Header Ads

ফজরের নামাজ পড়লে ১০ পুরস্কার পাওয়া যায়

ফজরের বিশেষ গুরুত্ব যেমন নামাজের মধ্যে আছে, তেমনি সময়ের মধ্যেও। কোরআনে সুরা ফজরের শুরুতে আল্লাহ তাআলা বলেন, শপথ ফজরের। (সুরা ফজর, আয়াত: ১)

ইসলামে ফজরের নামাজের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। হাদীসে এসেছে, যে ব্যক্তি ফজরের নামাজ নিয়মিত পড়বে, তাকে আল্লাহ্‌ তাআলা অনেক পুরস্কার প্রদান করবেন। একাধিক হাদীসে ফজরের নামাজের বরকত ও পুরস্কারের কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে একটি হাদীসে উল্লেখ রয়েছে: রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, "যে ব্যক্তি ফজরের নামাজ পড়ে, তাকে ১০টি পুরস্কার দেয়া হয়।" (সুনানে আবু দাউদ) এছাড়াও, ফজরের নামাজ মুসলিমদের জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপকার ও পুরস্কার নিয়ে আসে। ফজরের নামাজ কেবলমাত্র একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদত নয়, বরং এর রয়েছে অনেক বৈশিষ্ট্য এবং পুরস্কার যা মুসলিমদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ফজরের নামাজ পড়ার কয়েকটি উপকারের কথা জানা যাক

১. দুনিয়া ও আখিরাতের নিরাপত্তা: ফজরের নামাজ মুসলিমের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে নিরাপত্তা প্রদান করে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, "যে ব্যক্তি ফজরের নামাজ পড়ে, সে আল্লাহর নিরাপত্তার আওতায় থাকে।" (সহীহ মুসলিম) এই নিরাপত্তা দুনিয়ার বিপদ, রোগ, এবং আখিরাতে শাস্তি থেকে মুক্তি দেয়। 

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে জামাতের সঙ্গে এশার নামাজ আদায় করল, সে যেন অর্ধেক রাত পর্যন্ত নফল নামাজ আদায় করল। আর যে ফজরের নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করল, সে যেন সারা রাত জেগে নামাজ আদায় করল।’ (মুসলিম, হাদিস: ১৩৭৭)

২. শয়তানের বিরুদ্ধে বিজয়:  ফজরের নামাজ শয়তান ও তার হাত থেকে সুরক্ষার মাধ্যম। হাদীসে বলা হয়েছে, "যে ব্যক্তি ফজরের নামাজ পড়ে, শয়তান তার কাছ থেকে দূরে চলে যায় এবং তার জীবনে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হয়।" (সহীহ মুসলিম)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ফজরের নামাজ আদায় করল, সে মহান আল্লাহর রক্ষণাবেক্ষণের অন্তর্ভুক্ত হলো।’ (মুসলিম, হাদিস: ১৩৭৯)

৩. ফজরের নামাজের পরের দোয়া ও গুনাহ মাফ: ফজরের নামাজের পরে দোয়া গ্রহণযোগ্য হয় এবং আল্লাহ্‌ মুসলিমের গুনাহ মাফ করে দেন। ফজরের নামাজের পরে বিশেষ কিছু দোয়া রয়েছে যা মুসলিমদের জন্য বিশাল পুরস্কার এনে দেয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ফজরের দুই রাকাত নামাজ দুনিয়া ও তার সবকিছুর চেয়ে উত্তম।’ (মুসলিম, হাদিস: ১৫৭৩)

৪. বিশেষ সুফল ও বরকত: ফজরের নামাজ আদায়কারী ব্যক্তি তার দিনটি শুরু করে আল্লাহর স্মরণ ও দয়ায়, যার ফলে তার দিনটি পূর্ণ থাকে বরকত এবং সফলতায়। এমনকি, যেসব ব্যক্তি ফজরের নামাজ আদায় করে, তারা আরও কর্মঠ ও সফল হন। 

রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেন, ‘সেই মানুষটি জাহান্নামে যাবে না, যে সূর্যোদয়ের আগের এবং সূর্যাস্তের আগের অর্থাৎ ফজর ও আসরের নামাজ আদায় করে।’ (মুসলিম, হাদিস: ১৩২২)

৫. নিরবিচ্ছিন্ন ইবাদত: ফজরের নামাজ ইসলামের ইবাদতের প্রথম কাজ হিসেবে বিবেচিত। এটি ঈমানের প্রাথমিক দৃঢ়তা এবং জীবনের উদ্দেশ্যকে সঠিক পথে পরিচালিত করার একটি বড় মাধ্যম। 

রাসুল (সা.) বলেন, ‘মুনাফিকদের জন্য ফজর ও এশার চেয়ে বেশি ভারী কোনো নামাজ নেই। এ দুই নামাজের ফজিলত যদি তারা জানত, তাহলে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও তারা উপস্থিত হতো।’ (বুখারি, হাদিস: ৬৫৭)

৬. ফজরের নামাজ ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি: ফজরের নামাজের মাধ্যমে একজন মুসলিমের পাপের পরিমাণ কমে যায় এবং তার জন্য জাহান্নামের শাস্তি থেকে মুক্তি লাভের সুযোগ সৃষ্টি হয়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, "ফজরের নামাজ যে ব্যক্তি নিয়মিত পড়বে, সে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা পাবে।" (সহীহ মুসলিম) 

সাহাবি আনাস (রা.) বলেন যে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘রাতের অন্ধকারে মসজিদগুলোয় যাতায়াতকারী ব্যক্তিদের কিয়ামতের দিনের পরিপূর্ণ নুরের সুসংবাদ দাও।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৭৮১)

৭. দুনিয়ায় শান্তি ও আধ্যাত্মিক সমৃদ্ধি: ফজরের নামাজ মুসলিমদের জন্য দুনিয়ায় শান্তি এবং আধ্যাত্মিক সমৃদ্ধি নিয়ে আসে। এটি মানুষের মনের মধ্যে শান্তি, ধৈর্য, এবং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস এবং ভরসা বৃদ্ধি করে। 

ফজরের সময় ফেরেশতাদের পালাবদল হয়। আর এ সময় বান্দা যা কিছু করে ফেরেশতারা আল্লাহর কাছে তা পেশ করেন। এক হাদিসে আল্লাহর রাসুল (সা.) বিষয়টি চমৎকারভাবে তুলে ধরে বলেন, ‘ফেরেশতারা পালাবদল করে তোমাদের মাঝে আগমন করেন; একদল দিনে, একদল রাতে। আসর ও ফজরের নামাজে উভয় দল একত্র হয়। তারপর তোমাদের মাঝে রাতযাপনকারী দলটি উঠে যায়। তখন তাদের প্রতিপালক তাদের জিজ্ঞাসা করেন, আমার বান্দাদের কোন অবস্থায় রেখে এলে? অথচ তিনি তাদের ব্যাপারে সর্বাধিক অবগত। জবাবে তাঁরা বলেন, ‘আমরা তাদের নামাজে রেখে এসেছি আর আমরা যখন তাদের কাছে গিয়েছিলাম তখনো তারা নামাজরত ছিলেন।’ (বুখারি, হাদিস: ৫৫৫)

৮. আল্লাহর পক্ষ থেকে অতিরিক্ত পুরস্কার: ফজরের নামাজের ব্যাপারে আরও একটি হাদীসে বলা হয়েছে, "যে ব্যক্তি ফজরের নামাজ পড়ে, তার জন্য আল্লাহ্‌ তিনটি অতিরিক্ত পুরস্কার রয়েছে, যা পৃথিবীতে কেউ দিতে পারে না।" (আত-তাবারানি) 

খলিফা হজরত উমর ইবনে খাত্তাব (রা.)-এর বরাতে একটি হাদিস জানা যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) নাজদের দিকে এক অভিযানে একটি সেনাদল পাঠান। তারা প্রচুর গণিমতের সম্পদ অর্জন করে তাড়াতাড়ি ফিরে আসে। তাদের সঙ্গে যায়নি এমন একজন বলেন,‘অল্প সময়ের মধ্যে এত পরিমাণে ভালো গণিমত নিয়ে এদের চেয়ে তাড়াতাড়ি আর কোনো সেনাদলকে আমরা ফিরে আসতে দেখিনি।’ তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমি কি তোমাদেরকে এমন একটি দলের কথা বলব না, যারা এদের চেয়ে তাড়াতাড়ি উত্তম গণিমত নিয়ে ফিরে আসে? যারা ফজরের নামাজে জামাতে হাজির হয়, (নামাজ শেষে) সূর্যোদয় পর্যন্ত বসে আল্লাহ তাআলার জিকির করতে থাকে, তারাই অল্প সময়ের মধ্যে উত্তম গণিমতসহ প্রত্যাবর্তনকারী।’ (সুনানে তিরমিজি: ৩৬৪১)

৯. নবী (সাঃ) এর প্রশংসা: ফজরের নামাজ আদায়কারীকে নবী (সাঃ) প্রশংসা করেছেন। এটি ইসলামের একটি অন্যতম বিশেষত্ব এবং সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানবের কাছে স্বীকৃতি লাভের বিষয়। 

জাবির বিন আবদুল্লাহ (রা.) বর্ণনা করেন, ‘একবার আমরা নবী করিম (সা.)-এর কাছে উপস্থিত ছিলাম। তিনি রাতে (পূর্ণিমার) চাঁদের দিকে তাকিয়ে বলেন, ওই চাঁদকে তোমরা যেমন দেখছ, ঠিক তেমনি অচিরেই তোমাদের প্রতিপালককে তোমরা দেখতে পাবে।’

১০. দোয়ার মুহুর্তে সাহায্য পাওয়া: ফজরের নামাজের পরে, যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে দোয়া করে, তার দোয়া খুব দ্রুত গৃহীত হয় এবং তা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয়। এটি তার জীবনে সফলতা এবং বরকতের মধ্যে আবদ্ধ করে দেয়। 

রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ যখন ঘুমিয়ে পড়ে তখন শয়তান তার ঘাড়ের পেছনে তিনটি গিঁট দেয়। প্রতি গিঁটে সে এ বলে চাপড়ায়, তোমার সামনে রয়েছে দীর্ঘ রাত, অতএব, তুমি শুয়ে থাকো। তারপর সে যদি জেগে আল্লাহকে স্মরণ করে তাহলে একটি গিঁট খুলে যায়, অজু করলে আরেকটি গিঁট খুলে যায়, তারপর নামাজ পড়লে আরেকটি গিঁট খুলে যায়। তখন তার প্রভাত হয় উত্ফুল্ল মনে ও অনাবিল চিত্তে। না হলে সে সকালে ওঠে কলুষ কালিমা ও আলস্য নিয়ে।’ (বুখারি, হাদিস: ১১৪২)

ফজরের নামাজের গুরুত্ব অত্যন্ত ব্যাপক এবং এর প্রতি আমাদের নিয়মিত যত্নবান হওয়া উচিত। এটি শুধুমাত্র একটি রীতি নয়, বরং আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্কের গভীরতা এবং তার অনুগ্রহ লাভের মাধ্যম। সেই সাথে, ফজরের নামাজের নিয়মিত আদায় আমাদের দুনিয়া ও আখিরাতে সাফল্য এবং শান্তির পথ উন্মুক্ত করে দেয়।


No comments

Powered by Blogger.