কিভাবে_ইবনে_সৌদ_ও_ওহাবীরা_ফিলিস্তিন_বিক্রি_করে
ফিলিস্তিনের ভূমি মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ের একটি কেন্দ্রবিন্দু ও স্পন্দন। এই ভূমি শুধু ভূ-রাজনৈতিক ভাবে নয়, বরং ইসলামি বিশ্বাস, ঐতিহ্য এবং আত্মার সাথে গভীরভাবে জড়িত। কিন্তু ইতিহাস ও রাজনৈতিক অংশীদারিত্বের কারণে এবং এখানে আরও বিস্ময়কর ‘পেছনের দৃশ্য’ রয়েছে, যেখানে ইবনে সৌদ ও ওহাবি আন্দোলনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। তবে প্রশ্ন উঠে কিভাবে ফিলিস্তিনে ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠিত হলো? কারা এর পেছনে ভূমিকা রেখেছিল?
১. ইবনে সৌদ ও ব্রিটিশদের গোপন চুক্তি
১৯১৫-১৯১৬ সালে হেনরি ম্যাকমাহন ও শরীফ হোসেন-এর মধ্যে হওয়া ম্যাকমাহন-হোসেন চিঠিপত্রতে ব্রিটিশরা আরবদের স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু গোপনে তারা বেলফোর ঘোষণা এর মাধ্যমে ১৯১৭ সালে ইহুদিদের ফিলিস্তিনে বসতি স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেয়।
এই সময়ে ইবনে সৌদ ছিলেন নাজদের (বর্তমান সৌদি আরবের একটি অঞ্চল) শাসক এবং ওহাবি মতবাদের অনুসারী। তিনি ব্রিটিশদের সহায়তায় হিজাজ (মক্কা-মদিনা) জয় করেন এবং শরীফ হোসেনকে বিতাড়িত করেন।
সংধি (১৯১৫): ইবনে সৌদ ও ব্রিটিশদের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যার মাধ্যমে ইবনে সৌদ ব্রিটিশদের প্রোটেক্টরেট হিসেবে স্বীকৃতি পান এবং প্রচুর অর্থ ও অস্ত্র সামগ্রী লাভ করেন।
জেদ্দা চুক্তি (১৯২৭): ইবনে সৌদকে সার্বভৌম রাজা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ব্রিটিশ তাকে বিরোধিতার বিনিময়ে স্বীকৃতি দেয়। ১৯২৭ সালের জেদ্দা চুক্তি অনুযায়ী ইবনে সৌদ ব্রিটিশদের মিত্র হিসেবে স্বীকৃতি পান। এর বিনিময়ে তিনি ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী নীতিকে সমর্থন দেন। ঐ সময় ফিলিস্তিনে ব্রিটিশ প্রভাব ছিল এবং ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার কাজ চলছিল। ইবনে সৌদ এর বিরোধিতা করেননি, বরং নীরব সমর্থন দেন।
এই সহায়তার বিনিময়ে ইবনে সৌদ:
- ব্রিটিশদের হয়ে কাজ করতে বাধ্য হন, বিশেষ করে হেজাজ অঞ্চল দখলে।
- ব্রিটিশ প্রভাবের সুসংহতি ঘটাতে অংশ নেন, যাতে ফিলিস্তিনি ইস্যুতে প্রতিবাদ না ওঠে।
২. হাশেমি-ওহাবি যুদ্ধ ও মুসলিম ঐক্য নষ্ট
১৯২৪–২৫ সালে, ব্রিটিশ পুরোপুরি শরীফ হুসেইন-এর সামরিক ও আর্থিক সহায়তা বন্ধ করে দেয়।
তারপর ওয়াহাবি ইখওয়ানের মাধ্যমে হেজাজ দখল করে ইবনে সৌদ, যেখানে লাখো জনগণ হত্যার সম্মুখীন হন এবং ঐতিহ্যবাহী ইসলামী প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়।
ফলস্বরূপ:
- শরীফ হাশেমির নেতৃত্বাধীন ঐ ঐক্যবদ্ধ পরিস্থিতি দুর্বল হয়ে যায়।
- মুসলিম ঐক্যের ভিত্তি নষ্ট হয়; ব্রিটিশ-ইসরায়েল নীতি চালু হতে পায়।
- ওহাবি মতবাদ ও মুসলিম বিভাজন
ওহাবি মতবাদ রাজনৈতিক ভাবে ইসলামি ঐক্য ও খেলাফতের বিপরীত। তারা একমাত্র নিজস্ব তাওহিদের ব্যাখ্যাকে শুদ্ধ মনে করে এবং অন্যান্য মতবাদ, বিশেষ করে সুফিবাদ ও ঐতিহ্যগত ইসলামকে ‘বিদআত’ আখ্যা দিয়ে বিতাড়িত করে। ফলে মুসলিমদের মধ্যে ঐক্য নষ্ট করে এবং ব্রিটিশদের উপনিবেশ বিস্তারে সহায়তা করে।
৩. ব্রিটিশের ফিলিস্তিন নীতিতে ইবনে সৌদের ভূমিকা
আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও ব্রিটিশ সহযোগিতায় ইবনে সৌদকে ব্যবহার করা হয়:
- হাশেমির ফিলিস্তিন সংক্রান্ত বিরোধ গভীর করতে
- ওয়াহাবি শক্তিকে উন্নীত করে ইসলামী ঐক্য ভাঙতে সাহায্য
বাস্তবতা: ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার সময় (১৯৪৮), সৌদি আরব উল্লেখযোগ্য সামরিক পদক্ষেপ নেয়নি। বরং, তারা পশ্চিমা শক্তির রাজনৈতিক নীতি ও তেলের নিরাপত্তায় মনযোগ দেয়।
৪. পেছনের উদ্দেশ্য ও রাজনৈতিক খেলা
ব্রিটিশ কর্তৃক ইবনে সৌদকে সহযোগিতা : ১৯২০ সালের শেষের দিকে, ব্রিটিশরা ইবনে সৌদকে তার মাসিক ভর্তুকি ১০,০০০ পাউন্ড স্বর্ণের অনুদান দিয়েছিলো, (আল-এনাজি, পৃ. ১০৪)। এছাড়া ব্রিটিশ-ভারতীয় প্রশিক্ষকদের সাথে গুরুতর অবরোধ এবং চারটি ফিল্ড বন্দুক ছাড়াও ১০,০০০ এর বেশি রাইফেলসহ প্রচুর অস্ত্র সরবরাহ প্রদান করে। [আসকার এইচ. আল-এনাজি, "সৌদি আরবের সৃষ্টি: ইবনে সৌদ এবং ব্রিটিশ ইম্পেরিয়াল পলিসি, ১৯১৪-১৯২৭,পৃ.১০৪ (২০১০ সালে প্রকাশিত)] বইয়ে বলা হয়েছে, ১৯২১ সালের সেপ্টেম্বরে ব্রিটিশরা ইবনে সৌদকে হাইলে অধিষ্ঠিত করে এরপর একই বছরের নভেম্বরে সে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটিশদের কাছে আত্মসমর্পণ করলে ব্রিটিশরা ইবনে সৌদকে একটি নতুন উপাধি প্রদান করে।
সৌদ কর্তৃক ইসলামী খিলাফতের অবসান : ইবনে সৌদের বাহিনী অঞ্চলগুলো দখল করতে থাকে। তায়েফে, ইবনে সৌদে ও ওয়াহাবীরা তাদের প্রথাগত গণহত্যা শুরু করে, মুসলিম পুরুষ, নারী ও শিশুদের হত্যা করার পাশাপাশি মসজিদে গিয়ে ইসলামি পণ্ডিতদের হত্যা করে। তারা ১৯২৪ সালের অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটিশ কর্তৃক পাওয়া অস্ত্র দিয়ে ইসলামের পবিত্রতম স্থান মক্কা দখল করে। অবশেষে, ইবনে সৌদ ১৯২৫ সালের জানুয়ারিতে জেদ্দা অবরোধ শুরু করে এবং শেষ পর্যন্ত শহরটি ১৯২৫ সালের ডিসেম্বরে আত্মসমর্পণ করে যার ফলে নবী হযরত মুহাম্মদ (ﷺ)-এবং তার বংশধরদের ১০০০ বছরেরও বেশি শাসনের (খিলাফত) অবসান ঘটে।
সৌদি আরবের নাম পরিবতন : ১৯২৬ সালে ব্রিটিশরা আনুষ্ঠানিকভাবে ইবনে সৌদকে হেজাজের নতুন রাজা হিসাবে স্বীকৃতি দেয় এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অন্যান্য ইউরোপীয় শক্তিগুলিও এটি অনুসরণ করে। সেই সাথে পশ্চিমাদের মধ্যে ইবনে সৌদের আন্তর্জাতিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা হয়। ১৯৩২ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য দ্বারা নতুন একীভূত ওয়াহাবী রাষ্ট্রটিকে "কিংডম অব সৌদি আরব" হিসাবে পুনঃ নামকরণ করা হয়।
মানচিত্র পরিবর্তন : ব্রিটিশরা ইবনে সৌদ এবং ওয়াহাবীদেরকে এই অঞ্চলে তাদের প্রধান শক্তিতে পরিণত করে। ফিলিস্তিনে ইহুদিবাদ চাপিয়ে দিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে পরিচালনা করে এইভাবে সমসাময়িক সৌদি আরব (ওয়াহাবি রাষ্ট্র) ভৌগোলিক ডিএনএ (মানচিত্রে) অন্তর্ভুক্ত হয়।
৫. ইতিহাস থেকে শিক্ষা
১৯৪৮ সালে যখন ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়, সৌদি আরব কোনো উল্লেখযোগ্য সামরিক পদক্ষেপ নেয়নি। বরং পশ্চিমা শক্তির মিত্র হিসেবে তেল অর্থনীতি ও রাজতান্ত্রিক নিরাপত্তা রক্ষায় ব্যস্ত ছিল। বর্তমানে যখন ফিলিস্তিন সংকট বিশ্বজুড়ে আলোচিত, তখন অতীতের এই অধ্যায় আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—কে বন্ধু আর কে বিশ্বাসঘাতক। ফিলিস্তিন শুধু একটি রাজনৈতিক ইস্যু নয়, এটি মুসলিম উম্মাহর একতা, আত্মমর্যাদা ও বিশ্বাসের প্রতীক।
উপসংহার
ইবনে সৌদ ও ওহাবিদের ভূমিকা ইতিহাসে বিতর্কিত হলেও, এটি স্পষ্ট যে পশ্চিমা উপনিবেশবাদ ও ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পেছনে তাদের নীরব সমর্থন ও মুসলিম ঐক্য বিনষ্টের ভূমিকা ছিল। এখন সময় এসেছে সত্যকে জানার, বুঝার এবং ঐক্যবদ্ধ হওয়ার—ফিলিস্তিনের পক্ষে, ন্যায়ের পক্ষে।
- ইতিহাস থেকে কঠিন সত্য: ইবনে সৌদ, ওহাবি আন্দোলন ও ব্রিটিশদের কৌশলগত অংশীদারিত্ব ফিলিস্তিন-সংকটে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
- মুসলিম ঐক্য ও ঐতিহ্য নষ্ট: এই সমঝোতার ফলে ইসলামি ঐতিহ্য ও রাজনৈতিক ঐক্যের ভাঙন ঘটে।
- আজকের প্রাসঙ্গিকতা: বর্তমান বৈশ্বিক সংকটে এটি শিক্ষা—মুসলিম ঐক্য ও ইতিহাসের দিকটি ভুলে গেলে ভবিষ্যৎ আরও সংকটাপন্ন হবে।
.jpg)
No comments