কোরআন, হাদীস ও সুফী মতে মাজারের মূল হাকিকত
ইসলামের বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ দুটি দিক রয়েছে—শরীয়ত ও তাসাওউফ। শরীয়ত আমাদের বাহ্যিক নিয়ম-কানুন শেখায় আর তাসাওউফ আমাদের আত্মিক শুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্যের দিকে পরিচালিত করে। তাসাওউফের অন্যতম আলোচিত বিষয় হলো “মাজার” — যাকে অনেকে শুধু "কবর" মনে করেন, আবার কেউ কেউ "রূহানী দরবার" হিসেবেও সম্মান করেন।
মাজার শব্দটির গভীরতম হাকিকত
মাজার শব্দটি লিখতে চারটি হরফে প্রয়োজন হয়, যেমন- "মীম" অর্থ যিনি মুহাম্মদ অর্থ প্রসংশিত জাত সিফাত রুপে রঙে রঙিন হয়ে আছেন। অর্থাৎ যিনি নুরু রুপে আল্লাহ জাত সেফাত রুপে যিনি ফুল হয়ে যিনি বাগান হয়ে আছেন সেই জন্য মাজারে ফুল গোলাপজল দেওয়া হয়। "জা" অর্থ জারিয়াত অর্থাৎ যিনি প্রভুর পক্ষ হতে ভয় ভিতি প্রদর্শনকারী হয়ে সৎ পথ প্রাপ্ত হয়ে সৎ পথের আহ্বানকারী রুপে এবং জারিয়া অর্থাৎ প্রবহমান, অনন্তকাল সদাস্থায়ী রুপে অবস্থানগত হয়ে থাকবেন মানবের কল্যাণ এর জন্য। "আলিফ" অর্থাৎ যিনি সয়ং প্রভুর মাঝে নিজেকে প্রভুর সাথে ফানা করে প্রভুর রঙে রঙিন হয়ে আলিফ রুপ ধারন করে আছেন। “রা” অর্থাৎ আলোকিত এবং যিনি রেজেক প্রাপ্ত, ভাণ্ডার প্রাপ্ত হয়ে কালের যুগের সাক্ষী রুপে দর্শনগত হয়ে আছেন মানবের জন্য।
সেই জন্য সূরা আল ইমরান: 169 আর যারা আল্লাহর রাহে নিহত হয়, তাদেরকে তুমি কখনো মৃত মনে করো না। বরং তারা নিজেদের পালনকর্তার নিকট জীবিত ও জীবিকাপ্রাপ্ত।
চারটি হরফে মাজার শব্দ তৈরী হয়েছে মীম, যা, আলিফ, রে, একজন মানব যখন মাজার পরিদর্শন করতে আসবেন, তখন তাকে মীম রুপ ধারন করে আসতে হবে অর্থাৎ “মীম” রুপ তখনি হয় যখন মাথা নত সেজদাস্থ থাকে তখন। এখন একজন সাধারন মানব এর নিকট কি মাথা নত করা কি ঠিক হবে, না যিনি প্রভুর রঙে রঙিন হয়েছে তার নিকট সেজদাস্থ ভাবে আসা। এর পরে "জা" অর্থাৎ ধারন করা বা চিহ্ন নেওয়া শ্রদ্ধাবান হয়ে সালাম ভক্তি দেওয়া। এর পরে “আলিফ” একজন মানব তখনি আলিফ রুপ ধারন করে যখন সে সৎ পথ পায় এবং শুদ্ধোদন রুপে আসে। এর পরে “রা” অর্থাৎ নুরে আলোকিত একজন মানব তখনি “রা” হতে পারে, যখন তার মাঝে প্রেমময় আল্লাহর রং সত্তা জাগ্রতচিত্ত হয়। ঠিক এই সময় মানব সেই মাজারে যিনি প্রভুর রঙে রঙিন হয়ে বিরাজমান আছেন, তার নিকট হতে কিছু পানা নৈকট্য চান তার উছিলায়। কারন তিনি আল্লাহ এর সাথে মিশে এক হয়েছিলেন।
১. কোরআনের দৃষ্টিতে মাজারের ভিত্তি
পবিত্র কোরআনে সূরা কাহফ, আয়াত: ২১ এ বলা হয়েছে, "তাদের সম্পর্কে মতবিরোধ করছিল তাদের সম্প্রদায়। তারা বলল, আমরা তাদের স্মরণে একটি ইবাদতের স্থান (মসজিদ) তৈরি করব।"
বিষয়বস্তু: আশাব কাহফ বা গুহাবাসী যুবকদের ঘটনাপ্রসঙ্গে উল্লেখ।
তাফসীর বিশ্লেষণ:
ইমাম কুরতুবি, ইবনে কাসীরসহ বহু মুফাসসির বলেন, এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, রূহানী ব্যক্তিদের স্মৃতিকে কেন্দ্র করে একটি পবিত্র স্থান গঠন করা শরিয়তসম্মত।
এটি মাজার সংস্কৃতির একটি মূল ভিত্তি, যা সহীহভাবে কোরআনে এসেছে।
২. হাদীসের আলোকে মাজার ও কবর যিয়ারতের হাকিকত
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন: "আমি পূর্বে তোমাদের কবর যিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম, এখন তা করো, কারণ এটি আখিরাত স্মরণ করিয়ে দেয়।" (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৯৭৬)
🔹 ওলিদের মৃত্যু নয়, বরং আল্লাহর নিকট জীবিত থাকা: "আমার উম্মতের সৎ বান্দারা মারা গেলে, তারা কবরে জীবিত থাকে এবং রিজিক প্রাপ্ত হয়।" (মুসনাদে আহমদ, হাদীস: ১০৪৫৭)
🔹 কবর বা মাজারে যিয়ারত ও দোয়া চাওয়ার অনুমতি রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং দিয়েছেন, এবং ওলিদের রূহ কবরেও আল্লাহর ইশারায় সক্রিয় থাকে।
৩. সুফীবাদে মাজারের হাকিকত
✅ সুফীদের মতে, মাজার হচ্ছে:
রূহানী ফয়েজের কেন্দ্র
আল্লাহর ওলিদের নূরানী উপস্থিতির দরবার
আত্মিক চিকিৎসা ও শিফার স্থান
ইলম ও মারেফতের উৎস
দুনিয়া ও আখিরাতের মধ্যে এক পবিত্র সেতুবন্ধন
✅ কেন মাজারে ফয়েজ হয়?
সুফীদের বিশ্বাস: "ওলির রূহ মৃত্যুর পরেও আল্লাহর নিকট জীবিত থাকে এবং আল্লাহ তাদেরকে ইবাদতগার বানান।" তাদের রূহ সেই জায়গায় এক রূহানী প্রভাব রাখে, যেখানে তারা সমাধিস্থ হন। সে কারণে সেই স্থানে দোয়া কবুল হয়, আত্মা প্রশান্তি পায়।
৪. মাজারে যিয়ারতের আদব ও উদ্দেশ্য
✅ কী উদ্দেশ্যে মাজারে যাওয়া উচিত:
আল্লাহর ওলিকে সম্মান জানানো
তাদের বরকতে দোয়া কবুলের আশায়
আত্মিক শিক্ষা ও পরিশুদ্ধির জন্য
আল্লাহর স্মরণে সময় কাটানোর জন্য
❌ কী উদ্দেশ্যে যাওয়া অনুচিত:
মাজারকে ইলাহ বা উপাস্য ভাবা (শিরক)
অলীক প্রত্যাশা ও কুসংস্কার
বিধর্মীয় আচার-আচরণ
সঠিক আকীদায় যিয়ারত করলে তা ইবাদত নয়, বরং রূহানী যোগাযোগ ও দোয়ার মাধ্যম।
৫. উল্লেখযোগ্য সুফী ব্যক্তিত্বদের মতামত
✦ ইমাম আল গাযালী (রহঃ):“ওলিদের কবর যিয়ারত আত্মার পরিশুদ্ধির জন্য বিশেষ কার্যকর।”
✦ হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহঃ):“ওলিদের মাজার হলো রহমতের দরজা। তারা আল্লাহর প্রতিনিধি; তাদের মাধ্যমে বান্দা ফয়েজ পায়।”
✦ হযরত আলী হুজভিরী (রহঃ):“যে ব্যক্তি ওলিদের মাজারের হাকিকত উপলব্ধি করতে পারে না, সে সত্যিকারের সুফী হতে পারে না।” — (কশফুল মাহজুব)
৬. মাজার ও শিরকের বিভ্রান্তি
অনেকে মাজারে দোয়া চাওয়া বা সাহায্য চাওয়াকে "শিরক" মনে করেন। কিন্তু—
✅ সুন্নি ও সুফী আকীদায়:
ওলিদের সাহায্য মানে, তাদের দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চাওয়া।
কোরআনেই বলা হয়েছে, “তোমরা আল্লাহর দিকে যাও ওসীলার মাধ্যমে”। (সূরা মায়েদা: ৩৫)
👉 ওলি হলেন সেই ওসীলা বা মাধ্যম, আল্লাহর ইচ্ছাতেই যারা দোয়ার দরজা।
✅ সংক্ষেপে: মাজারের হাকিকত এক নজরে
বিষয় ব্যাখ্যা
কোরআন রূহানী ব্যক্তিত্বদের স্মরণে স্থান নির্মাণ বৈধ
হাদীস কবর যিয়ারত অনুমোদিত, আত্মিক উপকারে সহায়ক
সুফীবাদ মাজার হলো রূহানী আলো, দোয়ার কেন্দ্র
ভুল ধারণা মাজার মানেই শিরক নয়, বরং তা আল্লাহর ওলি-প্রেমের বহিঃপ্রকাশ
উপসংহার:
মাজার ইসলামের বাইরে কোনো জিনিস নয় বরং এর ভেতরের আত্মিক জগতের দরজা। কোরআন, হাদীস ও সুফীবাদের আলোকে বলা যায়—মাজার হলো এক আধ্যাত্মিক মাকাম, যা আল্লাহর বান্দাদের আত্মিক উন্নয়নের এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। যারা সত্যিকারের ভালোবাসা ও ইখলাস নিয়ে মাজার যিয়ারত করেন, তারা কেবল ইতিহাস নয় বরং আধ্যাত্মিক বাস্তবতার স্পর্শ লাভ করেন।
.jpg)
No comments