Header Ads

কৃষ্ণ: পরোপকারী, রাজনীতিজ্ঞ ও প্রেমিক

 ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন এক বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্বের প্রতীক—যিনি একাধারে ভক্তদের প্রেমভাজন, এক নিপুণ কূটনীতিক ও একজন নির্ভেজাল পরোপকারী। জন্মাষ্টমী কৃষ্ণের জন্মতিথি। ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টম তিথিতে শ্রীকৃষ্ণের জন্মোৎসব। এ উপলক্ষে উপবাস, কৃষ্ণের পূজা, চন্দ্রকে অর্ঘ্যদান ও রাত্রি জাগরণ সেরে রোহিণীব্রত পালন করলে সাত জন্মের পাপমুক্তি ঘটে। শাস্ত্রে আরও কথিত আছে, কোনো সক্ষম পুরুষ বা নারী এ দিন উপবাস না করলে পরজন্মে রাক্ষস বা সর্প হয়ে তাকে বনবাস করতে হবে। 

কৃষ্ণ বিষ্ণুর অষ্টম অবতার। তাঁকে স্বয়ং ভগবান এবং বিষ্ণুর পূর্ণাবতারও মনে করা হয়। গীতায় বলা হয়েছে যে, অধর্ম ও দুর্জনের বিনাশ এবং ধর্ম ও সজ্জনের রক্ষার জন্য যুগে যুগে পৃথিবীতে তাঁর আগমন ঘটে। পৃথিবীর ভারমোচন তাঁর প্রাথমিক দায়িত্ব হলেও একজন মর্তজীবী মানুষ হিসেবে রাজনীতি, সমাজ, সংসার ইত্যাদি ক্ষেত্রেও তাঁকে কর্তব্য পালন করতে দেখা যায়।

কৃষ্ণ চরিত্রটি একই সঙ্গে চমকপ্রদ ও বৈচিত্র্যময় 

বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত কাহিনি থেকে তাঁর তিনটি প্রধান রূপ লক্ষ করা যায়: পরোপকারী, প্রেমিক ও রাজনীতিজ্ঞ। শিশুবয়সেই কৃষ্ণের পরোপকারী ভূমিকাটির পরিচয় পাওয়া যায়। প্রথম জীবনেই কৃষ্ণ যে কাজগুলো করেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কংসবধ। অত্যাচারী কংস ছিলেন মথুরার রাজা। তিনি নিজের পিতা উগ্রসেনকে কারাগারে আটক রেখে সিংহাসন অধিকার করেন। কংসের নির্দেশে পূতনা রাক্ষসী তার বিষাক্ত স্তন্য পান করিয়ে একের পর এক শিশুদের হত্যা করতে থাকে। কিন্তু কৃষ্ণকে হত্যা করতে গেলে তাঁর হাতে পূতনা রাক্ষসী নিজেই নিহত হয়। এভাবে শিশু কৃষ্ণ গোকুলের শিশুদের রক্ষা করেন। এরপর একে একে তিনি বৎসাসুর, অঘাসুর, বকাসুর প্রভৃতি অপশক্তিকে বিনাশ করেন। এ ছাড়া কালীয়দহে কালীয় নাগ দমন, বৃন্দাবনকে রক্ষার জন্য দাবাগ্নি পান, ইন্দ্রের আক্রোশ থেকে গোপদের রক্ষার জন্য আঙুলে গোবর্ধনগিরি ধারণ ইত্যাদির মাধ্যমে তিনি বালক বয়সেই মর্তবাসীর উপকার করেন। অশুভ শক্তির হাত থেকে শুভ শক্তিকে রক্ষার জন্য কৃষ্ণ পরবর্তীকালে আরও অনেক দুরাচারীকে হত্যা করেন বা করান।

১. কৃষ্ণ: পরোপকারী (জনহিতকর)

জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে কৃষ্ণ নিঃস্বার্থভাবে মানুষের উপকার করেছেন:

  • গোবর্ধন পর্বত ধারণ: ইন্দ্রের প্রাকৃতিক প্রতিহিংসা থেকে ব্রজবাসীদের রক্ষা করতে কৃষ্ণ নিজের আঙুলে গোবর্ধন পর্বত ধরে সাত দিন পর্যন্ত তাঁদের বাঁচিয়ে রাখেন।
  • সুদামার প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা: শৈশবের বন্ধু সুদামা কৃষ্ণের কাছে কিছু না চেয়ে আশীর্বাদ পায়; কৃষ্ণ তার দারিদ্র্য দূর করে, বিনিময়ে কিছুই চাননি।
  • দ্রৌপদীর রক্ষাকর্তা: কৌরবদের সভায় দ্রৌপদী যখন চরম অপমানের মুখে পড়ে, তখন কৃষ্ণ তাঁর অস্তিত্ব রক্ষা করেন অসীম শাড়ি প্রদান করে।
  • গীতা জ্ঞানের দান: অর্জুন যখন ভ্রান্ত হয়ে পড়েন ধর্ম ও কর্তব্য নিয়ে, তখন কৃষ্ণ উপদেশ দেন যা গীতার রূপে আজও মানবজাতিকে আলোকিত করে।
  • দুঃখীর বন্ধু: শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন নিঃস্বার্থভাবে মানুষের কল্যাণে নিবেদিত। সুধামিত্র সুধামার প্রতি তাঁর মধুর ও সাহায্যকারী মনোভাব ছিল হৃদয়স্পর্শী উদাহরণ।
  • গীতার উপদেশক: যুদ্ধের ময়দানে শুধু অর্জুন নয়, সমগ্র মানবজাতিকে তিনি আত্মিক জ্ঞান দিয়েছেন—এই দানের লক্ষ্য একটাই: জীবের মুক্তি ও কল্যাণ।
  • গোপরক্ষা ও জনহিত: ছোট বয়সেই তিনি কালীয় নাগ দমন, গিরিরাজ গোবর্ধন ধারণ করে গ্রামবাসীকে প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেন।

২. কৃষ্ণ: রাজনীতিজ্ঞ ও কূটনীতিক

তিনি ছিলেন এক জটিল সময়ের বাস্তববাদী ও দূরদর্শী রাজনীতিক:

  • কূটনীতিতে দক্ষতা: যুদ্ধের পূর্বে কৃষ্ণ “শান্তির দূত” হয়ে কৌরবদের কাছে যান, কিন্তু দুর্যোধনের অহংকার ও অস্বীকৃতির পর, কৃষ্ণ বাস্তবতা বুঝে কৌশল পাল্টান।
  • অস্ত্রহীন কৌশল: তিনি বলেছিলেন, "আমি যুদ্ধ করবো না, কিন্তু আমার অস্ত্রবিহীন উপস্থিতিও যে অনেক বেশি কার্যকর, তা কুরুক্ষেত্রে প্রমাণিত।"
  • ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ ও জয়দ্রথ-বিনাশে ভূমিকা: কৃষ্ণ নিজ হাতে কাউকে না মারলেও কৌশলে পাণ্ডবদের দিয়ে শত্রুদের পরাজিত করান। উদাহরণ: অর্জুনকে সূর্যগ্রহণ কৌশল শিখিয়ে জয়দ্রথকে হত্যা করানো।
  • ধর্ম-রাষ্ট্রনীতি: কৃষ্ণ কখনও ধর্মের বিপরীতে যাননি; কিন্তু প্রয়োজনে নীতিগত ব্যতিক্রম করেছেন ধর্ম ও ন্যায়ের বৃহৎ প্রতিষ্ঠার জন্য।
  • দূরদর্শী কৌশলী: কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পূর্বে তিনি পান্ডব ও কৌরবদের মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করেন, কিন্তু তা ব্যর্থ হলে রাজনৈতিক বিচক্ষণতার পরিচয় দেন।
  • নীতিনির্ধারক: কৃষ্ণ কখনও অস্ত্র ধারণ না করেও কৌশলে যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেন—ভীষ্ম ও দ্রোণাচার্যের পতনে তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য।
  • নৈতিক ও বাস্তববাদী রাজনীতি: কৃষ্ণের রাজনীতি কেবল ক্ষমতা নয়, ধর্ম ও সত্য প্রতিষ্ঠার উপর নির্ভর করে।

৩. কৃষ্ণ: প্রেমিক ও রসস্বরূপ

প্রেম তাঁর জীবনের অনন্য দিক—যা শুধুই রোমান্টিক নয়, বরং আধ্যাত্মিক ও চেতনামূলক:

  • রাধা-কৃষ্ণের প্রেম: এটি আত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মিলনের রূপক। কৃষ্ণ কখনও রাধার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হননি, তবুও তাঁরা ভক্তিচেতনায় চিরকালীন যুগল।
  • গোপিনীদের সঙ্গে রাসলীলা: এটি এক সাধারণ প্রেম নয়—ভক্তির শীর্ষ অভিব্যক্তি। রাসলীলায় প্রতিটি গোপীর সঙ্গে একসাথে নৃত্য করে কৃষ্ণ সকল ভক্তকে জানান, তিনি সবার, এবং সবাই তাঁর।
  • স্ত্রীদের প্রতি দায়িত্ব: কৃষ্ণের বিবাহিত জীবনে ১৬,১০৮ স্ত্রী থাকলেও, প্রতিজনকে তিনি সমান মর্যাদা ও ভালোবাসা দিয়েছেন। এটি এক পরম মানবিক ও দায়িত্বশীল প্রেমের নজির।
  • রাধার সঙ্গে অমর প্রেম: কৃষ্ণ-রাধার প্রেম নিঃস্বার্থ, পারমার্থিক ও আধ্যাত্মিক প্রেমের প্রতীক। এটি আজও ভক্তিসাহিত্য ও সংগীতে চিরন্তন।
  • গোপিনীদের সঙ্গে লীলাময় সম্পর্ক: বৃন্দাবনে কৃষ্ণের রাসলীলা প্রেম, ভক্তি ও সঙ্গীতের এক অনবদ্য মেলবন্ধন।

কৃষ্ণের বহুরূপী মহিমা

কৃষ্ণের জীবনের অবতার ও কাজের বিভিন্ন দিক এবং তার অসীম ক্ষমতা, বৈচিত্র্য ও মহত্ত্বের বর্ণনা। “শ্রীকৃষ্ণ” কোনো একক পরিচয়ের মানুষ নন—তিনি সময়ের ঊর্ধ্বে এক আদর্শ পুরুষ, যাঁর চরিত্রে:

  • ধর্ম আছে, কিন্তু কূপমণ্ডূকতা নেই,
  • প্রেম আছে, কিন্তু ভোগ নেই,
  • কৌশল আছে, কিন্তু প্রতারণা নয়,
  • ক্ষমতা আছে, কিন্তু অহংকার নয়।

উপসংহার

মহাভারতে কৃষ্ণ একজন রাজনীতিক, যোদ্ধা, কূটনীতিক এবং দার্শনিকরূপে চিত্রিত হয়েছেন। পাণ্ডবদের পক্ষে তিনি দৌত্যক্রিয়া ও তাঁদের রাজ্য ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য সুপারিশ, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে পাণ্ডবদের পরামর্শ দান ও শেষ পর্যন্ত তাঁদের বিজয়ী করা, দুর্যোধন প্রমুখ দুর্জনদের বিনাশ করে ধর্মকে প্রতিস্থাপন ইত্যাদি কাজ করেন। দুষ্টের দমন ও অধর্মের বিনাশ করে তিনি জগদ্বাসীর কাছে শিষ্টের পালন ও ধর্ম প্রতিষ্ঠার নজির স্থাপন করেছেন। আপন যদুবংশে অনাচার দেখা দিলে তাও তিনি কঠোর হাতে দমন করেন। কৌশলে যদুবংশ ধ্বংস করেন। 




No comments

Powered by Blogger.