সুন্নি হাদিসের আলোকে ১৮ই জিলহজ্ব গাদীরে খুমের ঐতিহাসিক ঘোষণা
হযরত রাসুল (সাঃ) যে মওলা আলী (আঃ) কে হারুন নবীর সাথে তুলনা করেছেন তার প্রমাণ সা’দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রাঃ) হতে বর্নিত আছে যে, রসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, "হে আলী, তুমি আমার নিকট ঐ স্থানে আছো যেখানে মুসার নিকট হারুন ছিল। কিন্তু আমি ব্যতীত নবী নেই আমিই শেষ নবী"' যদিও আরও অনেক প্রমাণ রয়েছে তবে আমি মনে করি জ্ঞানীদের জন্য এই দুটোই যথেষ্ট।
এই
ঘটনাটি
ঘটেছিল
১৮ই জিলহজ্ব
তারিখে,
যা
ইসলামী
ইতিহাসে একটি
বিশেষ
দিন
হিসেবে
পরিচিত।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ঘোষণা
রাসূলুল্লাহ (সা.)
সাহাবীদের একত্র
করে
একটি
খুতবা
দেন।
এ
সময়
তিনি
জিজ্ঞেস করেন:
"ألست أولى بالمؤمنين من أنفسهم؟" অর্থ: "আমি কি তোমাদের
নিজেদের চেয়েও বেশি অধিকার রাখি না?"
সাহাবীগণ বললেন:
"হ্যাঁ, অবশ্যই।"
দীর্ঘ ২৩ বছর ইসলাম প্রচারের পরে, এত দুঃখকষ্ট সহ্য, যুদ্ধযন্ত্রনা সহ্য করার পরেও এমন কি জিনিস বাদ রয়ে গেল? যার জন্য রেসালাতই পুর্ন হবে না বলে আল্লাহ ঘোষনা করলেন? এই আয়াত নাজেল হওয়ার সাথে সাথে রসুল পাক(স:) সেখানেই থামিয়া গেলেন এবং বাহন থেকে নেমে গেলেন। সবাইকে একত্র করলেন। সেখানকার “আকাশিয়া” নামক কাটা গাছগুলো পরিষ্কার করে ফেলা হলো। জোহরের নামাজ শেষে উটের গদিগুলো দিয়ে বেদী বা মঞ্চ করা হলো। যেহেতু দিনটি ছিল প্রচন্ড গরমের, সেহেতু বাবলা গাছের সাথে চাদর টানিয়ে রসুলুল্লাহ (সাঃ) এর জন্য ছায়ার ব্যবস্থা করা হলো। তারপর তিনি আল্লাহর প্রশংসা ও পবিত্রতা বর্ননা করলেন। আর বললেন, " নিশ্চয় আমি তোমাদের মধ্যে দুটি জিনিস আমানত রেখে যাচ্ছি, যদি এ দু’টিকে আঁকড়ে ধর তাহলে কখনো গোমড়াহ হবেনা। তার একটি হলো আল্লাহর কেতাব,যা আসমান হতে জমিন পর্যন্ত প্রসারিত রজ্জু এবং অন্যটি হল আমার আহলে বায়াত। এ দুটি কখনো পরষ্পর বিচ্ছিন্ন হবে না এবং এ অবস্থায়ই হাউজে কাউসার আমার সাথে মিলিত হবে। তাই লক্ষ্য রেখ তাদের সাথে তোমরা কিরুপ আচরন করবে” (তিরমিযী)
অন্য বর্ননায় উক্ত হাদিসের শেষে এ কথাটি রয়েছে যে, "আমি আমার আহলে বাইয়েত সম্পর্কে তোমাদেরকে আল্লাহর কথা স্মরণ করে দিচ্ছি”। এ কথাটি রাসুল (সাঃ) তিনবার করে বলেছিলেন। এ হাদিসটি তিরমিযী সুত্রে মেশকাতের ৫৮৯২ এবং ৫৮৯৩ নং হাদিসে সহী সুত্রে বর্নিত আছে হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ আনসারী (রাঃ) হতে এবং মুত্তাকী হিন্দী তাঁর “কানজুল উম্মাল” গ্রন্থে বর্ননা করেছেন।
এরপর
তিনি
হযরত
আলী
(রাঃ)-এর হাত উঁচু
করে
ঘোষণা
করেন:
"من كنت مولاه، فعلي مولاه. اللهم وال من والاه، وعاد من عاداه" অর্থ: "যার আমি মাওলা, আলীও তার মাওলা।
হে আল্লাহ! যিনি তাকে ভালোবাসেন, আপনিও তাঁকে ভালোবাসুন; আর যিনি তার শত্রু, আপনি তারও শত্রু হন।"
সুন্নি হাদিসগ্রন্থে গাদীরে খুম
হাদিসে বর্নিত আছে,হযরত বারা ইবনে আযেব ও যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ) হতে। এ হাদীসটির শেষে বর্ননাকারী বলেন,"এরপর যখন মওলা আলী (আঃ) এর সাথে লানতুল্লাহ ওমর এর সাক্ষাত হয়, তখন তিনি আলী (আঃ)কে বললেন,'“ধন্যবাদ হে আবু তালিব পুত্র! তুমি সর্বময় প্রতিটি নারী,পুরুষের প্রশংসিত হয়ে রইল"'।“রেসালাত” মানে প্রতিনিধিত্ব। হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহপাকের প্রতিনিধি এবং তাঁর বিদায়ের পুর্বে মওলা আলী (আঃ)কে তাঁর প্রতিনিধি করে যাবেন এই ছিল আল্লাহ পাকের নির্দেশ। “'আলী (আঃ)কে আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করার উপযুক্ত করে গড়ে তোলা হয়েছে। প্রতিনিধি হিসাবে আলী (আঃ)কে জনমন্ডলীতে রসুল (সাঃ) এর পরে তাঁর স্থলাবিষিক্ত করার নির্দেশক সংবাদ নাজিল করা হয়েছিল এর কিছুকাল আগেই। তবে তিনি তা পরে সবার সামনে উপযুক্ত পরিবেশে প্রকাশ করলেন কেননা তিনি (স:) ভাল করেই জানতেন মওলা আলী (আঃ) এর এ মাওলাইয়াত বা প্রতিনিধিত্ব হিংসার বশবর্তী হয়ে লোকেরা অস্বীকার করবে এবং আলী (আঃ) এর বংশধরের বিরুদ্ধে গভীর চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র চলতে থাকবে যার ফলে ধর্ম বিনষ্ট হয়ে যাবে। তাই তিনি(স:) গাদীরে খুম নামক জায়গায় এসে জনসম্মুখে ইহা প্রকাশ করলেন।ইহার গুরুত্ব সবাইকে বোঝাবার জন্যই তিনি মক্কা থেকে ফেরার পথে “এহরাম বস্ত্র” পরিহিত অবস্থায় রওনা দিয়েছিলেন।
“গাদিরে খুমের” হাদিসটি “প্রতিনিধিত্ব” অর্থে প্রযোজ্য এবং এর পরেই উপস্থিত জনগন প্রতিনিধিত্ব স্বীকার করে বায়াত গ্রহন করেন। এ হাদিসটি “তাবরানী” ইবনে জরীর, হাকীম, তিরমিযী সবাই জায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ) হতে ঠিক এভাবেই হাদিসটির বিশুদ্ধতার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। এমনকি ইবনে হাজর তাঁর “সাওয়ায়েক” গ্রন্থের পঞ্চম পর্বের প্রথম অধ্যায়ের ২৫ পৃষ্ঠায় বর্ননা করে সহীহ হবার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
গাদীরে
খুমের
এই
ঘোষণা
শুধুমাত্র শিয়া উৎসে নয়,
বরং
সুন্নি হাদিস গ্রন্থসমূহেও বিশুদ্ধ (সহীহ) সূত্রে বর্ণিত
হয়েছে। নিচে
কিছু
উল্লেখযোগ্য উৎস:
- সহীহ
তিরমিযি (হাদিস: ৩৭১৩)
- মুসনাদ
আহমাদ ইবনে হাম্বল (হাদিস: ২৩৪৮)
- নাসাঈ
এর ‘আল-খাসায়েসুল আলাওয়িয়া’
- ইবনু
মাজাহ
- ইবনু
হিব্বান, হাকিম, জালালুদ্দিন সুযুতি প্রমুখ মুহাদ্দিসগণও হাদিসটির বিশুদ্ধতা স্বীকার করেছেন।
ইসলামী ইতিহাসবিদ ও মুহাদ্দিসদের মতামত
- ইমাম
নওয়াবী: এই হাদিসকে সহীহ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
- ইমাম
তিরমিযি: হাদিসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন।
- ইমাম
ইবনে হাজার আসকালানী: ফাতহুল বারিতে ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
- ইমাম
জালালুদ্দিন সুযুতি: তাঁর বিভিন্ন কিতাবে এ
হাদিসকে সম্মানজনক অবস্থানে রেখেছেন।
গাদীরে খুমের বার্তা
এই
ঘোষণা
ছিল
একটি
আধ্যাত্মিক ও
নেতৃত্বমূলক মূল্যায়ন। যদিও
সুন্নি
ব্যাখ্যায় এটি
খিলাফতের সরাসরি
ঘোষণা
নয়,
তথাপি
এটি
হযরত
আলী
(রাঃ)-এর প্রতি রাসূল
(সা.)-এর ভালোবাসা, নেতৃত্বের যোগ্যতা এবং
মুসলিম
উম্মাহর জন্য
তাঁর
গুরুত্ব প্রতিফলিত করে।
এ খবরটি তখন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল। হারিস ইবনে নোমান ফিহরি তা শুনে উটে আরোহন করে রসুলুল্লাহ (সাঃ) এর নিকট এসে উটটি বেধে রাসুল (সাঃ) কে লক্ষ্য করে বললেন, " হে মোহাম্মদ! তুমি একদিন নির্দেশ দিয়েছিলে এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস করতে এবং তোমাকে তাঁর নবী হিসাবে স্বীকার করতে, আমরা তা করেছি। পরবর্তীতে বললে, দিনে পাঁচবার নামাজ পড়তে তাও করলাম, যাকাত দাও, তাও দিলাম। পরে রমজান মাসে রোজার নির্দেশ দিলে তাও শুনলাম এবং হজ্জ্ব করার নির্দেশও পালন করলাম। এতো কিছুতেও তোমার সন্তুষ্টি হলো না, অবশেষে তোমার চাচাত ভাইয়ের হাত ধরে তাকে আমাদের উপর শ্রেষ্ঠ বলে ঘোষনা দিলে, “আমি যার মাওলা, আলীও তার মাওলা" এ কথাটি কি তোমার নিজের পক্ষ থেকে নাকি আল্লাহর পক্ষ থেকে? নবী (সাঃ) বললেন, " যিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নাই সেই আল্লাহর শপথ করে বলছি, ইহা আল্লাহর পক্ষ হতে" হারিস তার বাহনের দিকে ফিরে যেতে যেতে বললো, "'হে আল্লাহ ! মোহাম্মদ যা বলেছে তা যদি সত্য হয় তবে আমাদের উপর আসমান হতে পাথর বর্ষণ করুন অথবা আযাব প্রেরন করুন। তখনো সে বাহনের নিকট পৌছায়নি, আকাশ থেকে একটি ছোট পাথর তার মাথায় এসে পড়ল এবং পায়খানার রাস্তা দিয়ে বের হয়ে গেল এবং সেখানেই সে মারা গেল" এ ঘটনাটি মাওলানা ফারমান আলী স্বীয় তফসীরে সুরা মা’আরিজের ১/২/৩ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন। এবং আরো বহু কিতাবে এর ঘটনাটি বিশ্বস্থ সুত্রে বর্নিত আছে। আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের একদল হাদিসবেত্তা এ হাদিসটি বীনা বাক্যে গ্রহন করেছেন।
"রসুল (সাঃ) তাঁর(স:) চাচাত ভাই আলী (আঃ)কে যখন ইয়ামেনে প্রেরণ করেন তখন হযরত আলী (আঃ) এর বিরুদ্ধে একদল নিন্দুকেরা রাসুল (সাঃ) এর কাছে অভিযোগ করেছিল। তাই নবী (সাঃ), আলী (আঃ) সন্তুষ্টি করতে গাদিরে খুম নামক স্থানে এ হাদিসটি প্রকাশ করেন। বাস্তবে আজকেও আমার সামনে একজন এই কথা বলে বসলেন " আরে ভাই আলী তার চাচাতো ভাই তাই ...আমরাও যেমন আমাদের ছেলে মেয়ে ভাই বোনকে খুশি করতে বলে থাকি অনেক কিছু...সেইরকম তিনিও করেছেন। কিতু গর্দভের দল এটূকু বুঝেনা, সামান্য খুশি করাবার জন্যে আল্লাহ তায়ালা একটা আয়াত নাজিল করবেন না, নবী (সাঃ) ও এত বড় অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা নিবেন না। আসলে কান্ডজ্ঞানহীন সাইনবোর্ডধারী খারেজী তাদের স্বার্থাম্বেষী, পরশ্রীকাতর মুনাফিকির দ্বারা সত্য বিষয়টিকে ধামাচাপা দিয়ে যাচ্ছে যুগে যুগে।
বায়াত সমাপ্ত শেষ হলে তখন কোরানের সর্বশেষ আয়াত নাজিল হয়, “ আল ইয়াওমা ইয়া ইসাল্লাযীনা...ইসলামা দ্বীনা,সুরা মায়েদা ৩। অর্থাৎ “আজ কাফের গন তোমাদের দ্বীন হতে নিরাশ হয়ে গিয়েছে। অতএব তাদেরকে আর ভয় করিও না, ভয় কর আমাকে। আজ তোমাদের দ্বীন পরিপুর্ন করে দিলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামত পরিপুর্নতা দান করলাম এবং তোমাদের দ্বীন ইসলামের উপর আমি রাজি হলাম”। এই আয়াতটি কোরানে নাজিল কৃত সর্বশেষ আয়াত। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) হযরত আলী (আঃ),কে তাঁর(স:) প্রতিনীধি বা স্থলাভিষিক্ত করে ইসলামের পূর্নতা ঘোষনা করলেন। আধ্যাত্মিক জ্ঞানীগণ বা ইলমে নব্বীর ওয়ারিশ যারা তারা এ কথা স্পষ্ট জানেন এবং দেখেন যে মাওলা আলী (আঃ) যে স্থানে অধিষ্টিত আছেন ইসলাম বা মানব ধর্ম ইনসানিয়াত সে স্থানে স্থিত আছে।
উপসংহার
No comments