কোরআন-হাদীস ও সুফি মতে আল্লাহপাক সর্বপ্রথম কী প্রকাশ ও বিকাশ করলেন?
বিশ্বজগতের সৃষ্টির সূচনা নিয়ে বহু মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে—আল্লাহপাক সর্বপ্রথম কী সৃষ্টি করেছেন বা কী প্রকাশ করেছেন? ইসলামিক দর্শন অনুযায়ী ও সুফিবাদ বা তাসাউফ হলো ইসলামের আধ্যাত্মিক দিক, যেখানে আত্মার পরিশুদ্ধি ও আল্লাহর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপনই মূল উদ্দেশ্য। সুফিগণ কেবল বাহ্যিক শরিয়ত নয়, বরং সৃষ্টিজগতের অন্তর্নিহিত রহস্য খুঁজে দেখেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে—আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা সর্বপ্রথম কী প্রকাশ বা বিকাশ করেছেন? বিভিন্ন হাদীস ও আলেমদের মত অনুযায়ী এর উত্তর নিহিত আছে “নূর-ই-মুহাম্মদী” এর মধ্যে।
কুরআনে বলা হয়েছে, “আমি সমস্ত জীবিত জিনিস সৃষ্টি করেছি পানি থেকে।” (সূরা আম্বিয়া: ৩০) । ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, আল্লাহ সর্বপ্রথম পানি সৃষ্টি করেন, তারপর আরশ।
নবী করিম (সা.)-এর হাদীস শরীফে সর্বপ্রথম প্রকাশ:
হাদীস শরীফে এসেছে, "আল্লাহ তা'আলা বলেন, আমি আমার প্রিয় হাবীব মুহাম্মদ (সা.)-এর নূর থেকেই এই পুরো জগত সৃষ্টি করেছি।" (সূত্র: হাদীসে কুদসী, দায়লামী, বায়হাকি, মাজমাউয যাওয়ায়েদ)
একটি প্রসিদ্ধ হাদীসে নবী করিম (সা.) বলেছেন: "আনাল আউওল – আমি প্রথম সৃষ্ট।" (সূত্র: ইমাম বায়হাকি, দালায়েলুন নুবুওয়াহ)
এ থেকে বোঝা যায়, আল্লাহপাক সৃষ্টিকারের শুরুতে নিজের নিকটতম ও প্রিয়তম সৃষ্টিকে—হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নূরকে—প্রকাশ করেছেন।
অন্য এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: "আল্লাহ সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেন এবং তাকে আদেশ করেন: লিখ! কলম বললো: কী লিখবো? আল্লাহ বললেন: কিয়ামত পর্যন্ত যা কিছু ঘটবে তা লিখে ফেল।" (সূত্র: তিরমিজি, আবু দাউদ)
এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, কলম হচ্ছে প্রথম দৃশ্যমান সৃষ্টি, যার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টি কার্যক্রম শুরু করেন।
সুফি মতবাদে সর্বপ্রথম প্রকাশ: নূর-ই-মুহাম্মদী :
সুফিগণ বিশ্বাস করেন যে, আল্লাহ তা’আলা সৃষ্টিজগতের সূচনায় নিজের অস্তিত্বের প্রকাশ ঘটান নূরে মুহাম্মদী-এর মাধ্যমে। এটি কোনো দেহ বা রূপ নয়, বরং এক ঈশ্বরীয় নূর (আলোক), যা থেকে সমগ্র সৃষ্টি বিকশিত হয়েছে। হাদীসে কুদসী বা সুফি বর্ণনায় বলা হয়: “আমি ছিলাম এক গোপন ধনভাণ্ডার (كنزاً مخفياً), আমি চাইলাম যেন আমাকে চেনা হয়, তাই আমি সৃষ্টি করলাম।” (মিশকাতুল আনওয়ার, ইমাম গাযালী)
নূরে মোহাম্মদ আল্লাহর ইচ্ছা মোতাবেক “হামদ" ও প্রচারের বা বিকশিত করতে ইচ্ছা করলেন এবং সাতটি ঘোষণার মাধ্যমে এর সূচনা হলো। তখন "বিছমিল্লাহর"এক মঞ্চ তৈরী করে তাতে অধিষ্ঠিত হয়ে ঘোষণা করলেন।
প্রথম ঘোষণা করলেন:- কুম্ভ কানজান মুখফিয়ান, দ্বিতীয় ঘোষণা করলেন :- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, তৃতীয় ঘোষণা করলেন :- আনা মিন নূরীল্লাহ, চতুর্থ ঘোষণা করলেন :- নূর মিন নুরীল্লাহ, পঞ্চম ঘোষণা করলেন :- নূর মিন নুরী, ষষ্ঠ ঘোষণা করলেন :- খালাকা মিন নুরী, সপ্তম ঘোষণা করলেন :- ইয়া আমীর - আল্লাহু আকবর। এ সাতটি ঘোষণা ছিল নূর হতে নূর সাইজুদা হবার পরিকল্পিত রূপ এবং সমস্ত সৃষ্টি বিকশিত হবার মূল স্রোতধারা।
এ বিকশিত নূর চারটি হালিয়তে দীপ্তি লাভ করে চারটি নামের আবরণে স্থিত আছে। যেমন :- “আউয়ালু মা খালাকাল্লাহু রূহী”মানে সর্ব প্রথম রূহের আত্ম প্রকাশ হলো। ইহা হাকিকতের জগতে হাকিকতে মোহাম্মদীর গভীর কেন্দ্রে বর্তমান এবং এখানে রূহের প্রথম প্রকাশিত স্থান। তাই এ স্তরের প্রথম প্রকাশিত অবস্থাকে লক্ষ্য করে বলা হয়েছে - “আউয়ালু মা খালাকাল্লাহু রূহী।" মায়ীয়েতের স্তরে বা মোকামে প্রথম প্রকাশ হয় নূরে মোহাম্মদী রূপে বিধায় বলা হয়েছে - “আউয়ালু মা খালাকাল্লাহু নূরী।" ইহা নূরের দ্বিতীয় বিকাশ হলেও এ স্তরে প্রথম প্রকাশ এ নামে। ইহা সূক্ষ্ম রূপ জগতের প্রথম প্রকাশ ও বিকাশ। ইহার বিভিন্ন নাম সাব্যস্ত আছে। ইহার তৃতীয় বিকাশ আলমে আরোয়াতে অথচ এ স্তরের নাম ও রূপের আবরণে প্রথম প্রকাশ বিধায় বলা হয়েছে আউয়ালু মা খালাকাল্লাহু আকল'।
আলমে আরোয়াতে ঈমান আনার অবস্থার সাথে জড়িত - যা এ স্তরে প্রথম প্রকাশ। এখানেই বলা হয়েছে ‘আলাস্তু বে রাব্বিকুম”মানে আমি কি তোমাদের রব নই।“আউয়ালু মা খালাকাল্লাহু কলম"- মানে প্রথম কলম সৃষ্টি করেন আল্লাহপাক। এ অবস্থা ‘লওহ মাহফুজ’ এর লিখিত অবস্থার সাথে জড়িত। এখানেই প্রথম নূরের কলমে নূরের কালিতে প্রথম লিখিত স্থান। এখানে আল্লাহর কালাম সংরক্ষিত আছে - যা অপবিত্রগণ কখনো স্পর্শ করতে পারে না।
এ বক্তব্যটি সুফি দর্শনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে বোঝানো হয় যে, আল্লাহ নিজেকে চেনানোর জন্যই সৃষ্টি কার্যক্রম শুরু করেন, আর এর প্রথম ধাপ ছিল নূরে মুহাম্মদীর প্রকাশ।
সুফিগণের ব্যাখ্যা অনুযায়ী সৃষ্টির ধারা:
আল্লাহর ইচ্ছা (ইরাদা) – "আমি চেনা যেতে চাই"
নূরে মুহাম্মদীর সৃষ্টি – আল্লাহর ইচ্ছার প্রথম প্রকাশ
মাকামাত ও আহওয়াল – রূহানিয়াতের স্তরক্রমে অন্যান্য সৃষ্টির বিকাশ
আলমে লাওহূত, জাবারূত, মালাকূত, নাসূত – বিভিন্ন অস্তিত্বিক জগতের সৃষ্টি
ইমাম রুমি, ইবনে আরাবি ও অন্যান্য সুফিদের মতামত:
ইমাম জালালুদ্দিন রুমি বলেন: “নবী মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন প্রথম প্রকাশিত রূহ — যাঁর আলো হতে পৃথিবী, আকাশ, চন্দ্র-সূর্য সব সৃষ্টি।”
ইবনে আরাবি তাঁর “ফুতূহাতুল মাক্কিয়া” গ্রন্থে লিখেন: “আল্লাহর প্রথম প্রকাশই হলো ‘হাকিকাত মুহাম্মদিয়া’ (The Reality of Muhammad)।”
উপসংহার:
সুফি মতে, আল্লাহপাক সর্বপ্রথম যা প্রকাশ ও বিকাশ করেছেন, তা হলো ‘নূরে মুহাম্মদী (সা.)’। এই নূর কোনো দেহ নয়, বরং এক আধ্যাত্মিক সত্তা যা আল্লাহর ‘ইচ্ছার আলো’ হিসেবে বিকশিত হয়েছে। পরবর্তী সকল সৃষ্টি, সময়, জগত ও বাস্তবতা — সবই এই নূরের ছায়া বা প্রকাশমাত্র।
.png)
No comments