লানতুল্যাহ আলাইহি জগত জননী মা ফাতেমা তুজ জহুরা (সাঃআঃ) এর আসল খুনি কে?
হযরত ফাতিমা তুয্-জাহরা (সা.আ.) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কন্যা, হযরত আলী (আ.)-এর স্ত্রী, এবং ইমাম হাসান (আ.) ও হুসাইন (আ.)-এর মাতা। তিনি ইসলামের ইতিহাসে এক পরিপূর্ণ নারীর প্রতীক এবং সকল মুসলিমদের জন্য সম্মানিত।
বাগে ফাদাক নামে একটি খেজুর বাগান বাইতুল মালের সম্পদ করা
নবীজী (সাঃ) মা ফাতেমা (সাঃ) কে বাগে ফাদাক নামে একটি খেজুর বাগান লিখে দিয়েছিলেন। আবু বক্কর আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে অবৈধ খলিফা হওয়ার পর, মা ফাতেমার (সাঃ) সেই সম্পত্তি (বাগে ফাদাক) কে বাইতুল মালের (রাষ্ট্রীয় কোষাগারের) সম্পদ বলে দাবি করে জোরপূর্বক নিয়ে নেয়।
মা ফাতেমা (সাঃ) তার পিতার কাছ থেকে লিখিতভাবে প্রাপ্ত সম্পত্তি ফিরে পাওয়ার জন্য জমির দলিল উপযুক্ত প্রমাণাদি নিয়ে আবু বক্কর এর দরবারে কৈফিয়ৎ প্রেস করে। অত্যন্ত দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলতে হচ্ছে যার সম্মানার্থে নবীজি (সাঃ) দাঁড়িয়ে যেতেন তাজিম করতেন, সেই মা ফাতেমা (সাঃ) কে আবুবক্কর এর দরবারে ঘন্টার পর ঘন্টা দাড়িয়ে রেখে বিভিন্ন ধরনের উদ্ভট কথাবার্তা তুচ্ছ তাচ্ছিল্য টিটকারি মশকারি মূলক আলোচনা করে। এক পর্যায়ে মা ফাতেমা (সাঃ) নবীজি (সাঃ) এর লিখিত দলিল বের করে দিলে আবুবক্কর উক্ত সম্পত্তি ফিরিয়ে দেবে বলে মত প্রকাশ করে। ঠিক সেই মুহুর্তে ওমর এসে বলে দেখি কিসের দলিল এই বলে মা ফাতেমার (সাঃ) উক্ত দলিল হাতে নিয়ে ওমর তাহা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে বলল এখন আর কোন প্রমাণ নাই। তারপর মা ফাতেমা (সাঃ) সকাল থেকে চলে আসে এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আবু বকর ও ওমর এর সাথে কথা বলে নাই এবং আবু বকর, ওমর যেন জগত জননীর জানাজার নামাজে না আসে মাওলা আলীকে সেই ওসিয়ত করে যান জগত জননী মা ফাতেমা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
হযরত মাওলা আলীকে (আঃ) গ্রেপ্তার করার উদ্দেশ্যে তার বাড়িতে আক্রমণ
দয়াল রাসূল পাক (আঃ) এর ওফাতের অল্প কিছুদিন পরে প্রথম খলীফা আবু বকরের পূর্ন অনুমতিক্রমে দলবল নিয়ে ওমর যখন হযরত মাওলা আলীকে (আঃ) গ্রেপ্তার করতে যান। তখন মা ফাতিমা তু জহুরা (সাঃআঃ) ঘরের দরজায় খিল এটে দরজার দুই পাল্লা দু’হাতে চেপে ধরে রেখেছিলেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওমর প্রথমে দরজায় আগুন লাগিয়ে দেন। তারপর জ্বলন্ত দরজাতে এত জোরে লাথি মারে যে, লাথির চোটে জ্বলন্ত দরজা ভেঙ্গে তা নবী নন্দিনীর বুকের পাঁজরে আঘাত হানে। উক্ত আঘাতের ফলে নবীকন্যার পাঁজরের হাড় ভেঙ্গে যায়। মা ফাতিমা তু জহুরা (সাঃআঃ) তখন অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। উক্ত আঘাতের ফলে তিনি মৃত সন্তান প্রসব করে। সেই যে তিনি শয্যাশায়ী হলেন আর সুস্থ হয়ে উঠেন নাই। এ ঘটনার কিছুদিন পর তিনি না ফেরার দেশে চলে গেলেন।ঘটনা সম্পর্কে সুন্নি রেফারেন্স নীচে দেয়া হলঃ-
সুন্নি সূত্র সমূহঃ খাতুনে জান্নাত ফাতিমা যাহরা, পৃ- ১১২ , ১১৯ (রহমানিয়া লাইব্রেরী) / হযরত ফাতেমা যাহরা , পৃ- ৬১ , ৬২ , ৬৭ , ৬৮ (তাজ লাইব্রেরী) / হযরত ফাতেমা যাহরা , পৃ- ১৮০ , ১৮৯ , ১৯০ (হামিদিয়া লাইব্রেরী) / নাহজ আল বালাঘা , পৃ- ৩৬৪ - ৩৭৫ (জেহাদুল ইসলাম) / সহীহ আল বুখারী , খন্ড - ৬ , হাদিস নং - ৬২৫৮ (আধুনিক প্রকাশনী) / সহীহ আল বুখারী , খন্ড - ৩ , হাদিস নং - ২৮৬০ , ৩৪৩৬ , ৩৪৩৭ , ৩৪৩৮ (আধুনিক প্রকাশনী) / হিলিয়াত আল আউলিয়া , খন্ড - ২ , পৃ- ৪৩ (মিশর) / আস সুনান আল কুবরা , খন্ড - ৩ , পৃ- ৩৯ , খন্ড - ৪ , পৃ- ৩৩৪ (হায়দারাবাদ , ভারত) / আনসার আল আশরাফ (বালাজুরি) , খন্ড - ১ , পৃ- ৪০৫ (মিশর) / আল ইসতিয়াব , খন্ড - ৪ , পৃ- ১৮৯৭ (মিশর) / উসুদ আল ঘাবা (ইবনে আসির) , খন্ড - ৫ , পৃ- ৫২৪ (মিশর) / সহীহ আল বুখারী , খন্ড - ৫ , পৃ- ১৭৭ , খন্ড - ৮ , পৃ- ১৮৫ (মিশর) / সহীহ আল মুসলিম , খন্ড - ৫ , পৃ- ১৫৩ / সুনান আল কুবরা , খন্ড - ৪ , পৃ- ২৯ , খন্ড - ৬ , পৃ- ৩০০ (হায়াদারাবাদ , ভারত) / আল তাবাকাত ইবনে সাদ , খন্ড - ২ , পৃ- ৮৬ (লেডেন)/ মুসনাদে হাম্বল , খন্ড - ১ , পৃ- ৯ (মিশর) / তারিখে তাবারী , খন্ড - ১ , পৃ- ১৮২৫ (লেডেন) / আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া , খন্ড - ৫ , পৃ- ২৮৫ (মিশর) / শারহ নাহাজ আল বালাঘা , (ইবনে হাদীদ) , খন্ড - ৬ , পৃ- ৪৬ (মিশর)
ঘটনাক্রম (নবী করিম (সা.)-এর ইন্তেকালের পর)
নবী করিম (সা.)-এর ওফাতের পর মুসলিম উম্মাহতে খিলাফত ও নেতৃত্ব নিয়ে মতানৈক্য শুরু হয়। এখান থেকেই মূল ঐতিহাসিক বিতর্কগুলোর জন্ম।
শিয়া মতবাদ অনুযায়ী:
বিতর্কিত আক্রমণ ও দরজার ঘটনা
শিয়া ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর যখন হযরত আলী (আ.) বায়আত দেননি, তখন হযরত উমর (রাঃ)-এর নেতৃত্বে একটি দল বনী হাশিমের ঘর (হযরত ফাতিমা ও আলী (আ.)-এর ঘর) ঘেরাও করে।
অনেক শিয়া গ্রন্থে বলা হয়:
- উমর (রাঃ) হুমকি দেন: "ঘর থেকে বের না হলে ঘরে আগুন লাগানো হবে।"
- দরজা ধাক্কা দিয়ে খোলা হয়, তখন হযরত ফাতিমা (সা.আ.) দরজার পেছনে ছিলেন।
- এতে তিনি গুরুতর আহত হন, এবং তাঁর গর্ভে থাকা সন্তান (মুহসিন)流产 হয়ে যায়।
- এরপর থেকেই তাঁর শারীরিক অবস্থা খারাপ হতে থাকে।
মূল উৎস (শিয়া সূত্র):
- Kitab Sulaym ibn Qays
- Bihar al-Anwar (Allama Majlisi)
- Al-Irshad (Sheikh al-Mufid)
শিয়া দৃষ্টিভঙ্গি:
- হযরত আবু বকর (রাঃ) ও উমর (রাঃ)-এর ওপর শিয়া ইতিহাসের কিছু অংশে গুরুতর অভিযোগ আছে।
- শিয়া মুসলমানরা বিশ্বাস করেন: হযরত ফাতিমা (সা.আ.)-এর শহীদ হওয়ার পেছনে ঐ ঘটনার সরাসরি ভূমিকা ছিল।
সুন্নি মতবাদ অনুযায়ী:
সুন্নি মুসলিমদের দৃষ্টিতে:
- হযরত ফাতিমা (সা.আ.)-এর মৃত্যু একটি দুঃখজনক ঘটনা হলেও তা কোনো হামলার ফল নয়।
- তাঁরা বিশ্বাস করেন: সাহাবীরা সবাই পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, এবং কোনো জোরপূর্বক ঘটনা ঘটেনি।
সুন্নি উৎস অনুসারে:
- হযরত ফাতিমা (সা.আ.) রসূলুল্লাহ (সা.)-এর পর মাত্র ছয় মাস বেঁচে ছিলেন।
- তিনি খলিফা আবু বকরের সঙ্গে ফাদাক জমি নিয়ে মতবিরোধে কষ্ট পেয়েছিলেন, কিন্তু সাহাবীদের বিরুদ্ধে কোনো প্রকাশ্য অভিযোগ ছিল না।
মূল উৎস (সুন্নি সূত্র):
- Sahih Bukhari
- Sahih Muslim
- Tarikh al-Tabari
- Ibn Kathir’s Al-Bidaya wa’l-Nihaya
‘লানত’ প্রসঙ্গে:
ইসলামে কাউকে “লানতুল্লাহ আলাইহি” বলা একটি গুরুতর দোয়া ও অভিশাপ — যা শুধু নিশ্চিতভাবে কাফের, মুনাফিক বা আল্লাহর শত্রুদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। সাহাবীদের প্রতি লানত বর্ষণের ব্যাপারে সুন্নি মতবাদ তা হারাম ও বেআদব বলে গণ্য করে। শিয়া ধর্মতত্ত্বে যদিও কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে, তবু শিষ্টাচার ও একতা রক্ষার্থে অনেক শিয়া আলেমও এই বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করেন।
উপসংহার:
হযরত ফাতিমা (সা.আ.)-এর মৃত্যুর কারণ হিসেবে হজরত মাওলা আলী (রা.) বাসগৃহে আক্রমণ ও মা ফাতেমাতুজ জহুরার গর্ভপাতের আঘাতে বিষয়টি শিয়া সম্প্রদায় পুরোপুরি সমর্থন করে। কিন্তু সুন্নি সম্প্রদায় বিষয়টি প্রাকৃতিক/আত্মিক কষ্ট বলে দাবি করেন। আবার হজরত মাওলা আলী (রা.) এর ঘরের দরোজায় আঘাত করার বিষয়টি শিয়া সম্প্রদায় বিশ্বাস করে। কিন্তু সুন্নি সম্প্রদায় তা অস্বীকার করে। সাহাবীদের ভূমিকা অনুযায়ী কিছু সূত্রে সমালোচিত আবার কিছু সূত্রে সম্মানিত ও নিষ্পাপ।

No comments