Header Ads

আমাদের মানব দেহের ভিতরে পাঁচটি রুহু আছে তার বিবরণ দেয়া হলোঃ

 

আল্লাহ তাআলা মানুষকে কেবল দেহ দিয়ে সৃষ্টি করেননি, বরং তাকে রূহের মাধ্যমে একটি মহান আত্মিক বাস্তবতায় উন্নীত করেছেন। সূফি তত্ত্ব ইসলামী আধ্যাত্মিক দর্শনে মানুষের ভেতরে পাঁচটি আত্মিক স্তর বা রূহ রয়েছে, যেগুলো আত্মার উৎকর্ষ সাধন আল্লাহর নৈকট্য লাভের ধাপে ধাপে সহায়ক। নিচে এই পাঁচটি রূহের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হলো:

রূহু জামাদাতের সংজ্ঞা: "রূহু জামাদাত" শব্দটি দুটি অংশে গঠিত:

·         "রূহু" অর্থ: আত্মা বা জীবনীশক্তি

·         "জামাদাত" অর্থ: নির্জীব বস্তু বা অচেতন বস্তু (যেমন: পাথর, ধাতু, মাটি ইত্যাদি)

অর্থাৎ, রূহু জামাদাত হলো সেই আত্মিক বা আভ্যন্তরীণ শক্তি যা নির্জীব বস্তুগুলোর মাঝেও এক ধরণের অস্তিত্ব কর্মক্ষমতা সৃষ্টি করে। এটি আল্লাহর সৃষ্ট রহস্যের একটি অংশ

অবস্থান প্রকৃতি:

·         অবস্থান: রূহু জামাদাতের অবস্থান সরাসরি স্থূল বস্তুজগতে। তবে এর প্রকৃতি দৃষ্টিগোচর নয়, বরং এটি আল্লাহর আদেশ ইচ্ছার মাধ্যমেই সক্রিয় হয়

·         প্রকৃতি: এটি দৃশ্যতনিষ্ক্রিয়হলেও আসলে এটি সক্রিয় নিয়ন্ত্রিত। কুরআনে বহু স্থানে দেখা যায়, পাথর, আকাশ, পাহাড়, গাছএমনকি মৃত বস্তুও আল্লাহর নির্দেশে সাড়া দেয়

রূহু নাবাতাত কী?

"রূহু নাবাতাত" হলো এমন একটি রূহ বা আত্মিক শক্তি, যার মাধ্যমে দেহে উচ্চারণহীন জীবন, জৈব বৃদ্ধি, খাদ্য গ্রহণ রূপান্তর, বংশবৃদ্ধির প্রবণতা প্রাকৃতিক নিয়ন্ত্রিত বিকাশ ঘটে

🔹 নাবাতাত শব্দটি এসেছে "নাবাত" থেকে, যার অর্থ হলো উদ্ভিদ
🔹 এই স্তরের রূহ আমাদের শারীরিক জীবনের ভেতরের বৃদ্ধিমূলক জৈব প্রক্রিয়া চালিয়ে যায়যেমন: দেহের বৃদ্ধি, রক্তসঞ্চালন, কোষ বিভাজন ইত্যাদি

অবস্থান:

রূহু নাবাতাত মানবদেহের শরীরবৃত্তীয় জৈবিক স্তরে অবস্থান করে

·         এটি মানব শরীরের ভেতরে বৃদ্ধিশীলতা প্রজনন ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে

·         মূলত, এটি হৃদয় যকৃতের কাছাকাছি জৈবিক শক্তির ঘনীভূত রূপ হিসেবে কাজ করে

প্রকৃতি বৈশিষ্ট্য:

. জীবনের মৌলিক লক্ষণ প্রকাশ করেজন্ম, বৃদ্ধি, খাদ্য হজম, রক্ত তৈরি ইত্যাদি
. এই রূহ উদ্ভিদের মতো আচরণ করে, অর্থাৎ সে চিন্তা করতে পারে না, কিন্তু স্বয়ংক্রিয়ভাবে জীবনের কার্যকলাপ পরিচালনা করে
. আত্মচেতনা নেই, তবে প্রাকৃতিক নিয়মে সাড়া দেয়
. মৃত্যুর পরে প্রথম যে রূহ দেহ ত্যাগ করে তা হলো রূহু নাবাতাত

রূহু হাইওয়ানী কী?

রূহু হাইওয়ানী (روح حیوانی) হলো সেই আত্মিক শক্তি যা মানুষকে প্রাণীর মতো চলাফেরা, অনুভব, ভয়, লোভ, রাগ, খাদ্যবৃত্তি, বাসনা, এবং আত্মরক্ষার প্রবৃত্তি দেয়। এটি মনুষ্য জীবনের তৃতীয় স্তরের রূহ বা আত্মা

🔹 এটি সাধারণত পশুদের মধ্যেও থাকেতাই একে পশু আত্মা বলা হয়
🔹 কিন্তু মানুষের বেলায় এটি আরও জটিল, কারণ মানুষের মধ্যে এর ওপর মন, বিবেক এবং আত্মিক সচেতনতা আরোপিত হয়

অবস্থান: রূহু হাইওয়ানীর কেন্দ্র হলো হৃদয় (qalb) মস্তিষ্কের সংযোগস্থল

·         এই আত্মা অনুভূতি, প্রতিক্রিয়া, হঠাৎ সিদ্ধান্ত, চেতনাবোধ ইন্দ্রিয়শক্তির উৎস

·         এটি রক্তের মাধ্যমে সারা দেহে কার্যকর থাকে

প্রকৃতি বৈশিষ্ট্য:

. চেতনা সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা: প্রাণী যেমন শব্দে, গন্ধে, স্পর্শে সাড়া দেয়, রূহু হাইওয়ানীর মাধ্যমে মানুষও তা করতে পারে
. ইচ্ছা, ভয়, রাগ, বাসনা ইত্যাদি সব আবেগ প্রতিক্রিয়া এই আত্মার মাধ্যমে প্রকাশ পায়
3. চলাফেরা, খাওয়া, ঘুম, যৌনতা ইত্যাদি শারীরিক প্রয়োজনে এটিই প্রধান চালিকা শক্তি
. এই স্তর পরিশুদ্ধ না হলে মানুষ তার নিচু প্রবৃত্তির অধীন হয়ে পড়ে এবং পশুসুলভ আচরণ করে

রুহু কুদসী কী?

রুহুল কুদসী অর্থ: পবিত্র আত্মা বা আল্লাহপ্রদত্ত বিশুদ্ধ আত্মাএই আত্মা মূলত আল্লাহর পক্ষ থেকে সরাসরি নাযিল হওয়া এমন এক নূরানী শক্তি যা নবী, রাসূল এবং কামেল ওলীদের হৃদয়ে স্থাপিত হয়। এই রূহ মানব আত্মার সবচেয়ে উচ্চতর স্তর, যা আল্লাহর নৈকট্য, জ্ঞানের আলো, সত্যভাষণ আলোকিত অন্তরের নিদর্শন বহন করে

অবস্থান: রুহুল কুদসী সাধারণত অন্তরের গভীরে, “সিরবাখাফিনামক আধ্যাত্মিক স্তরে অবস্থান করেএই আত্মা শুধু সেই সকল মানুষকে দান করা হয়, যারা আত্মার সমস্ত পূর্ববর্তী স্তর:

·         রুহু জামাদাত

·         রুহু নাবাতাত

·         রুহু হাইওয়ানী

·         রুহু ইনসানী
অতিক্রম করে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ শুদ্ধতার অবস্থানে পৌঁছেছে

প্রকৃতি বৈশিষ্ট্য:

বৈশিষ্ট্য

বিবরণ

 আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল

এটি কোনো পার্থিব বা দেহগত শক্তি নয়বরং আল্লাহরআমরবা আদেশ থেকে সৃষ্ট

 পবিত্রতা শুদ্ধতা

কোনো পাপ, রিপু বা লালসা এই আত্মায় স্থান পায় না

 ওহীর ধারণক্ষমতা

নবীগণ এই রূহের মাধ্যমে ওহী গ্রহণ করেন। ওলিরা এর মাধ্যমে ইলহাম পান

 আত্মদর্শন হাকিকতের প্রকাশ

এর মাধ্যমে অন্তরে আলোর উদ্ভাস ঘটে এবং সত্য অনুধাবন স্পষ্ট হয়

 নফসের পূর্ণ দমন

এই আত্মার অধিকারী ব্যক্তি তার রাগ, লোভ, হিংসা, অহংকার জয় করতে সক্ষম হন

রুহু ইনছানিয়াত কী?

রুহু ইনছানিয়াত হলো সেই আত্মিক ক্ষমতা, যা আল্লাহ তাআলা সরাসরি নিজ হস্তে সৃষ্টি করে মানবদেহে ফুঁকে দেন

আল্লাহ বলেন: অতঃপর আমি তার মধ্যে আমার রূহ ফুঁকে দিলাম। (সূরা হিজর: ২৯)

এই রূহ অন্য স্তরের রূহের চেয়ে পৃথক, কারণ এটি নূরানী এলাহি উৎস থেকে আগত এবং এটি জ্ঞান, বিবেক, মুক্ত ইচ্ছাশক্তি, সৃজনশীলতা ঈমান গ্রহণের সক্ষমতা বহন করে

অবস্থান:

রুহু ইনছানিয়াত অন্তরের গভীরতম স্তরে অবস্থান করেযা "লতিফা ক্বালব", "সির" "রূহ" এর আধ্যাত্মিক স্তরে প্রবেশ করতে সক্ষম। এটি বোধগম্যতা, হৃদয়বৃত্তি চেতনাগত উচ্চতার কেন্দ্রে বিরাজ করে

প্রকৃতি বৈশিষ্ট্য:

বৈশিষ্ট্য

বিবরণ

 এলাহী উৎস

এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত এবং নূর দ্বারা সৃষ্ট

জ্ঞান বিবেকের আধার

ন্যায়-অন্যায়, হালাল-হারাম বোঝার ক্ষমতা এই রূহ থেকে আসে

নৈতিক আত্মিক দায়িত্ববোধ

খলিফারূপে মানব জাতির দায়িত্ব রুহু ইনছানিয়াতের মাধ্যমেই প্রকাশ পায়

পরীক্ষার উদ্দেশ্যে দান

এই রূহকে পবিত্র রাখার চেষ্টা নফসের সঙ্গে সংগ্রামই মানুষের মূল ইবাদত

আল্লাহর প্রেমে উন্নীত হওয়া

এই আত্মা ইবাদত, যিকর আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্যে পৌঁছতে সক্ষম

 অবস্থান:

রুহু ইনছানিয়াত অন্তরের গভীরতম স্তরে অবস্থান করেযা "লতিফা ক্বালব", "সির" "রূহ" এর আধ্যাত্মিক স্তরে প্রবেশ করতে সক্ষম। এই রূহকে নিয়ন্ত্রণ করে যখন মানুষ রূহু ইনসানী রূহু রুহানীর স্তরে উন্নীত হয়, তখনই সে প্রকৃতভাবেআশরাফুল মাখলুকাত’ (সৃষ্টির সেরা) হয়ে ওঠেরুহু ইনছানিয়াত মানব আত্মার আসল পরিচয়। এটি এমন একটি রূহ, যা মানুষকে পশু জড় পদার্থ থেকে আলাদা করে তোলে। এটি আল্লাহর কাছ থেকে আগত নূরানী দান, যার সঠিক বিকাশ ঘটলে মানুষ আত্মিকভাবে কামাল বা পূর্ণতার পথে এগিয়ে যেতে পারে। কুরআন-সুন্নাহ তাসাউফ চর্চার মাধ্যমে এই আত্মাকে জাগ্রত করা যায় এবং আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছা সম্ভব হয়



No comments

Powered by Blogger.