ার মোহে পরে গেলে তার নিকট ভালো-মন্দ, উচিত-অনুচিত সবই তার নিকট সমান মনে হয়। তখন সে গুনাহ করতে বিন্দু মাত্র চিন্তা ভাবনা করেন। 
শয়তান মানুষের সামনে গুনাহকে আকর্ষণীয় করে তোলে, যেন মানুষ সেটা খারাপ না ভেবে আনন্দের কাজ মনে করে। "শয়তান তাদের কাছে তাদের কাজকে শোভনীয় করে তোলে।" (সূরা আনফাল, ৮:৪৮)
"আমি তাদের জন্য দুনিয়ার জীবনকে শোভনীয় করে তুলেছি।" (সূরা আনআম, ৬:১১২)
উদাহরণ:
  • যিনা আজকাল “সম্পর্ক” নামে প্রচারিত
  • সুদকে বলা হয় “ব্যাংকিং সেবা”
  • গান-বাজনাকে বলা হয় “বিনোদন”

০৩. ভয় দেখানো ও হতাশা সৃষ্টি করা
শয়তান মানুষকে প্রতিনিয়তই বলে থাকে “সত্য পথে চললে তুমি বিপদে পড়বে” সত্য পথে চললে তুমি কিছুই পাবেনা। “হালাল পথে চললে রিজিক বন্ধ হবে” হালাল পথে চললে যা অর্জন করবে তা দিয়ে তোমার কোনো চাহিদাই পূরণ হবেনা। “তাওবা করেও লাভ নেই, তুমি তো অনেক গুনাহ করেছ” এখনই তাওবার কি প্রয়োজন। সময় তো আরো আছে। শেষে একবারে তাওবা করলেই হবে। কিন্তু শেষে আর তাওবা করা হয়না।
"শয়তান তোমাদেরকে দারিদ্রের ভয় দেখায় এবং অশ্লীলতার আদেশ দেয়।" (সূরা বাকারা, ২:২৬৮)
"নিশ্চয়ই শয়তান তার বন্ধুদের ভয় দেখায়..." (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৭৫)
লক্ষ্য: মানুষকে যেন সে গুনাহের পথে ধরে রাখে এবং আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

০৪. ভ্রান্ত ও বিভ্রান্ত পথ দেখানো
শয়তান অনেক সময় ধর্মীয় মোড়কে ভুল পথ দেখায়। যেন মানুষ ভাবে, সে ভালো কাজ করছে — অথচ আসলে বিপথে। "তারা মনে করে, তারা ভালো কাজ করছে — অথচ তারা পথভ্রষ্ট।" (সূরা কাহফ, ১৮:১০৪)
"আমি অবশ্যই তাদেরকে বিভ্রান্ত করব, কুপ্ররোচনা দেব, আমি তাদেরকে আদেশ দেব..." (সূরা নিসা, ৪:১১৯)
উদাহরণ:
  • গোমরাহ ফিরকায় যোগ দিয়ে মনে করে সে ইসলামেরই কাজ করছে
  • বিদআত/আযগুবি আমল করে কিন্তু ভাবে এটা দ্বীনের অংশ

শয়তান থেকে বাঁচার উপায় কী?
এই খান্নাসরূপী শয়তানটি, যাহা প্রতিটি মানুষের অন্তরে অবস্থান করছে, উহাকে তাড়িয়ে দেবার বহু প্রকার উপদেশের আরেক নাম পবিত্র কোরান। যত প্রকার মোরাকাবা, মোশাহেদা, ধ্যানসাধনা, এবাদত- বন্দেগি, কান্না ও বিলাপ, নফ্সকে ইচ্ছা করে নানা প্রকার কষ্ট দান করা, সবই এই খান্নাসরূপী শয়তানকে তাড়িয়ে দেবার একমাত্র উদ্দেশ্যে। আর দ্বিতীয় কোন উদ্দেশ্য নাই এবং থাকার কোন বিধান রাখা হয়নি। তাই পবিত্র কোরানের সূরা মোমিনের ষাট নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে যে, হে মানুষ, তুমি একা হও এবং একা হয়ে আল্লাহকে ডাক দাও, তাহলে ডাকের জবাব সঙ্গে সঙ্গে পাবে। আরবি ভাষায় দুইজনে ডাক দিলে বলা হয় উদ্উনা, আর একজনে ডাক দিলে হয় উদ্উনি। কোরান উদ্উনি তথা একা শব্দটি ব্যবহার করেছে। উদ্উনা তথা দুইজন থাকলে ডাকের জবাব পাওয়া যাবে না। 

কুরআনে আল্লাহ বলেন, "নিশ্চয়ই শয়তানের কৌশল দুর্বল।" (সূরা নিসা, ৪:৭৬)
করণীয়: সবসময় আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা হে আল্লাহ তুমি আমাকে সর্বদা সৎ পথে পরিচালনা করুন. হালাল রিজিকের মাধ্যমে জীবন অতিবাহিত করুন. নিয়মিত নামাজ-রোজা আদায় করার তৌফিক দান করুন. বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত ও যিকির করার তৌফিক দান করুন. সৎ ও দ্বীনদার লোকের সোহবতে থাকার চেষ্টা করা. কোনো বিষয় সন্দেহ হলে আলেমদের নিকট তথা জ্ঞানী লোকের নিকট গিয়ে পরামর্শ নেওয়া.

উপসংহার
শয়তান মানুষের চিরশত্রু, তার চারটি প্রধান কৌশল কুরআনে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে:
  • কুমন্ত্রণা (ওয়াসওয়াসা)
  • গুনাহকে সুন্দর করে দেখানো
  • ভয় দেখানো ও হতাশা তৈরি
  • ধর্মীয় মোড়কে বিভ্রান্তি সৃষ্টি
তাই একজন মুসলমানের উচিত, সব সময় সচেতন থাকা এবং শয়তানের কৌশল চিনে তাকে পরাজিত করা।



No comments

Powered by Blogger.