Header Ads

প্রাচীন আরবের প্রেক্ষাপট (১৭০০ শতক):


 ১৭০০ শতকে, বর্তমান সৌদি আরবসহ পুরো আরব উপদ্বীপ ছিল রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত, ধর্মীয়ভাবে দুর্বল, এবং সামাজিকভাবে অস্থির। নিচে আলাদা আলাদাভাবে বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করা হলো:


১. রাজনৈতিক অবস্থা:পুরো আরব উপদ্বীপে কোনো একক কেন্দ্রীয় সরকার ছিল না। এলাকা ভাগ ছিল বিভিন্ন গোত্র, ক্ববিলা, এবং স্থানীয় শাসকদের মধ্যে। বিশেষ করে নাজদ, হিজাজ, আসির, ইয়ামান—প্রতিটি এলাকায় ছিল আলাদা শাসক বা নেতা। মক্কা ও মদিনা ছিল উসমানীয় (ওসমানী) খিলাফতের আওতাভুক্ত, কিন্তু তারা সরাসরি শাসন করত না, বরং স্থানীয় শরীফদের মাধ্যমে পরিচালিত হতো। অর্থাৎ, গোটা আরব ছিল বিভক্ত ও দুর্বল— কোনো ঐক্য ছিল না।

২. ধর্মীয় অবস্থা: ইসলাম প্রচারিত থাকলেও তাতে ছিল অজস্র কুসংস্কার, বিদআত ও শিরক। ধারণ মানুষ অনেকেই:কবরকে কেন্দ্র করে পূজা, মানত, তাওয়াফ করত, পীর-আউলিয়ার নামে মাযার ও উরস পালন করত, তাবিজ, ঝাড়ফুঁক, জিনের উপাসনা, হাত দেখানো, ফুসমন্ত্র— এসব ব্যাপকভাবে চালু ছিল, প্রকৃত তাওহিদ ভিত্তিক ইসলামী আকীদা ও সহীহ সুন্নাহ হারিয়ে যেতে বসেছিল, এ অবস্থায় অনেক আলেম ও চিন্তাবিদ চিন্তিত ছিলেন, এবং সংস্কারের প্রয়োজন অনুভব করছিলেন।

৩. সামাজিক অবস্থা: গোত্রভিত্তিক সমাজব্যবস্থা ছিল প্রধান। গোত্র-সংঘর্ষ ও যুদ্ধ ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। নারী ও শিশুদের অধিকার সীমিত ছিল। শিক্ষার হার ছিল খুবই কম; ইসলামি জ্ঞানের ক্ষেত্রেও অনেক এলাকায় অজ্ঞতা ছড়িয়ে পড়েছিল।

৪. অর্থনৈতিক অবস্থা: কৃষি, পশুপালন ও বাণিজ্যের উপর নির্ভরশীল ছিল। শহরাঞ্চলে বাণিজ্য থাকলেও গ্রামাঞ্চল ছিল দরিদ্র ও অনুন্নত। হজের মৌসুমে বাণিজ্য ছিল অর্থনীতির একটি বড় উৎস।

সারসংক্ষেপ:

 দিক                                             অবস্থা    

 রাজনীতি                                     বিভক্ত, গোত্রভিত্তিক, দুর্বল শাসন ।    

 ধর্ম                                             শিরক-বিদআতে ভরা, বিশুদ্ধ তাওহিদ বিলুপ্ত ।    

সমাজ                                     কুসংস্কারাচ্ছন্ন, গোত্রীয় দ্বন্দ্বে জর্জরিত ।    

অর্থনীতি                                     বাণিজ্যনির্ভর, দরিদ্র জনগোষ্ঠী ।  

আরব সমাজে                                 নারীদের অবস্থা (১৭০০ শতক)

১৭০০ শতকে আরব উপদ্বীপে নারীদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ভূমিকা ছিল অত্যন্ত সীমিত এবং পুরুষশাসিত সমাজে তাঁরা অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত ছিলেন। যদিও ইসলামের আদর্শ নারীদের সম্মান ও অধিকার দিয়েছে, বাস্তবে সেই আদর্শ অনেক জায়গায় হারিয়ে গিয়েছিল।

সামাজিক অবস্থা: নারীরা সাধারণত গৃহস্থালির কাজ ও সন্তান প্রতিপালনে সীমাবদ্ধ থাকতেন। গোত্রভিত্তিক সমাজে নারীদের মর্যাদা নির্ভর করত তাঁর পরিবার ও গোত্রের অবস্থানের উপর। বহু জায়গায় বাল্যবিবাহ প্রচলিত ছিল। একাধিক বিবাহ ও নারীদের উত্তরাধিকার বঞ্চনা সাধারণ ছিল। নারীদের চলাফেরা, পর্দা, বৈঠকি স্বাধীনতা—সবকিছু পুরুষের নিয়ন্ত্রণে থাকত। 

ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ভূমিকা: ইসলাম নারীদের শিক্ষার অধিকার দিয়েছে, কিন্তু এই যুগে তা বাস্তব ছিল না। কেবল ধনী বা সম্ভ্রান্ত পরিবারে কদাচিৎ কিছু নারী ধর্মীয় শিক্ষা পেতেন (যেমন কুরআন তিলাওয়াত)। মসজিদে অংশগ্রহণ বা নেতৃত্বের কোনো সুযোগ ছিল না।

 শিক্ষাব্যবস্থা (পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্য)

সাধারণ চিত্র: শিক্ষাব্যবস্থা মূলত মাদ্রাসা-কেন্দ্রিক ছিল, আর তা ধর্মীয় জ্ঞানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অধিকাংশ মানুষ নিরক্ষর ছিল। যারা শিক্ষা পেত, তারা মূলত: কুরআন মুখস্থ ফিকহ ও হাদীস কিছু আরবি সাহিত্য ও ভাষাবিদ্যা ।

নারীদের জন্য শিক্ষা: নারীদের জন্য আলাদা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা ছিল না। কিছু সম্ভ্রান্ত পরিবারে মেয়েরা ঘরে বসে কুরআন ও বুনিয়াদি ধর্মীয় শিক্ষা পেতেন। নারী আলেমা বা শিক্ষিকা ছিলেন খুবই বিরল। 

নারী শিক্ষার প্রতিবন্ধকতা:

সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি: “নারীদের লেখাপড়া শিখতে হবে না” — এই ভুল মানসিকতা প্রচলিত ছিল।

অর্থনৈতিক দুর্বলতা: দরিদ্র পরিবারগুলো ছেলে সন্তানদেরই অগ্রাধিকার দিত।

ধর্মীয় অপব্যাখ্যা: অনেকে ধর্মকে ভুলভাবে ব্যবহার করে নারীদের শিক্ষার সুযোগ রুদ্ধ করত।

ব্যতিক্রম:

ইসলামের ইতিহাসে যেমন আইশা (রা.), উম্মে সালামা (রা.)-এর মতো আলেমা ছিলেন, তেমনটা এই যুগে দেখা যেত না।

তবে কিছু নগর এলাকায়, বিশেষত মক্কা ও মদিনা, সীমিতসংখ্যক নারী শিক্ষা লাভ করতেন, যা ছিল মূলত কুরআন পাঠ ও হিজাব বিষয়ক জ্ঞান।

উপসংহার:

 দিক                         নারীদের অবস্থা    

পারিবারিক         পুরুষ-নিয়ন্ত্রিত, অধিকাংশ গৃহবন্দী জীবন ।    

শিক্ষা সীমিত,             কেবল ধর্মীয় শিক্ষায় সীমাবদ্ধ ।    

সমাজে ভূমিকা         অনুপস্থিত বা গৌণ ।    

ধর্মীয় অবস্থান         ইসলামের অধিকার ছিল, সমাজে প্রয়োগ ছিল না ।  

এই প্রেক্ষাপটেই উঠে আসেন: মুহাম্মাদ ইবনু আবদুল ওহ্‌হাব (রহ.), যিনি ইসলামি সংস্কার ও তাওহিদ প্রতিষ্ঠার জন্য দাওয়াত শুরু করেন এবং সৌদ বংশ তাঁর দাওয়াতকে রাজনৈতিকভাবে সমর্থন দিয়ে এক নতুন রাষ্ট্রীয় শক্তি গড়ে তোলে।এই পরিস্থিতিতেই ১৮শ শতকে ইসলামি সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়, যার মাধ্যমে ধর্মকে কুসংস্কারমুক্ত করে সমাজে শুদ্ধতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলে। তবে নারীদের শিক্ষা ও সামাজিক অংশগ্রহণ তখনো বহুলাংশে অবহেলিতই থেকে যায়।


No comments

Powered by Blogger.