Header Ads

নূরে মোহাম্মদী পাঁচটি হালিয়তে এসে পাক পাঞ্জাতন রূপে বিকশিত হয় ?

ইসলামী আধ্যাত্মিকতা ও সুফিবাদের এক গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব হল "নূরে মোহাম্মদী" – যার অর্থ হল মুহাম্মদী আলো বা দ্যবীয় চেতনার মূল উৎস। এটি এমন এক নূর, যা হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর রুহানী সত্তা হিসেবে সৃষ্টি হয় সৃষ্টিজগতের শুরুতেই। অনেক আলেম ও সুফি সাধকের মতে, আল্লাহ তা'আলা সর্বপ্রথম এই নূর সৃষ্টি করেন, তারপর এর মাধ্যমেই সমগ্র জগত সৃষ্টি করেন।
নূরে মোহাম্মদীর পাঁচটি হালিয়ত (রূপ বা গুণাবলি)
এই নূরে মোহাম্মদী শুধুমাত্র হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটি বিকশিত হয়েছে পাঁচটি বিশেষ রূপে, যাদের সম্মিলিতভাবে বলা হয় পাক পাঞ্জাতন বা আহলে কিসা। প্রথমে ছিলেন : আল্লাহর নূর, দ্বিতীয়তে ছিলেন : তবরকের ফুল (আহামদী নূর), তৃতীয়তে ছিলেন : ময়নার গলার হার, চতুর্থতে ছিলেন : সেতারা রূপ, পঞ্চমেতে ছিলেন: ময়ুরিণী।
এ পাঁচটি অবস্থা মোতাশাবেহাত (রহস্যাচ্ছন্ন) বা রূপক বা উপমা হিসাবে বিধৃত। এ অবস্থাটি বিভিন্ন নামেও পরিচিত আছে, তবে সবার মূলতত্ত্ব একই। এ সময় এশকের তসবীহ নিয়ে দুঠোটে নাম জপতেন “আলহামদুলিল্লাহ"। সমস্ত সৃষ্টির রহস্যের আধার হলো এ ‘আলহামদুলিল্লাহ' কথাটি এবং “সাজারাতুল ইয়াকীন” গাছে বসে সত্তর হাজার বৎসর এ নাম জপে ছিলেন। “সত্তর হাজার”কথাটিও এক রহস্যপূর্ণ চিরন্তন শাশ্বত কথা।
এরপর “ইরফানের”একটি আয়না বা দর্পণ সামনে এলো তাতে স্বীয় অস্তিত্বে পাঁচটি ছুরত দেখে ছিল - যা ছিল পাক পাঞ্জাতন। এ বেলায়তী পাক পাঞ্জাতনের সমষ্টি রূপ নিয়েই বেহেশতী গাছে মোহাম্মদী ফুল রূপে ছিলেন। হকিকতে মোহাম্মদী হতে পাক পাঞ্জাতন বিকশিত হওয়ার ধারাটি হলো :
১. হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) – নূরের উৎস
তিনি হলেন মূল নূরের প্রকাশ, মানবজাতির জন্য সর্বশেষ রাসূল, এবং পূর্ণতম মানব (ইনসানে কামেল)। তাঁর মধ্যেই আল্লাহর নূর সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়।
২. হযরত ফাতিমা (আঃ) – পবিত্রতা ও মাতৃত্বের রূপ
তিনি হলেন আহলে বাইতের হৃদয়, মা, কন্যা ও স্ত্রীর আধ্যাত্মিক প্রতীক। তাঁর মাধ্যমে দয়াময়ী রূপ ও কুরবানির শক্তি প্রকাশ পায়। আল্লাহপাক হাকিকতে মোহাম্মদীকে জহুর করে তাঁর প্রতি মহব্বতের নজরে তাওয়াজ্জ্ব দেন মানে তাঁর নিজের প্রতি নিজের যে ভালবাসা ছিল তা তাওয়াজ্জ মারফত ‘ইলকা" করেন। তাতে “হুব্বে এলাহীর” প্রবলভাব ধারণ করে, ফলে হাকিকতে মোহাম্মদী এতো অস্থির হন যে, তাতে কম্পন সৃষ্টি হয় এবং ডান দিকের এক অংশ পৃথক হয়ে খসে পড়ে ও কাঁপতে থাকে। মাওলাপাক তখন হাকিকতে মোহাম্মদীর মাধ্যমে ঐ খন্ডিত অংশের উপর রহমতের নজর নিক্ষেপ করেন, তাতে নারী জাতির স্বরূপ প্রকাশ করেন। ইনিই বাস্তব জগতে হযরত মা ফাতেমা (আঃ) হয়েছিলেন।
৩. হযরত আলী (আঃ) – জ্ঞান ও ন্যায়ের রূপ
তিনি হলেন ইসলামের প্রথম ইমাম, জ্ঞান, ন্যায়বিচার ও আল্লাহর প্রেমের প্রতীক। সুফি মতে, তাঁর মধ্য দিয়ে নূরে মোহাম্মদী আল্লাহর গোপন জ্ঞানের বাহক হিসেবে প্রকাশিত হয়। এবার আল্লাহপাক দ্বিতীয়বার হাকিকতে মোহাম্মদীর প্রতি মহব্বতের নজরে তাওয়াজ্জ্ব দিলেন। তখন বাম দিক হতে আরেকটি অংশ হাকিকতে মোহাম্মদী হতে পৃথক হয়ে যায় এবং প্রথম অংশের সংরক্ষক ও জোড়া হিসাবে একটি পুরুষ আকৃতি প্রকাশিত হলো। ইনিই হলেন মাওলা আলী (আঃ)।
৪. হযরত হাসান (আঃ) – শান্তির প্রতীক
তিনি শান্তির বার্তাবাহক, উম্মতের ঐক্য ও সংহতির প্রতীক। তিনি প্রমাণ করেন, কখন কখন যুদ্ধ নয়, বরং শান্তি ও সংযমই বৃহত্তর জয়। এ দু"ছুরত প্রকাশ হওয়ার পর আল্লাহ হাকিকতে মোহাম্মদীর প্রতি তৃতীয়বার দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন। এতে আরো একটি অংশ পৃথক হয়ে পড়ে এবং দু"ভাগ হয়ে দুটি আকৃতি প্রকাশ পায়। প্রথম যে আকৃতি প্রকাশ পায় তা মাথা হতে নাভী পর্যন্ত হুজুর (সাঃ) এর আকৃতির মতো এবং ইনিই হলেন ইমাম হাসান (আঃ)।
৫. হযরত হুসাইন (আঃ) – আত্মত্যাগ ও সত্যের রূপ
তিনি হলেন সত্য ও ন্যায়ের জন্য আত্মোৎসর্গের চূড়ান্ত প্রতীক। কারবালার প্রান্তরে তাঁর শাহাদাত নূরে মোহাম্মদীর সর্বোচ্চ বিকাশ হিসেবে দেখা হয়। আল্লাহ হাকিকতে মোহাম্মদীর প্রতি তৃতীয়বার দৃষ্টি নিক্ষেপ করার ফলে দ্বিতীয় ভাগটি দ্বারা যে আকৃতি প্রকাশ পায় তার নাভী হতে পা পর্যন্ত হুজুর (সাঃ) এর মতো এবং বাস্তবে ইনিই হলেন ইমাম হুসাইন (আঃ)।
এজন্যই রাছুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন :  “আনা ওয়া আলীউন নুরীন মিন ওয়াহিদ”অর্থাৎ আমি এবং আলী একই নূরের দু"খন্ড। “আলী মিন্নী ওয়া আনা মিনাল আলী”অর্থাৎ আলী আমা হতে এবং আমি আলী হতে। “ফাতেমা মিন্নী ওয়া আনা মিনাল ফাতেমা। হাসান মিন্নী ওয়া আনা মিনাল হাসান। হুসাইন মিন্নী ওয়া আনা মিনাল হুসাইন" অর্থৎ ফাতেমা আমা হতে এবং আমি ফাতেমা হতে। হাসান আমা হতে এবং আমি হাসান হতে। হুসাইন আমা হতে এবং আমি হুসাইন হতে। মাওলা আলী (আঃ) বলেছেনঃ হাসান হলেন মাথা হতে বক্ষ পর্যন্ত রাছুলুল্লাহ (সাঃ) সদৃশ। আর হুসাইন হলেন নাভী হতে পা পর্যন্ত রছুলুল্লাহ (সাঃ) সদৃশ । [ তিরমিজ, মেশকাত শরীফের ১১ তম খন্ড ]।
নূরে মোহাম্মদী ও পাক পাঞ্জাতনের সম্পর্ক
এই পাঁচজনের মধ্যে রয়েছে এক গভীর আধ্যাত্মিক ঐক্য ও নূরানী বন্ধন। ইসলামি মিস্টিসিজম বা তাসাউফ অনুযায়ী, এদের প্রত্যেকের মধ্যেই নূরের আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য প্রতিফলিত হয়েছে, যেমন:
হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) – নূরের উৎস
হযরত আলী (আঃ) – শক্তি ও সত্য
হযরত ফাতিমা (আঃ) – করুণা ও বিশুদ্ধতা
হযরত হাসান (আঃ) – শান্তি ও ধৈর্য
হযরত হুসাইন (আঃ) – কুরবানি ও ন্যায়
সুফি ও শিয়া তত্ত্ব অনুযায়ী গুরুত্ব
শিয়া ইসলাম বিশেষভাবে পাক পাঞ্জাতনকে কেন্দ্র করে ঈমান, আখলাক ও আধ্যাত্মিক পথনির্দেশ গড়ে তোলে। সুফি তরিকার মতে, নূরে মোহাম্মদী হচ্ছে সেই দ্যবীয় সত্তা যার মাধ্যমে আল্লাহর রহমত ও হেদায়েত বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।
উপসংহার 
উপরোক্ত বর্ণনা মোতাবেক বিষয়টি স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, নূরে মুহাম্মাদী পাক পাঞ্জাতনের মূল এবং তা থেকেই পাক পাঞ্জাতন সৃষ্টি হয়। পাক পাঞ্জাতন মূলত রাসূল (সা.) এর অংশ তাতে কোনো প্রকার সন্দেহ নাই।


No comments

Powered by Blogger.