মুহাম্মাদ (ﷺ) কে বিশ্বসৃষ্টির উছিলা করার কারণ – কোরআন, হাদিস ও সুফী মতে বিশদ বিশ্লেষণ
ইসলামী আধ্যাত্মিকতায় রাসুলুল্লাহ মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর মর্যাদা অতুলনীয়। বহু ইসলামী তাফসির, হাদিস ও সুফী ব্যাখ্যায় বলা হয় যে, আল্লাহ তাআলা বিশ্বজগতকে সৃষ্টি করেছেন প্রিয়নবি মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উছিলায় বা কারণে। এই বক্তব্যের ভিত্তি পাওয়া যায় বিভিন্ন উৎসে—কোরআনের আয়াত, নবিজির বাণী, এবং সুফী চিন্তাধারায়।
১. কোরআনের আলোকে
কোরআনে সরাসরি কোথাও বলা হয়নি যে মুহাম্মাদ (ﷺ) এর কারণে পুরো সৃষ্টি করা হয়েছে, তবে কিছু আয়াতে রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর গুরুত্ব, দায়িত্ব এবং মর্যাদা স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়।
কোরআন বলছে: "আমি আপনাকে পাঠিয়েছি জগতসমূহের প্রতি রহমতস্বরূপ।" (সূরা আল-আনবিয়া ২১:১০৭)
এই আয়াতটি ইঙ্গিত করে যে, মুহাম্মাদ (ﷺ) কেবল একটি জাতি বা সময়ের জন্য নয়, বরং সমগ্র সৃষ্টির কল্যাণ ও দয়ালু বার্তা নিয়ে আগমন করেছেন। এটি পরোক্ষভাবে বোঝায় যে, তাঁর অস্তিত্ব সৃষ্টি-কার্যের এক মহান উদ্দেশ্য।
২. হাদিসের আলোকে
রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর মর্যাদা সম্পর্কিত কিছু বিখ্যাত হাদিস রয়েছে, যার মধ্যে কিছু সরাসরি বিশ্বসৃষ্টির প্রসঙ্গে এসেছে। মহানবী (ﷺ)-এর কারণেই হযরত আদম (আ:)ও সমগ্র জগতের সৃষ্টি হয়েছে। তিনি না হলে আরশ ও ফরশ, লওহ ও কলম, বেহেশত ও দোযখ, গাছ ও পাথর এবং অন্যান্য সকল সৃষ্টি অস্তিত্ব পেতো না। এর সমর্থনে অনেক হাদীস বিরাজমান।
হযরত আমীরুল মো’মেনীন ফারুকে আ’যম (রা:)-এর বাণী: হুযূর পূর নূর (দ:) বলেন যে মহান আল্লাহ বলেছেন, আদম (আ:) যখন গন্দম খেলেন, তখন তিনি আরয করেন, ইয়া আল্লাহ! মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)-এর ওয়াস্তে আমায় মাফ করুন।
আল্লাহ বলেন, ওহে আদম! তুমি কীভাবে তাঁর কথা জানলে যেহেতু আমি তাঁকে এখনো সৃষ্টি করিনি? আদম (আ:) উত্তর দেন, ইয়া আল্লাহ আপনি আমাকে সৃষ্টি করে আমার মাঝে রূহ ফোঁকার পরে আমি মাথা তুলে দেখতে পাই আরশে লেখা রয়েছে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (দ:)’। তাই আমি বুঝতে পারি যে আপনার সবচেয়ে প্রিয় কারো নামই আপনার নামের পাশে আপনি যুক্ত করেছেন। নিশ্চয় মহানবী (দ:) আমার সবচেয়ে প্রিয়ভাজন, আর তাই তুমি যখনই তাঁর অসিলায় আমার কাছে ক্ষমা চেয়েছ, তখনই আমি তোমায় ক্ষমা করেছি। রাসূলুল্লাহ (দ:) না হলে আমি তোমাকে সৃষ্টি করতাম না। ( ইমাম সুবকী কৃত ’আশ্ শিফাউস্ সিকাম’ এবং শেহাবউদ্দীন খাফাজী প্রণীত ‘নাসীম আর-রিয়াদ’ বইগুলোতেও বর্ণিত।)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) থেকে বর্ণনা করেন,যিনি বলেন, আল্লাহ পাক হযরত ঈসা (আ:) কে বলেছেন, ওহে ঈসা মহানবী (দ:) এর প্রতি ঈমান আনো এবং তোমার উম্মতকেও তা করতে বলো। রাসূলুল্লাহ (দ:) না হলে আমি আদমকে সৃষ্টি করতাম না, বেহেশত বা দোযখও সৃষ্টি করতাম না। ইমাম তাকিউদ্দীন সুবকী রচিত ‘শিফাউস্ সিকাম’ ও শায়খুল ইসলাম আল-বুলকিনী প্রণীত ‘ফতোওয়া’ এবং ইবনে হাজর রচিত ‘আফদাল আল-কুরআন’ গ্রন্থগুলোতে বর্ণিত আছে।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) থেকে বর্ণনা করেন,যিনি বলেন, রাসূলে খোদা (দ:) বলেছেন যে, হযরত জিবরীল আমীন (আ:) তাঁর কাছে আসেন এবং বর্ণনা করেন আল্লাহর বাণী, ‘আমি (খোদা স্বয়ং) আপনাকে (রাসূল-এ-পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামকে) সৃষ্টি না করলে বেহেশত বা দোযখ সৃষ্টি করতাম না’।
ইবনে আসাকির বর্ণনা করেন হযরত সালমান ফারসী (রা:)-কে, যিনি বলেন, হুযূর পূর নূর (দ:)-এর কাছে জিবরীল আমীন(আ:) এসে পৌঁছে দেন আল্লাহর বাণী,‘(হে রাসূল) আপনার চেয়ে অধিক সম্মানিত আর কাউকেই আমি সৃষ্টি করিনি। আমি বিশ্বজগত ও এর মধ্যে যা কিছু আছে তার সবই সৃষ্টি করেছি যাতে তারা জানতে পারে আপনার মহান মর্যাদা সম্পর্কে। আমি এই বিশ্বজগত সৃষ্টি করতাম না, যদি আপনাকে সৃষ্টি না করতাম’।
৩. সুফী মতে মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর নূরের সৃষ্টি
সুফীবাদে মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে "নূরে মুহাম্মাদী" বলা হয়। তারা বিশ্বাস করেন যে, আল্লাহ সর্বপ্রথম মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর নূর সৃষ্টি করেন এবং সেই নূরের মাধ্যমেই জগত সৃষ্টি করেন।
ক. "নূরে মুহাম্মাদী" এর ধারণা
ইমাম কাশানী, ইবনে আরাবী ও জালালউদ্দিন রুমী বলেন, “আল্লাহ প্রথমে মুহাম্মদ (ﷺ)-এর আলো বা আত্মিক সত্তা সৃষ্টি করেন।”
এরপর সেই আলো থেকে ফেরেশতা, আরশ, কুরআন, নবি, এবং অবশেষে দুনিয়ার সবকিছু সৃষ্টি করেন।
খ. ইবনে আরাবীর ব্যাখ্যা
ইবনে আরাবী তাঁর “ফুতূহাতুল মাক্কিয়্যাহ” গ্রন্থে বলেন: "নবুওতের প্রথম প্রকৃতি বা হাকীকত মুহাম্মাদিয়া (الْحَقِيقَةُ الْمُحَمَّدِيَّةُ)–এর মাধ্যমেই সৃষ্টির সূচনা।"
সত্যপন্থী বুযূর্গানে দ্বীন ও উলামা বৃন্দের উক্তি
সত্যপন্থী বুযূর্গানে দ্বীন ও উলামাবৃন্দ মহানবী (দ:)-কে ’হযরত আদম (আ:) ও বিশ্বজগত সৃষ্টির কারণ’ হিসেবে সম্বোধন করেছেন। তাঁদের এ সব বাণী সংকলন করলে বিশালাকৃতির বই হবে। এর মধ্য থেকে কিছু বাণী বর্ণনা করা হলো:-
ইমাম সাইফুদ্দীন আবূ জা’ফর বিন উমর আল-হুমাইরী আল-হানাফী নিজ ‘আদ-দুররূল তানযীম ফী মওলিদিন নাবিই-ইল করীম’ শীর্ষক কেতাবে বলেন:- আল্লাহ তা’লা যখন হযরত বাবা আদম (আ:)-কে সৃষ্টি করেন, তখন তিনি তাঁর মনে এই ভাবের উদয় করেন যার দরুণ তিনি মহান প্রভুকে প্রশ্ন করেন, ”ইয়া আল্লাহ! আপনি কেন ’আবূ মোহাম্মদ’ (মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের পিতা) করেছেন?”
আল্লাহ উত্তরে বলেন, তোমার মাথা তোলো। ”তিনি শির উঠিয়ে আরশে মহানবী (দ:)-এর নূর (জ্যোতি) দেখতে পান। হযরত আদম(আ:) জিজ্ঞেস করেন, “ইয়া আল্লাহ! এই নূর কোন মহান সত্তার?” আল্লাহ তা’লা জবাবে বলেন, “তোমার বংশেই এই মহান নবী (দ:)-এর জন্ম। আসমানে তাঁর নাম আহমদ এবং জমিনে মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)। আমি তাঁকে সৃষ্টি না করলে তোমাকে বা আসমান ও জমিনকে সৃষ্টি করতাম না।”
ইমাম বুসিরী (রহ:)-এর কাব্যের ব্যাখ্যামূলক পুস্তকে ইমাম শায়খ ইবরাহীম বাইজুরী লেখেন: হুযূর করীম (দ:) অস্তিত্বশীল না হলে বিশ্বজগতই অস্তিত্বশীল হতো না। হযরত আদম (আ:)-কে আল্লাহ বলেন, ‘মহানবী (দ:) অস্তিত্বশীল না হলে আমি তোমোকে সৃষ্টি করতাম না। হযরত আদম (আ:) হলেন মনুষ্যজাতির আদি পিতা, আর পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই মানুষের জন্যে সৃষ্ট। তাই হযরত আদম (আ:) কে যেহেতু রাসূলে খোদা (দ:) এর অস্তিত্বের কারণে সৃষ্টি করা হয়েছে, সেহেতু সমগ্র জগতই মহানবী (দ:) এর কারণে সৃষ্ট বলে প্রতীয়মান হয়। অতএব, সকল অস্তিত্বশীল সত্তার সৃষ্টির কারণ হলেন প্রিয় নবী (ﷺ)।
৪. আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা ও দার্শনিক দৃষ্টিকোণ
মুহাম্মাদ (ﷺ) কে "উছিলা" বা “কারণ” বলার অর্থ হলো:
কার্যকারণ দৃষ্টিকোণ থেকে: আল্লাহ যেহেতু জানতেন তিনি মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে সৃষ্টি করবেন, তাই সৃষ্টির নকশায় তাঁর আগমন ছিল অবশ্যম্ভাবী।
দয়ালু ইচ্ছার প্রকাশ: আল্লাহ তাআলা মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর মাধ্যমে তাঁর রহমত, হেদায়েত ও ইলমকে মানুষের মাঝে পৌঁছে দিয়েছেন।
৫. সমসাময়িক চিন্তাবিদদের বিশ্লেষণ
বিভিন্ন ইসলামি চিন্তাবিদ ও স্কলার যেমন ড. তাহা জাবির আলআলওয়ানি, শায়খ নূহ হা মিম কেলার প্রমুখ বলেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর নৈতিক আদর্শ ও আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ এমন যে তা মানবজাতিকে একটি পরিপূর্ণ পথনির্দেশ দেয়, এবং সেজন্যই তাঁকে ‘উছিলা’ বলা হয়।
উপসংহার
মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর মর্যাদা শুধুই একজন রাসুল বা নবির সীমায় সীমাবদ্ধ নয়। কোরআন, হাদিস এবং সুফী দর্শনে তাঁকে সৃষ্টি জগতের রহমত, সূচনা এবং আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন হিসেবে দেখা হয়। যদিও “উছিলা” বা “কারণে সৃষ্টি” বিষয়টি কোরআনে সরাসরি নেই, তবে হাদিস ও আধ্যাত্মিক সাহিত্যে ব্যাপকভাবে তা প্রতিষ্ঠিত। সুফীদের মতে, মুহাম্মাদ (ﷺ) ছিলেন সেই প্রথম আলো যিনি বিশ্বসৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু।

No comments