কুরআন ও হাদীস মোতাবেক ইসলাম ধর্মে কোরবানির বিধি-বিধান
▣ কোরবানির সংজ্ঞা
ইসলামী পরিভাষায় কোরবানি হল নির্দিষ্ট সময়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট পশু জবাই করা। এটি ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত যা হযরত ইব্রাহিম (আঃ) ও হযরত ইসমাইল (আঃ)-এর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পালিত হয়।
‘কোরবানি’ অর্থ নৈকট্য, সান্নিধ্য, উৎসর্গ। ঈদুল আজহার দিনগুলোতে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট পশু জবাই করাকে ‘কোরবানি’ বলে। (মাজমাউল আনহুর : ২/৫১৬)
কোরবানির বিধান হজরত আদম (আ.)-এর যুগ থেকেই চলে এসেছে। তবে বর্তমানে প্রচলিত কোরবানির গোড়াপত্তন করেন হজরত ইবরাহিম (আ.)। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি তার (ইসমাঈলের) পরিবর্তে জবাই করার জন্য দিলাম এক মহান জন্তু। আর আমি এ বিষয়টি পরবর্তীদের মধ্যে রেখে দিয়েছি।’ (সুরা : সাফফাত, আয়াত : ১০৭-১০৮)
▣ কোরবানির গুরুত্ব ও ফজিলত
ইসলামে কোরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত যা মহান আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের একটি উপায়। এটি শুধু একটি রীতিমাত্র নয়, বরং একজন মুমিনের আত্মত্যাগ ও খোদাভীতির প্রকাশ।
আল্লাহ তাআলা বলেন: “তোমরা বলো, নিশ্চয় আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু — সবই আল্লাহর জন্য, যিনি সকল সৃষ্টির প্রতিপালক।” সূরা আন’আম, আয়াত ১৬২
মহান রাব্বুল আলামিন তাঁর রাসুলকে কোরবানি করার নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘তুমি তোমার রবের উদ্দেশে নামাজ পড়ো ও কোরবানি করো।’ (সুরা : কাউসার, আয়াত : ২)
কোরবানির ফজিলত সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেন, ‘কোরবানির দিন কোরবানি করাই সবচেয়ে বড় ইবাদত।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৪৯৩) অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘কোরবানির পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একেকটি করে নেকি দেওয়া হয়।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ১৯২৮৩) আরো ইরশাদ হয়েছে, ‘সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কোরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩১২৩)
▣ কোরবানির পশুর যোগ্যতা
চান্দ্রমাস হিসেবে পূর্ণ পাঁচ বছর বয়সের উট, দুই বছরের গরু ও মহিষ এবং এক বছরের ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা দ্বারা কোরবানি করতে হবে। (আলমগিরি : ৫/২৯৭)
- গরু, মহিষ – কমপক্ষে ২ বছর বয়স
- ছাগল, ভেড়া – কমপক্ষে ১ বছর বয়স (কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে ৬ মাস বয়সী যদি দেখতে ১ বছরের মতো হয়)
- পশু সুস্থ, ত্রুটিমুক্ত ও সবল হতে হবে
- এক গরু বা উট ৭ জন মিলে কোরবানি করতে পারে, তবে প্রত্যেকের নিয়ত হতে হবে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য।
- অন্ধ বা চোখে গুরুতর সমস্যা
- পা ভাঙা বা চলাফেরায় অক্ষম
- রোগে আক্রান্ত
- কানের অর্ধেক বা তার বেশি কাটা
- দাঁত না থাকা বা অধিকাংশ পড়া
হাদীস: “চার ধরণের পশু কোরবানির জন্য উপযুক্ত নয়: কানা, অসুস্থ, খোঁড়া এবং খুবই দুর্বল।” আবু দাউদ, হাদীস ২৮০২
▣ কোরবানির নিয়ত ও পদ্ধতি
কোরবানির সময় বুকে নিয়ত করতে হবে: “আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এই পশু কোরবানি করছি।”
- পশুকে মুখ কিবলার দিকে করে শোয়ানো
- “বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার” বলে জবাই করতে হবে
- কোরবানির রক্ত পড়ার আগেই অন্য কোনো কাজ না করাই উত্তম
▣ কোরবানি কবে করা হয়?
১০ জিলহজ ঈদের নামাজের পর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ে কোরবানি করা যায়। তবে ১০ জিলহজ ও দিনে কোরবানি করা উত্তম। আর কোরবানির দিনগুলোতে কোরবানি করা সম্ভব না হলে ক্রয়কৃত পশু বা কোরবানির মূল্য সদকা করে দিতে হবে। (বুখারি, হাদিস : ৫৫৪৫, আলমগিরি : ৫/২৯৫-২৯৭)
✅ তারিখ: ১০ জিলহজ্জ ঈদের নামাজের পর থেকে শুরু করে ১২ জিলহজ্জ সূর্যাস্ত পর্যন্ত।
✅ সময়: ঈদের নামাজের পর থেকে সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত, রাতের বেলাতেও কোরবানি করা যায়।
✅ ঈদের নামাজের আগে কোরবানি করা বৈধ নয়।
হাদীস: “যে ঈদের নামাজের আগে কোরবানি করল, সে শুধু নিজের জন্য মাংস জবাই করল, আর যে ঈদের নামাজের পর করল, সে সঠিকভাবে কোরবানি করল।” সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৫৪৫
▣ কোরবানি কার ওপর ওয়াজিব?
প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন, মুকিম, মুসলিম নর-নারী ১০ জিলহজ ফজর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের ভেতরে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব। (আল মুহিতুল বুরহানি : ৬/৮৫)
ওয়াজিব হওয়ার শর্তসমূহ:
- মুসলমান হতে হবে
- বালেগ (প্রাপ্তবয়স্ক)
- আক্লবান (বুদ্ধিমান ও সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন)
- নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক (যাকাতযোগ্য সম্পদের মালিক, ঋণমুক্তভাবে)
- মুকীম (নিজ এলাকায় অবস্থানকারী, মুসাফির নয়)
- নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই এই শর্ত প্রযোজ্য।
সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি রুপা বা প্রয়োজনাতিরিক্ত আসবাবপত্র, যার মূল্য সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপার সমপরিমাণ, তা কোরবানির নিসাব। উল্লেখ্য, টাকা-পয়সা, স্বর্ণালংকার, মৌলিক প্রয়োজনাতিরিক্ত জমি ও বাড়ি, ব্যাবসায়িক পণ্য ইত্যাদি কোরবানির নিসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য। (আলমগিরি : ৫/২৯২-২৯৩)
নিসাবের মালিক নয় এমন ব্যক্তির জন্য কোরবানি করা মুস্তাহাব। তবে তিনি কোরবানির নিয়তে কোনো পশু ক্রয় করলে তা কোরবানি করা ওয়াজিব হয়ে যায়। (বাদায়েউস সানায়ে : ৪/১৯২)
▣ শরিকে কোরবানির নিয়ম
ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা দ্বারা কোরবানি দিলে একা দিতে হবে। আর উট, গরু ও মহিষে সর্বোচ্চ সাতজন শরিক হতে পারবে। সাতের কম যেকোনো সংখ্যায় কোরবানি করা জায়েজ। (মুসলিম, হাদিস : ১৩১৮, কাজিখান : ৩/৩৪৯)
পশুর প্রকার বয়স কতো জনের জন্য শর্ত
ছাগল / ভেড়া ১ বছর ১ জন ত্রুটিমুক্ত
গরু / মহিষ ২ বছর সর্বোচ্চ ৭ জন সবাই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিয়ত করবে
উট ৫ বছর সর্বোচ্চ ৭ জন সুস্থ ও সবল
▣ কোরবানির নিয়ম ও করণীয়
✅ নিয়ত করা (হৃদয়ে): “আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এই পশু কোরবানি করছি।”
✅ পশুকে কিবলার দিকে শুইয়ে: জবাইকারী ব্যক্তি “বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার” বলবে এবং দ্রুত ধারালো ছুরি দিয়ে জবাই করবে।
✅ যে জবাই করবে:
মুসলমান হতে হবে
বালেগ ও সুস্থ হতে হবে
আল্লাহর নাম নিয়ে জবাই করতে হবে
কোরআন: “তোমরা আল্লাহর নাম নিয়ে জবাই করো।” সূরা আল-আনআম: ১১৮
▣ মাংস বণ্টনের নিয়ম
ঈদুল আজহার প্রথম দিন সর্বপ্রথম নিজ কোরবানির গোশত দিয়ে খানা শুরু করা সুন্নাত। কোরবানি শরিকানার হলে ওজন করে গোশত বণ্টন করতে হবে। কোরবানির গোশত তিন ভাগ করে এক ভাগ নিজের জন্য, এক ভাগ গরিবদের জন্য আর এক ভাগ আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীকে দেওয়া উত্তম। তবে মানতের কোরবানির গোশত নিজে এবং কোনো ধনী খেতে পারবে না। কোরবানির গোশত ভিন্ন ধর্মাবলম্বীকে দেওয়া জায়েজ। কোরবানির গোশত, চর্বি, হাড় ইত্যাদি বিক্রি করা বা পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া জায়েজ নয়। অবশ্য ঘরের অন্য সদস্যদের মতো কাজের লোকদেরও গোশত খাওয়ানো যাবে। (মুসলিম, হাদিস : ৪৯৯৮, আদ্দুররুল মুখতার : ৬/৩১৭, আলমগিরি : ৫/২৯৫, ৩০০, আহকামুল কোরআন জাস্সাস : ৩/২৩৭)
কেউ চাইলে সবই দান করতে পারেন। তবে গরীবদের অংশ অবশ্যই থাকা উচিত।
▣ নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ
অন্ধ, কানা, লেংড়া বা এমন দুর্বল পশু, যা জবাইয়ের স্থান পর্যন্ত হেঁটে যেতে পারে না, যে পশুর কোনো অঙ্গ এক-তৃতীয়াংশ বা তার চেয়ে বেশি কেটে গেছে, যে পশুর এত বেশি দাঁত পড়ে গেছে যে ঘাস-খাদ্য চিবোতে পারে না, যে পশুর শিং একেবারে গোড়া থেকে ভেঙে গেছে—এগুলো দ্বারা কোরবানি শুদ্ধ হবে না। (তিরমিজি, হাদিস : ১৪৯৭, ১৪৯৮, আলমগিরি : ৫/২৯৭-২৯৯)
❌ কোরবানির পশুর কোনো অংশ (চামড়া, মাংস, হাড় ইত্যাদি) বিক্রি করা যাবে না।
❌ জবাইকারী বা কসাইকে পশুর অংশ মজুরির বদলে দেওয়া যাবে না। বরং টাকা দিয়ে পারিশ্রমিক দিতে হবে।
❌ পশু জবাইয়ের সময় কষ্ট দেওয়া যাবে না, দ্রুত ও মানবিকভাবে জবাই করতে হবে।
▣ কোরবানির পশুর চামড়া
✅ চামড়া বিক্রি করে টাকা মসজিদ, মাদ্রাসা বা গরীবদের দেওয়া যেতে পারে।
✅ চামড়া ব্যক্তিগত ব্যবহারেও রাখা যায়। তবে বিক্রির টাকা নিজের জন্য ব্যবহার করা অনুচিত।
▣ মহিলারা কোরবানি করতে পারবে কি?
হ্যাঁ, যদি তারা নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন এবং কোরবানির শর্তগুলো পূরণ করেন তবে তাদের জন্য কোরবানি ওয়াজিব।
▣ কোরবানির শিক্ষা
কোরবানির মূল শিক্ষা হল — আত্মত্যাগ, আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও তাকওয়া। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) ও ইসমাইল (আঃ) আল্লাহর আদেশ পালনে যেভাবে নিজের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন, তেমনিভাবে আমাদেরও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আত্মত্যাগ করতে হবে।
সূরা হজ, আয়াত ৩৭: “আল্লাহর কাছে তাদের গোশত ও রক্ত পৌঁছে না, বরং তোমাদের তাকওয়া পৌঁছে।”
উপসংহার
কোরবানি ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত যা শুধু পশু জবাই নয়, বরং একজন মুমিনের ঈমান, ইখলাস এবং আত্মত্যাগের প্রকাশ। তাই কোরবানির সমস্ত বিধি-বিধান যথাযথভাবে জানা ও মানা জরুরি।
.jpg)
No comments