Header Ads

কোরআন ও হাদীস মোতাবেক মা ফাতেমা (আঃ) ও মাওলা আলী (আঃ)-এর গলার হার দানের বিস্ময়কর ঘটনা

ইসলামের ইতিহাসে হযরত আলী (আঃ) ও হযরত ফাতিমা (আঃ)-এর জীবন আদর্শ ত্যাগ, খোদাভীতি এবং মানবতার প্রতীক। তাঁদের প্রতিটি কাজ ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। এর একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হল,  তিন দিন টানা ক্ষুধার্ত থাকার পরেও গলার হার সহ সব কিছু দরিদ্রদের দান করে দেওয়ার ঘটনা, যা কোরআনে কারীমে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করেছেন।

ঘটনার প্রেক্ষাপট

মদিনায় অবস্থানকালে হযরত আলী (আঃ), হযরত ফাতেমা (আঃ), এবং তাঁদের দুই পুত্র ইমাম হাসান (আঃ) ও ইমাম হুসাইন (আঃ) একটি মানত করেন যে, তারা একটি প্রয়োজন পূর্ণ হলে তিন দিন রোজা রাখবেন। তারা তিনদিন রোজা রাখেন।

প্রথম দিন ইফতারের সময়, দরজায় আসে একজন মিসকিন (দরিদ্র লোক), দ্বিতীয় দিন ইয়াতীম (এতিম শিশু) এবং তৃতীয় দিন আসীর (বন্দী বা কয়েদি)। প্রত্যেক দিন তাঁরা তাঁদের নিজেদের অল্প ইফতারি, যা ছিল মাত্র কিছুটা রুটি ও পানি, তাদের দিয়ে দেন এবং নিজেরা কেবল পানি পান করে রাত কাটান।

গলার হার দানের বিষয়টি

এক হাদীসে উল্লেখ আছে, তৃতীয় দিন হযরত জাবির বিন আবদুল্লাহ্ আনসারী (রাঃ) বলেন-একদিন রাসূলে খোদা (সাঃ) আসরের নামাজ আমাদের সাথে আদায় করেন। নামাজ শেষে তিনি কেবলামুখী হয়ে বসেছিলেন এবং লোকজন তাঁর চারপাশে জড় হয়েছিল। তখন একজন আরব বৃদ্ধ মুহাজির দয়াল রাসূল পাক (সাঃ) এর নিকট আসেন এবং রাসূল পাক (সাঃ) কে বলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমি ক্ষুধার্ত, আমাকে অন্ন দান করুন। আমার পরনের কাপড় নেই, আমাকে পরিধেয় বস্ত্র দান করুন। আমি নিঃস্ব, দরিদ্র, আমাকে দয়া করে কিছু দিন।

দয়াল রাসূল পাক (সাঃ) বললেন, আমার দেয়ার মত কিছু নেই। তবে তুমি ফাতেমার বাড়িতে যাও। সে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে ভালবাসে এবং আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলও তাকে ভালবাসে, সে আল্লাহর পথে দান করে থাকে। দয়াল রাসূল পাক (সাঃ) হযরত বেলালকে ডেকে বললেন, হে বেলাল! তুমি এই বৃদ্ধ লোকটিকে ফাতেমার বাড়ীতে পৌঁছিয়ে দিয়ে আসো। বৃদ্ধ লোকটি হযরত বেলালের সাথে মা-ফাতেমার গৃহের দ্বারে পৌঁছেন, সেখান থেকেই বৃদ্ধ উচ্চৈঃস্বরে বললেন, আসসালামু আলাইকুম।

মা-ফাতেমা উত্তরে বললেন, ওয়া আলাইকুমুস সালাম, আপনি কে? বৃদ্ধ লোকটি বললেন, আমি একজন বৃদ্ধ আরব, আমি ক্ষুধার্ত ও বস্ত্রহীন। আমাকে দয়া ও অনুগ্রহ দানে ধন্য করুন, আল্লাহ্ আপনার উপর রহমত বর্ষণ করুন। এ সময়ে মা-ফাতেমা, মাওলা আলী তিন দিন যাবৎ কিছু খান নি। মা-ফাতেমা দুম্বার চামড়া বিশিষ্ট হাসান ও হুসাইন (আঃ) এর বিছানাটি হাতে তুলে নিয়ে বললেন, হে দরজার বাইরে দন্ডায়মান ব্যক্তি! এটা নিয়ে যাও। আশা করি আল্লাহ্ তোমাকে এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করবেন।

আরব বৃদ্ধটি বললেন, হে মুহাম্মদ (সাঃ) এর কন্যা! আপনার কাছে আমি ক্ষুধা নিবৃত্তির কথা বলেছি আর আপনি আমাকে পশুর চামড়া দিচ্ছেন, আমি এ চামড়া দিয়ে কি করবো? মা-ফাতেমা বৃদ্ধ লোকটির কথা শুনে হযরত হামযা (রাঃ) এর কন্যা মা ফাতেমা (আঃ) এর দেয়া উপহার তার গলার হারটি খুলে বৃদ্ধ লোকটিকে দান করে দিলেন আর বললেন, এটাকে নিয়ে বিক্রি কর। আশা করি আল্লাহ তোমাকে এর চেয়ে আরো উত্তম কিছু দান করবেন।

মা-ফাতেমার দেয়া গলার হারটি বিক্রির কাহিনী 

আরব মুহাজির গলার হারটি নিয়ে মসজিদে নববীতে পৌঁছলেন। বৃদ্ধ আরব বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)! এই গলার হারটি মা-ফাতেমা আমাকে দান করেছেন। দয়াল রাসূল পাক (সাঃ) আর চোখের অশ্রু ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি বললেন, যে জিনিস সমগ্র নারীকুলের নেত্রী ফাতেমা তোমাকে দিয়েছে কি করে সম্ভব তার দ্বারা আল্লাহ তোমার প্রয়োজন মিটাবেন না? রাসূল পাক (সাঃ) বললেন, 

যদি সমস্ত জিন ও ইনসান এটা ক্রয়ের মধ্যে অংশগ্রহণ করে আল্লাহ তাদের সকলের উপর থেকে দোজখের আগুন উঠিয়ে নিবেন। তখন হযরত আম্মার জিজ্ঞেস করেন, হে আরব বৃদ্ধ! এ গলার হারটি কত বিক্রি করবে? বৃদ্ধ লোকটি জবাবে বললেন, এ গলার হারের পরিবর্তে আমার জন্যে এতটুকুই যথেষ্ট যে, আমি যেন তা দিয়ে কিছু রুটি ও মাংস কিনে ক্ষুধা নিবারণ করতে পারি এবং একটা কাপড় কিনে আমার দেহ আবৃত করতে পারি যেন সে কাপড় দিয়ে আল্লাহর দরবারে নামাজে দাঁড়াতে পারি। আর কয়েকটি দিনারই যথেষ্ট যা আমি আমার পরিবারকে দিতে পারি। হযরত আম্মার বলেন, এ গলার হারের বিনিময়ে আমি তোমাকে বিশ দিনার ও দু'শ দেরহাম, একটি ইয়েমানী পোশাক এবং একটি উট দিবো যার মাধ্যমে তুমি তোমার পরিবারের নিকট পৌঁছতে পার। বৃদ্ধ লোকটি বললেন, হে পুরুষ! তুমি অত্যন্ত দানশীল। অতঃপর সে লোকটি হযরত আম্মারের সাথে তাঁর গৃহে গেল। হযরত আম্মার প্রতিশ্রুতি মোতাবেক সব কিছু সে লোকটিকে দিলেন। বৃদ্ধ লোকটি মালামাল নিয়ে রাসূল পাক (সাঃ)এর কাছে এলেন। তিনি জিজ্ঞেস করেন, এখন তোমার ক্ষুধা মিটেছে? তোমার পরিধেয় বস্ত্র পেয়েছো? উত্তরে লোকটি বললেন। জি,হ্যাঁ! আমার প্রয়োজন মিটেছে, আমার পিতা-মাতা আপনার জন্যে উৎসর্গ হোক।

বৃদ্ধ আরব কর্তৃক মা-ফাতেমার প্রতি আল্লাহর দরবারে মোনাজাত 

দয়াল রাসূল পাক (সাঃ) বললেন, তাহলে ফাতেমার জন্যে তাঁর অনুগ্রহের কারণে দোয়া কর। তখন আরব মুহাজির লোকটি এভাবে দোয়া করলেন, হে আল্লাহ্! তুমি সর্বদাই আমার প্রভু। তুমি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্যের আমি ইবাদত করি না। হে পরোয়ারদিগার! মা ফাতেমা (আঃ) কে এমন সব কিছু দাও যা চক্ষু কখনো অবলোকন করেনি আর কোন কর্ণ কখনো শ্রবণ করেনি। দয়াল রাসূল পাক (সাঃ) তার দোয়ার শেষে আমিন বললেন এবং তাঁর সাহাবীদের প্রতি তাকিয়ে বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ এ পৃথিবীতে ফাতেমাকে এই দোয়ার ফল দান করেছেন। কেননা আমি তাঁর পিতা, আমার সমকক্ষ পৃথিবীতে অন্য কেউ নেই। আর আলী তাঁর স্বামী। যদি আলী না থাকতো তাহলে কখনো তাঁর সমকক্ষ স্বামী খুঁজে পাওয়া যেত না। আল্লাহ্ ফাতেমাকে হাসান ও হুসাইনকে দান করেছেন। বিশ্বের বুকে মানবকূলের মাঝে তাদের ন্যায় আর কেউ নেই। কেননা তাঁরা বেহেশতের যুবকদের সর্দার।

কোরআনের বর্ণনা

এই অনন্য ঘটনার প্রতিদানস্বরূপ আল্লাহ তাআলা সুরা দাহর/সুরা ইনসান (৭৬) অবতীর্ণ করেন। সেখানে বলা হয়েছে: "তারা আল্লাহর ভালোবাসায় দরিদ্র, এতিম ও বন্দিকে আহার্য দান করে। তারা বলে, ‘আমরা কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই তোমাদের আহার্য দান করছি; তোমাদের নিকট থেকে আমরা কোনো প্রতিদান বা কৃতজ্ঞতা চাই না।’”  (সুরা ইনসান, আয়াত ৮-৯)

এই ঘটনার তাৎপর্য

১. ত্যাগের সর্বোচ্চ উদাহরণ

তিনদিনের উপবাস থাকা সত্ত্বেও কোনো অনুশোচনা ছাড়াই নিজের খাবার দান করে দেওয়ার ঘটনা মানবতার শীর্ষে স্থান পায়।

২. আল্লাহর সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার

তারা বললেন, “আমরা এটা করছি লিল্লাহি — শুধুমাত্র আল্লাহর রেজার জন্য।” এখানে আত্মপ্রদর্শন, স্বার্থ বা বিনিময়ের আশা নেই।

৩. পবিত্র গহনার ত্যাগ

মা ফাতেমা (আঃ)-এর নিজের গলার হার দান কেবল জিনিস নয় — এটি আত্মা থেকে আসা ঈমান ও ভালোবাসার প্রতীক।

হাদীসে এর উল্লেখ

এই ঘটনার বর্ণনা অনেক হাদীস গ্রন্থে এসেছে। যেমন:

ইমাম ফখরুদ্দীন আর-রাজী তাঁর তাফসীরে বলেন: “এই আয়াতগুলি নাযিল হয়েছে আহলে বাইত — ফাতেমা, আলী, হাসান ও হুসাইনের জন্য।”

হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এই ঘটনায় অশ্রু বিসর্জন করে বলেন: “যে পরিবার তিন দিন উপবাস থেকেও নিজের খাবার দিয়ে দেয়, তাদের জন্য জান্নাতে নিশ্চিত পুরস্কার আছে।”

উপসংহার

ইখলাস ও আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা আমাদের দান ও সদকার মূল শিক্ষা। আহলে বাইতের আখলাক আজকের সমাজের জন্য অনুকরণীয়। প্রকৃত দান তখনই হয় যখন তা প্রয়োজনের সময় দেওয়া হয়, স্বেচ্ছায়, বিনিময়ের প্রত্যাশা ছাড়াই।



No comments

Powered by Blogger.