Header Ads

আশহাদু আন্না আমিরুল মুমিনিনা আলিউন ওয়ালীউল্লাহ" সাক্ষী ছাড়া আল্লাহর দ্বীন সম্পূর্ণরূপেই অসম্পূর্ণ I

 

সুফী মতে, ইসলামের আধ্যাত্মিক পরিপূর্ণতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য হলো, “আশহাদু আন্না আমিরুল মুমিনিনা আলিউন ওয়ালীউল্লাহ” (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমিরুল মুমিনিন হযরত আলি (আ.) আল্লাহর ওলি)।

সুফীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, শুধুমাত্র আল্লাহ ও রাসূলের সাক্ষ্যের পর হযরত আলি (আ.)-এর "ওলায়াত" বা নেতৃত্বের সাক্ষ্য ছাড়া দ্বীন সম্পূর্ণ হয় না। তাঁরা মনে করেন, আল্লাহর নিকট পৌঁছাতে হলে আল্লাহর প্রিয় ও নিযুক্ত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পৌঁছাতে হয়, যার মাঝে আলি (আ.)-এর স্থান অতি গুরুত্বপূর্ণ। এই সাক্ষ্য সৎ পথ ও সত্যের প্রতি গভীর আত্মসমর্পণের প্রতীক।

সুফী দর্শনে "ওলায়াত" মানে শুধু নেতৃত্ব নয়, বরং আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার এবং আল্লাহর রহমতের উৎস। তাই অনেক সুফী তরীকায় এই সাক্ষ্যকে দ্বীনের পরিপূর্ণতার অংশ হিসেবে ধরা হয়। এটি নিছক একটি বাক্য নয়, বরং তা ইসলামের আধ্যাত্মিক দিক ও ভেতরের তত্ত্বগত গভীরতাকে নির্দেশ করে।

কোরান ভিত্তিক আলোচনা

আমিরুল মুমিনিন মাওলা আলীর (আঃ) ওয়ালায়াতের বা বেলায়েতের স্বাক্ষ্য প্রদান বা স্বাক্ষ্য অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে আল্লাহর দ্বীন পরিপূর্ণ হয়েছে এবং মাওলা আলীর (আঃ) ওয়ালায়াত বা বেলায়েতের স্বাক্ষ্য প্রদান ছাড়া সবসময়ই আল্লাহর দ্বীন অসম্পূর্ণই থাকবে I তাই প্রতিটি আজান , ইকামত এবং নামাজ যার মধ্যে "আশহাদু আন্না আমিরুল মুমিনিনা আলিউন ওয়ালীউল্লাহ" নেই কিংবা বাদ দিয়েছে, তা অসম্পূর্ণ I

স্বাক্ষ্য প্রদানের ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরানের সুরা বাকারায় বর্ণিত করেছেন, " আর তোমরা স্বাক্ষ্য গোপন করিবে না । আর যে কেউ গোপন করে তার অন্তর অবশ্যই গুনাহগার হয়েছে । এবং তোমরা যা করে থাক আল্লাহ তা বিলক্ষন জানেন "। সুরা - বাকারা / ২৮৩ ।

যারাই গোপন করে যাচ্ছেন তাদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ বলেন, " এবং তার চেয়ে বড় জালেম (অবিচারক) কে হবে যে আল্লাহর কাছ থেকে এমন স্বাক্ষ্য গোপন করে যা তার কাছে আছে I" সুরা - বাকারা / ১৪০ ।

দ্বীনের পরিপূর্ণতায় আলি (আ.)-এর ওলায়াতের সাক্ষ্য

সুফীবাদ একটি আধ্যাত্মিক পথ, যা ইসলামের বাইরের নয় বরং তার অন্তরের রহস্য। এটি “তাসাওউফ” নামে পরিচিত, যার মূল উদ্দেশ্য — আল্লাহর সাথে গভীর আত্মিক সংযোগ স্থাপন করা। এই পথে চলতে হলে শুধুমাত্র শরিয়তের বাইরের কাঠামো নয়, বরং তরিকত (আধ্যাত্মিক পথ) ও মারেফত (আত্মিক উপলব্ধি) অর্জন করতে হয়। এখানে “ওলায়াত” একটি কেন্দ্রীয় ধারণা।

কালেমা ও ওলায়াত

সুফীদের একটি বড় অংশ মনে করে, তাওহিদ ও রিসালতের সাক্ষ্যের পাশাপাশি ওলায়াতের স্বীকৃতি না থাকলে দ্বীন পূর্ণতা লাভ করে না।

সাক্ষ্যটি: “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমিরুল মুমিনিন আলি আল্লাহর ওলি”

সুফী মতে, আল্লাহর ওলিদের নেতৃত্ব বা ওলায়াত স্বীকার করা ছাড়া আত্মিক উন্নয়ন অসম্ভব।

বিশেষ করে হযরত আলি (আ.)-কে “বাতিনে রাসুল” (নবীর আধ্যাত্মিক উত্তরসূরি) হিসেবে দেখা হয়।

সুফী দর্শনে আলি (আ.)-এর ভূমিকা

আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার : হযরত আলি (আ.)-কে সবকিছুতে নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জ্ঞানের ও ইলহামের উত্তরাধিকারী হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি হলেন তাসাওউফের প্রথম ও প্রধান মুর্শিদ। প্রায় সব সুফী তরীকা তাঁর মধ্য দিয়েই নবীর আধ্যাত্মিক শৃঙ্খলা শুরু করে।

ইলম ও মারেফতের উৎস : সুফীদের দৃষ্টিতে, আলি (আ.) ছিলেন “বাবুল ইলম” — জ্ঞানের দরজা। তাঁর মাধ্যমে আল্লাহর গোপন রহস্য উন্মোচিত হয়।

মাহবুবুল্লাহ (আল্লাহর প্রিয়জন) : সুফীরা মনে করেন, আলি (আ.) হলেন সেই ওলি যাঁর মাধ্যমে আত্মা আল্লাহর দিকে যাত্রা করতে পারে। তিনি হচ্ছেন “সিররুল্লাহ” — আল্লাহর গোপন রহস্য।

প্রসিদ্ধ সুফী ব্যক্তিত্বদের দৃষ্টিভঙ্গি

শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী বলেছেন, “ওলায়াত হলো সেই গোপন পথ, যার শুরু আলি (আ.) এবং যার অন্তঃস্থ রহস্য কেবল ওলিরাই জানেন।”

ইমাম গযালী বলেছেন, “আলি (আ.)-এর মারেফত ছাড়া কেউ প্রকৃত জ্ঞানে উত্তীর্ণ হতে পারে না।”

ইমাম বাকের (আ:) বললেন, "বেলায়েতে মাওলী (আ:) স্বাক্ষ্য ছাড়া দুশমান নামাজ পড়ুক আর জিনা করুক একই বিষয় , চুরি করুক আর রোজা রাখুক একই বিষয় "! মূস্তাদারাক আল ওয়াসাইল,  আল কাওয়ানিন আশ-শারিয়া, মূআল্লাফ-আঘা মুহম্মাদ আলী তাবাতাবায়ি, আল হাকীক আন নাসিরা সহ আরো অনেক গ্রন্থে উল্লেখ আছে। 

মুহাম্মাদ আল-আত্তার আশআরী মুহাম্মাদ ইবনে আলী হামদানী হানান ইবনে সাদীর তার পিতা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি ইমাম বাকের (আ.)-কে বলতে শুনেছি, "আলী (আ.)-এর শত্রু দুনিয়া থেকে এমন অবস্থায় চলে যাবে যে সে অবশ্যই জাহান্নামের উত্তপ্ত পানি চেখে দেখবে"।

তিনি (আ:) আরও বললেন, "যে ব্যক্তি এই ইমামতের বিরোধিতা করে, তার জন্য সমান—সে নামায পড়ুক বা ব্যভিচার করুক। সাওয়াবুল আমাল (শেখ সাদুক) পৃষ্ঠা-২০৩, বিহারুল আনোয়ার খণ্ড-২৮, পৃষ্ঠা-২৩৫ হাদিস-৫০ I

হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) সহ প্রায় সব সুফী তরীকাই আলি (আ.)-এর মাধ্যমেই আধ্যাত্মিক সিলসিলা শুরু করে।

ওলায়াত ছাড়া দ্বীন কেন অসম্পূর্ণ?

সুফী মতানুসারে:

তাওহিদ (আল্লাহর একত্ব),

রিসালত (নবুয়ত),

ও ওলায়াত (আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব)

এই তিনটি স্তম্ভ একত্রে ইসলামের পরিপূর্ণ রূপ। ওলায়াত ছাড়লে মানুষ শরিয়তের বাইরের আধ্যাত্মিক সত্যে প্রবেশ করতে পারে না। অতএব যারা নিজেদের মাওলা আলীর (আঃ) শীয়া কিংবা মুহিব পরিচয় দেয় কিন্তু শাহাদাত দেওয়াকে অস্বীকার করা তথা পবিত্র কোরআন অস্বীকার , মাসুমিনগনকে (আঃ) অস্বীকার , আল্লাহর রাসুলকে (সাঃ) অস্বীকার এবং সর্বোপরি স্বয়ং আল্লাহকে অস্বীকার I

সুফীদের দৃষ্টিতে “ওলি” ও “ওলায়াত”

সুফীবাদে ওলি বলতে বোঝায় এমন একজন ব্যক্তি, যিনি আল্লাহর ঘনিষ্ঠ, আত্মার মাধ্যমে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করেছেন। হযরত আলি (আ.)-কে তারা প্রথম ও সর্বোচ্চ “ওলি” হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, যাঁর মধ্যে জাহির (বাহ্যিক) ও বাতিন (আন্তরিক) উভয় জ্ঞানের সমন্বয় ছিল।

ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেছেন: “আলি ছিলেন সেই দরজা যার মাধ্যমে মানুষ সত্যে প্রবেশ করে। তাঁকে ছাড়া কেউ হাকিকত (সত্য) অবধি পৌঁছাতে পারবে না।”

সুফী গ্রন্থ ও সূত্রে আলির ওলায়াত

মাকতুবাত-ই-রব্বানী (ইমাম রাব্বানী) – আলিকে “বাবুল হিকমাহ” (জ্ঞানের দরজা) হিসেবে চিহ্নিত করেন।

কশফুল মহজুব (আলী হুজভিরী) – বলেন, “যারা আলির মারেফত লাভ করেনি, তারা প্রকৃত সুফী নয়।”

ফুতুহাত আল-মাক্কিয়া (ইবনে আরাবী) – আলিকে “Seal of Wilayah” (ওলায়াতের সীলমোহর) বলেন।

উপসংহার

সুফীবাদের আলোকে বলা যায়, ❝“আশহাদু আন্না আমিরুল মুমিনিনা আলিউন ওয়ালীউল্লাহ” — এই সাক্ষ্য ব্যতীত আল্লাহর দ্বীন আধ্যাত্মিকভাবে পরিপূর্ণ হয় না।”❞

এটি শুধুই ধর্মীয় পরিচয়ের অংশ নয়, বরং আত্মিক জ্ঞান ও আল্লাহর নৈকট্যের একটি রহস্যপূর্ণ পথ। সুফীরা মনে করেন, আলি (আ.)-এর ওলায়াতকে হৃদয়ে ধারণ না করলে আল্লাহর আসল প্রেম ও দর্শন কখনোই পুরোপুরি অনুধাবন করা যায় না।



No comments

Powered by Blogger.