কোরআন ও হাদীস অনুযায়ী নফস ও রূহের পার্থক্য
মানবজীবনের গভীরতর প্রশ্নগুলোর একটি হলো—"নফস" (নفس) ও "রূহ" (روح) কী এবং এদের মধ্যে পার্থক্য কী? কোরআন ও হাদীসে এই দুটি বিষয়ের উল্লেখ এসেছে বিভিন্ন জায়গায়, তবে এদের প্রকৃতি, উৎস ও কার্যকারিতা আলাদা। এ প্রবন্ধে কোরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে নফস ও রূহের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য তুলে ধরা হলো।
নফস (Nafs) কী?
নফস শব্দটির অর্থ আত্মা, সত্তা, প্রবৃত্তি বা চেতনা। কোরআনে বিভিন্ন প্রসঙ্গে "নফস" শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যেমন:
“নফসান আম্মারা”— যা মানুষকে খারাপ কাজের দিকে প্ররোচিত করে।
“নফসান লাওয়ামা”— আত্মগ্লানিময় নফস।
“নফসান মুতমাইন্না”— শান্তিপূর্ণ ও পরিপূর্ণ আত্মা।
“নিশ্চয়ই নফস খারাপ কাজের প্রতি অত্যন্ত উৎসাহিত করে।” (সূরা ইউসুফ, ১২:৫৩)
সংক্ষেপে: নফস হচ্ছে মানুষের ভিতরের এমন একটি সত্তা যা তার ইচ্ছা, লোভ, কামনা, রাগ, হিংসা, ভালো-মন্দ প্রবৃত্তি ও আত্মপরিচয়ের প্রতিনিধিত্ব করে।
রূহ (Ruh) কী?
রূহ হলো সেই আলোকিত আত্মা, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের দেহে ফুঁক দেওয়া হয়। এটি আল্লাহর এক বিশেষ রহস্য। রূহের মাধ্যমে মানুষ জীবন্ত হয় এবং চিন্তা করার শক্তি পায়।
“তোমরা আমাকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করছ। বলো, রূহ আমার প্রতিপালকের আদেশ অনুসারে, এবং তোমাদেরকে জ্ঞানের অল্পই প্রদান করা হয়েছে।” (সূরা আল-ইসরা, ১৭:৮৫)
সংক্ষেপে: রূহ হচ্ছে আল্লাহর দেওয়া এক পবিত্র উপাদান যা দেহে প্রবেশ করলে মানুষ জীবিত হয় এবং সৃষ্টির উচ্চ পর্যায়ে অবস্থান লাভ করে।
নফস ও রূহের পার্থক্য:
নফস (Nafs) রূহ (Ruh)
নফস মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করে রূহ মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করে না
নফস জান্নাতে যায় রূহকে জান্নাতে যাবে তার কোনো প্রমান নাই
নফসকে ভাগ করা যায় রূহকে ভাগ করা যায় না
নফস ঘুমায় রূহ ঘুমায় না
নফস তন্দ্রায় আচ্ছন্ন হয় রূহ তন্দ্রা কাকে বলে জানে না
নফস জম্ম দেয় রূহ জম্ম দেয় না
নফস জম্মগ্রহণ করে রূহ জম্মগ্রহণ করে না
নফস ভোগবিলাসে মত্ত থাকতে পারে রূহ তা করে না
নফসের সৃজনীশক্তি নাই রূহের সৃজনীশক্তি আছে
নফসকে সবখানেই কমবেশি পাওয়া যায় রূহকে দুইটি স্থানে পাওয়া যায় (জিন এবং মানুষের)
নফস সিফাত রূহ জাত
নফস দুর্বল রূহ সর্বশক্তিমান
নফসকে ফেরেস্তারা পাহারা দেয় না রূহ জাগ্রত হলেই ফেরেশ্তারা পাহারা দেয়
নফস জান্নাত ও জাহান্নামের সুখ - দুঃখ ভোগ করবে রূহ ভোগ করে না
নফস কবরের আজাব ভোগ করে রূহ ভোগ করে না
নফস পরিতৃপ্ত হলে নফসের উপর রূহ ভেসে উঠে
নফস বিবর্তন হয় রূহের বিবর্তন নাই
নফসের উপর কিয়ামত হবে রূহের উপর নয়
নফসের মধ্যে রূহ বীজরূপে লুকায়িত রূহের মধ্যে নফস নাই
নফস জন্মচক্রে ঘুরে রূহ জন্মচক্রে ঘুরে না
নফসের পোশাক হলো জীব ও ইনসান রূহের পোশাককে বলে বাশার (১৯:১৭)
কোরানে নফস বহুবচন, নফসের বহুবচন আনফুস রূহের কোনো বহুবচন নাই, রূহ একবচন
হাদীস থেকে নির্দেশনা:
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “রূহ ফুঁক দেওয়া হয় দেহে ৪০, ৪০, ৪০ দিন পর। অতঃপর ফেরেশতা আসে এবং রিযিক, আমল, আয়ু ও ভাগ্য লিখে যায়।” (সহীহ মুসলিম)
এ হাদীস থেকে বোঝা যায়, রূহ হচ্ছে এক পবিত্র সত্তা যা মানুষের জীবনচক্রের শুরুতেই দেহে প্রবেশ করে এবং মৃত্যুর সময় আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করে।
উপসংহার:
রূহ হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত এক অলৌকিক শক্তি যা মানুষকে জীবিত করে তোলে। আর নফস হলো মানুষের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ সত্তা, যা ভালো ও মন্দের দ্বন্দ্বে জর্জরিত। কোরআন ও হাদীস অনুযায়ী এই দুইয়ের মাঝে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে, এবং উভয়ের পরিচয় ও নিয়ন্ত্রণ মানুষের আত্মশুদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ২৯৫ বার “নফস” শব্দটি কুরআনে এসেছে। নফস-এর মাধ্যমে আল্লাহ মানুষের আত্মা, চেতনা, প্রবৃত্তি ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বোঝাতে চান। নফসকে পরিশুদ্ধ করা ইসলামে একটি আধ্যাত্মিক অনুশীলন হিসেবে বিবেচিত।
No comments