ফেৎনা সৃষ্টিকারী, পরিকল্পিতভাবে হযরত আলী ইবনে আবু তালিব (রাঃ) কে হত্যাকারীরা কি মুসলিম না খারিজি?
হযরত আলী ইবনে আবু তালিব (রাঃ) ছিলেন চতুর্থ খলিফা, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চাচাতো ভাই ও জামাতা (হযরত ফাতিমা (রা.)-এর স্বামী) এবং ইসলামের ইতিহাসে এক অগ্রগণ্য সাহাবি। তিনি ইসলামী বিচারব্যবস্থা, জ্ঞানের বিশাল ভাণ্ডার ছিলেন ন্যায়বিচার ও ধর্মীয় নিষ্ঠার এবং সাহসিকতার এক উজ্জ্বল প্রতীক।
কখন এবং কীভাবে হযরত আলী (রাঃ) শহীদ হন?
হিজরি ৪০ সালের রমজান মাসের ১৭ তারিখে (৬৬১ খ্রিস্টাব্দ), কুফা শহরের মসজিদে ফজরের নামাজের সময়, এক খারিজি মতবাদে বিশ্বাসী ব্যক্তি, ইবনে মুলজিম, তাঁকে বিষ মাখানো তরবারি দিয়ে আঘাত করেন। এই মারাত্মক আঘাতে তিনি দু’দিন পরে ইন্তেকাল করেন।
কে হত্যা করে?
আবদুর রহমান ইবনে মুলজিম নামক এক ব্যক্তি, যিনি নিজেকে ধর্মীয়ভাবে কঠোর ও খারিজিদের অনুসারী দাবি করতেন, হযরত আলী (রাঃ)-কে হত্যা করেন। তার বিশ্বাস ছিল যে, “তিনজন নেতার মৃত্যু ইসলামের কল্যাণ বয়ে আনবে”—হযরত আলী (রাঃ), মুয়াবিয়া (রাঃ), ও আমর ইবনে আস। সে এই ধারণাকে ধর্মীয় কর্তব্য হিসেবে গ্রহণ করে হত্যাকাণ্ড ঘটায়।
কিসের জন্য হত্যা করা হয়েছিল?
এই হত্যার পেছনে মূল
কারণ ছিল সিয়াসত (রাজনীতি) ও বিভ্রান্ত ধর্মীয় মতবাদ। খারিজিরা
মনে করত যে, হযরত
আলী (রাঃ) মুআবিয়ার সঙ্গে
সালিশিতে (তাহকিম) রাজি হয়ে “মানুষকে
আল্লাহর বদলে বিচারক বানিয়ে
ফেলেছেন”—যা তাদের মতে
ছিল কুফরি। এই ভুল
ব্যাখ্যার ফলে তারা তাঁর
বিরুদ্ধে দাঁড়ায়।
খারেজিরা হজরত আলী (রা)-কে কাফের ঘোষণা দিয়ে হত্যা করেছিলো। আলী (রা)-এর বিরুদ্ধে যেসব খারেজি বিদ্রোহ করেছিলেন, তাদের প্রায় সবাই ছিলো কোর’আনে হাফিজ। খারিজিদের মুখে ছিলো লম্বা দাঁড়ি, এবং কপালে ছিলো নামাজের দাগ। খারিজিদের নেতা আবদুল্লাহ ইবনে ওহাব রাসিবী এতো বেশি ইবাদাত ও সিজদা করতো যে, তার সিজদার স্থানসমূহের চামড়া শুকিয়ে গিয়েছিলো।
খারিজিদের মধ্যে যারা আলী (রা)-কে হত্যা করা পরিকল্পনা করেছিলো, তারা আলী (রা)-কে হত্যা করার জন্যে রমাজান মাস আসার অপেক্ষা করেছিলো। তাদের ধারণা ছিলো, রমাজান মাসে একটা কাফির হত্যা করতে পারলে বেশি সাওয়াব পাওয়া যাবে। কিতাম বিনতে শাজানাহ নামক যে সুন্দরী নারী বলেছেন, “আমাকে বিয়ে করতে হলে আলীকে হত্যা করতে হবে”, সে নারী দিনরাত সারাক্ষণ মসজিদে ইবাদাত-বন্দেগীতে নিমগ্ন থাকতেন।
আলী (রা)-এর হত্যাকারী ইবনে মুলজিম তার সহযোগী শাবীবকে বলেন – “তুমি কি দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ লাভ করতে চাও? যদি চাও, তাহলে আলীকে হত্যা করতে হবে।
ইবনে মুলজিম যখন আলী (রা)-এর মাথায় তলোয়ার দিয়ে আঘাত করছিলো, তখনো সে জোরে জোরে কোর’আনের আয়াত তেলোয়াত করেছিলো। আলী (রা)-কে হত্যা করার সময়ে সে বলছিলো – “আল্লাহ ছাড়া কারোও হুকুম করার অধিকার নেই। হে আলী! তোমারও নেই এবং তোমার অনুসারীদেরও নেই”। হত্যাকারী তখন সূরা বাকারার ২০৭ নং আয়াত পড়ছিলো – “মানুষের মধ্যে এমন লোকও আছে, যে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভার্থে আত্ম-বিক্রয় করে থাকে। আল্লাহ তাঁর বান্দাগণের প্রতি অত্যন্ত দয়ার্দ্র”।
কুরআন ও হাদীসের দৃষ্টিভঙ্গি:
· কুরআন স্পষ্টভাবে জানায়, নিরপরাধ কাউকে হত্যা করা সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করার শামিল (সূরা আল-মায়েদা ৫:৩২)।
· রাসূলুল্লাহ (সা.) পূর্বেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন: "হে আলী, তুমি সত্যের সঙ্গে থাকবে এবং একদল পথভ্রষ্ট লোক তোমার বিরুদ্ধে লড়াই করবে।"
উপসংহার:
খারিজিদের মূল
কাজ
হলো,
তারা
নিজেদেরকে সবচেয়ে ভালো
মুসলিম
দাবী
করে,
এবং
অন্য
সবাইকে
কাফির
বা
ভ্রান্ত ঘোষণা
করে। এমন
চরিত্রের মানুষ
এখনো
আমাদের
সমাজে
বিদ্যমান। খারিজিদের বিরুদ্ধে নাহরাওয়ান যুদ্ধ
শেষ
করে
ফেরার
পথে
সৈন্যরা আলী
(রা)-এর কাছে এসে
বলতে
লাগলেন,
“হে
আমীরুল
মুমিনীন! সেই
আল্লাহর প্রশংসা যিনি
খারিজীদের মূলোৎপাটন করে
দিয়েছেন”।
আলী
(রা)
তখন
তাদেরকে বললেন,
“কখনো
না,
আল্লাহর কসম!
তারা
অবশ্যই
পুরুষ
লোকের
পৃষ্ঠদেশে এবং
মেয়ে
লোকের
গর্ভে
বিদ্যমান আছে। যখন
তারা
তাদের
বাবা-মা থেকে বেরিয়ে আসবে,
তখন
তাদের
সাথে
যার-ই সাক্ষাৎ হবে,
তার
উপর
প্রাধান্য বিস্তারের জন্যে
তারা
ফিতনা
সৃষ্টি
করতে
থাকবে।” আলী
(রা)-এর এই ভবিষ্যৎ বাণী
আমরা
এখনো
দেখতে
পাই৷
.jpg)
No comments