শয়তান কোথায় থাকে?
“শয়তান কোথায় থাকে?” — এ প্রশ্নটি বহু মানুষের মনে আসে। সে কি একটি নির্দিষ্ট জায়গায় অবস্থান করে? নাকি সে মানুষের সাথে সবসময় ঘুরে বেড়ায়? আসুন, আমরা কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে শয়তানের অবস্থান ও চলাফেরা সম্পর্কে বিস্তারিত জানি।
কুরআনের আলোকে: শয়তান সর্বত্র ঘুরে বেড়ায়
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন "সে (শয়তান) বলল, ‘আমি অবশ্যই তাদের (মানুষের) জন্য তোমার সরল পথে বসে থাকব। তারপর আমি অবশ্যই তাদের সামনে, পেছনে, ডানে এবং বামে থেকে তাদের কাছে আসব।’" (সূরা আল-আ'রাফ, ৭:১৬-১৭)
ব্যাখ্যা:
- শয়তান মানুষের চারদিক থেকে ঘিরে রাখে
- সে স্থির হয়ে একটি স্থানে থাকে না
- সে সর্বত্র ঘুরে বেড়িয়ে মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়
- শয়তান মানুষের অন্তরে বাস করে (ওয়াসওয়াসা দেয়)
আল্লাহ বলেন, "যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে।" (সূরা নাস, ১১৪:৫) এর থেকে বোঝা যায়, শয়তান মানুষের অন্তরে “স্থান” করে নেয় — বিশেষ করে যখন মানুষ গাফেল থাকে, নামাজ ও যিকিরে অলস হয়।
হাদীসের আলোকে: শয়তানের কিছু নির্দিষ্ট অবস্থান
১. মানুষের রক্তনালিতে শয়তান চলাফেরা করে
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "নিশ্চয়ই শয়তান মানুষের শরীরে রক্ত সঞ্চালনের মত প্রবাহিত হয়।" (সহীহ বুখারী: ৩৩৮১, সহীহ মুসলিম: ২১৭৫)
এই হাদীস স্পষ্ট করে যে শয়তান মানুষের শরীরে প্রবেশ করে এবং তাকে প্ররোচিত করে, বিশেষ করে রাগ, লোভ, কামনা — এইসব অনুভূতির সময়।
২. শয়তান “ঘর” ছাড়ে না, যদি যিকির না থাকে
রাসূল ﷺ বলেছেন, "যে ঘরে আল্লাহর নাম স্মরণ করা হয় না, সেখানে শয়তান বাস করে।" (মুসলিম, তিরমিযী)
তাই আমাদের উচিত ঘরে:
- নামাজ পড়া
- কুরআন তিলাওয়াত করা
- নিয়মিত যিকির করা
৩. শয়তান রাতে নির্দিষ্ট স্থানে শয়ন করে
রাসূল ﷺ বলেছেন, "যখন তোমাদের কেউ রাতে ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়তে চায়, তখন শয়তান তার মাথার পেছনে তিনটি গিঁট বেঁধে রাখে... যদি সে উঠে যায়, আল্লাহকে স্মরণ করে, গসল করে ও নামাজ পড়ে, তাহলে গিঁট খুলে যায় এবং সে সকালের দিকে প্রফুল্ল ও চঞ্চল হয়ে ওঠে। না হলে সে অলস ও গাফেল হয়ে থাকে।" (সহীহ বুখারী: ১১৪২)
শয়তান ঘুমের সময়ও মানুষের ওপর প্রভাব রাখে।
৪. শয়তান মসজিদে থাকতে পারে না (যদি যিকির হয়)
রাসূল ﷺ বলেছেন, "যেখানে আযান দেয়া হয়, সেখান থেকে শয়তান পালিয়ে যায়, এমনকি সেখানে আর না শুনার জন্য সে পাদত্যাগ করে।" (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
তাই আযান, কুরআন, যিকির — এগুলোর মাধ্যমে শয়তান দূরে থাকে। তাহলে শয়তানের অবস্থান সারাংশে কী?
অবস্থান ব্যাখ্যা
মানুষের চারপাশে সামনে, পেছনে, ডানে, বামে থেকে প্রভাব ফেলে (আ'রাফ ৭:১৭)
মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয় (সূরা নাস)
রক্তনালিতে হাদীস অনুযায়ী শরীরের ভেতরেও প্রবেশ করে
নির্জন ও যিকিরহীন ঘরে যিকির না থাকলে ঘরেও শয়তান বাস করে
যেখানে আল্লাহর স্মরণ হয় না যেমন বাজার, ঘুমের সময়, অলসতার পরিবেশ
হাকিকাতে শয়তানের অবস্থান
আমরা এখন হাকিকাতে শয়তানের অবস্থান এবং আসল শয়তানের পরিচয় ও ব্যাখ্যা সামান্য দিতে চাই। পবিত্র কোরান অনুসারে শয়তান চার প্রকার : যেমন- ইবলিশ, শয়তান, মরদুদ এবং খান্নাস। উপরোক্ত বর্ণনায় সূরা আল-আ'রাফে বলা হয়েছে "সে (শয়তান) বলল, ‘আমি অবশ্যই তাদের (মানুষের) জন্য তোমার সরল পথে বসে থাকব। তারপর আমি অবশ্যই তাদের সামনে, পেছনে, ডানে এবং বামে থেকে তাদের কাছে আসব।’" এখানে শয়তান মানুষে অন্তরের সামনে, পেছনে, ডানে এবং বামে থেকে তার কার্য প্রণালী পরিচালনা করবে।
আল্লাহ তায়ালা কোরান ঘোষণা করেন : পবিত্র কোরান অনুযায়ী এই চার প্রকার শয়তানকে আল্লাহ্ পাক মাত্র দুইটি স্থানে থাকবার অনুমতি দিয়েছেন। এই দুইটি স্থান ছাড়া এই চার প্রকার শয়তানকে আর কোথাও থাকার অনুমতি দেওয়া হয় নি, এমনকি আল্লাহর সমগ্র সৃষ্টিরাজ্যের আর কোথাও থাকার অনুমতি দেওয়া হয় নি। যে দুইটি নির্দিষ্ট স্থানে এই চারটি শয়তানকে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছে সেই স্থান দুইটির নাম হল : জিনের অন্তর এবং মানুষের অন্তর। জিনের অন্তর এবং মানুষের অন্তর ছাড়া এক পা-ও বাহিরে যাবার ক্ষমতা শয়তানের নাই। সুতরাং জিনের অন্তর এবং মানুষের অন্তর ছাড়া এই চারটি শয়তানের থাকবার আর কোন বিন্দুমাত্র স্থান নাই।
মানুষ কি সবসময় এক থাকে : প্রতিটি মানুষ মনে করে যে সে একা, কিন্তু আসলে সে মোটেই একা নয়। যেহেতু প্রতিটি মানুষের সঙ্গে শয়তানকে পরীক্ষা করার জন্য দেওয়া হয়েছে সেই হেতু মানুষ দুইজন, অনেকটা একের ভিতরে দুইয়ের মত। কিন্তু ইহাও সত্য নহে। কারণ জীবাত্মার সঙ্গে খান্নাসরূপী শয়তান পাশাপাশি অবস্থান করছে, সে রকমভাবে আরেকজন অবস্থান করছে। সেই আরেকজনের নাম হল রূহ তথা পরমাত্মা তথা স্বয়ং আল্লাহ্। তাই প্রতিটি মানুষের শাহারগের নিকটেই আল্লাহ্ আছেন বলে ঘোষণাটি দেখতে পাই। অন্য কোনো জীব-জানোয়ারের শাহারগের নিকটে আল্লাহর অবস্থানটির ঘোষণা কোরানে পাই না।
শয়তান থেকে বাঁচার উপায়
আল্লাহ তাআলা বলেন, "যখন শয়তানের কুমন্ত্রণা আসে, তখন আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাও।"(সূরা আ'রাফ, ৭:২০০)
করণীয়:
- “আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রজিম” পড়া
- নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত
- ফজর ও এশার নামাজ জামাতসহ পড়া
- ঘুমের আগে আয়াতুল কুরসি ও ৩ কুল পড়া
- ঘর-বাড়ি ও ব্যবসা স্থানে আযান ও যিকির চালু রাখা
উপসংহার
✅ শয়তান কোনো নির্দিষ্ট স্থানে আবদ্ধ নয়। বরং সে মানুষের অন্তরে, চারপাশে ও গাফেল পরিবেশে অবস্থান করে।
✅ কুরআন ও হাদীস অনুসারে শয়তান সর্বত্র চলাফেরা করে এবং মানুষের শরীর, মন ও পরিবেশে প্রবেশের চেষ্টা করে।
✅ তাই একজন মুসলমানের উচিত, সর্বদা সচেতন থাকা, যিকির করা ও আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া।
.jpg)
No comments