নিজেকে চিনতে বা আত্মদর্শন করতে কিছু বিষয় জানা প্রয়োজন
মানুষের জীবনে
সবচেয়ে
গভীর
ও
তাৎপর্যপূর্ণ যাত্রা
হলো
নিজেকে
জানা—অর্থাৎ আত্মদর্শন। অনেকেই জীবনের
বাইরের
জগতকে
বোঝার
চেষ্টা
করেন,
কিন্তু
নিজেদের মনোজগৎ,
চিন্তা-পদ্ধতি ও অন্তর্দৃষ্টি অবজ্ঞা
করেন। অথচ,
প্রকৃত
শান্তি,
আত্মবিশ্বাস এবং
জীবনদর্শন গড়ে
ওঠে
তখনই,
যখন
আমরা
নিজেদের সত্যিকারের রূপটি
চিনতে
পারি।
সুফিবাদে আত্মদর্শন (self-realization) শুধুমাত্র ব্যক্তিগত উপলব্ধি নয়,
বরং
এটি
একটি
আধ্যাত্মিক সফর
— এক
যাত্রা
যা
শুরু
হয়
নিজের
অন্তরের দরজায়
কড়া
নাড়ার
মধ্য
দিয়ে,
এবং
শেষ
হয়
স্রষ্টার সান্নিধ্যে পৌঁছানোর তৃষ্ণায়। “যে নিজেকে চেনে, সে তার প্রভুকে চেনে” — এই হাদীস
সুফিদের আত্মদর্শনের মূলমন্ত্র।
‘আত্ম' শব্দের অর্থ ‘আমি'আত্ম থেকে আত্মা অর্থাৎ ‘আমিত্ব'আমি কে? এবং আমিত্ব কি? এর অর্থ ও তাৎপর্য খুঁজেছে হাজার হাজার বছর ধরে সাধু, সন্নাসী, দরবেশ, নবী,রসূল এবং দার্শনিকগণ।
সুফি ও দার্শনিকদের
মতামত
পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ দার্শনিক সক্রেটিস বলেছেন, নিজেকে চেনো। পৃথিবীর সকল ধর্মগ্রন্থেও মূল সুর একটিই ‘নিজেকে চেনো'। নিজেকে চেনা মানে নিজের ‘আমিত্ব'কে চেনা। ‘আমিত্ব' শব্দের আর একটি অর্থ হলো ‘অহং'। ‘অহং' শব্দ থেকে অহঙ্কার শব্দটি সৃষ্টি হয়েছে। অর্থাৎ ‘নিজ' সম্পর্কে অত্যধিক আশাবাদী এবং বিশ্বাসী এবং আত্মগরিমা এবং আত্মম্ভরিতা। এখন ‘আমিত্ব'কে চিনতে হলে আত্মতত্ত্ব, আর্ত্মদর্শন সম্পর্কে বিষদ জ্ঞান অর্জন করতে হবে, যা দুঃসাধ্য সাধনার দ্বারাই সম্ভব। যেমন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘আত্মতত্ত্ব' সম্পর্কে হতাশা ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেছেন,‘আপনাকে চেনা আমার ফুরালোনা, আমার ফুরালো না।’’ বিশ্বকবি নিজেই আমিত্বের কূলকিনারা খুঁজে পাননি। সুতরাং আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্যতো রাতারাতি ‘নিজেকে চেনার' কোন প্রশ্নই ওঠে না। বাংলার বিখ্যাত বাউল কবি এবং বাউলগুরু লালনশাহ বলেছেন, ‘‘শহর-নগর বন্দরে ‘আমি' ‘আমি শব্দ করে।
আবার বলেছেন, আপনাকে চিনতে পারে চেনা যায় পরওয়ারদেগারে।’’ বাংলার আরেক বিখ্যাত বাউল এবং খোদাপ্রেমী হাসন রাজা বলেছেন,‘‘আমি কে আর তুমি বা কে তাইতো আমি বুঝলামনারে, এক বিনে দ্বিতীয় আমি অন্য কিছু দেখিনারে। উপরোক্ত আলোচনা এবং মহান সাধকগণের উক্তির মাধ্যমে ‘আমিত্ব' সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা আমরা পাই না। মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল-কোরআন থেকে ‘আমিত্ব' সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা এবং জ্ঞান-পাওয়া যায়। আরবি‘নফস' শব্দ থেকে ‘আমিত্ব' সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা এবং জ্ঞানপাওয়া যায়। আরবি ‘নফস' শব্দ থেকে ‘আমিত্ব' শব্দটি এসেছে। আল-কোরআনের ভাষায়: আরাফা নাফসাহু, ফাকাদ আরাফা-রাববাহু। অর্থাৎ, যে তার নফসকে চিনলো, সে তার প্রভুকে চিনলো।
সুফি মত অনুযায়ী আত্মদর্শনের জন্য জানা প্রয়োজন যেসব বিষয়
১. নফস (আত্মা বা প্রবৃত্তি) কে চিনতে হবে
সুফিরা
বিশ্বাস করেন
যে
আত্মজ্ঞান শুরু
হয়
নফস সম্পর্কে গভীর
উপলব্ধি থেকে।
নফসের
বিভিন্ন স্তর—
নফসে আম্মারা
(আবেগপূর্ণ আত্মা),
নফসে লাওয়ামা
(আত্ম-অনুশোচনাকারী আত্মা), এবং নফসে মুতমাইন্না
(শান্ত
আত্মা)—এগুলোর প্রতিটি ধাপে
নিজেকে
শুদ্ধ
করতে
হয়।
২. তাওবা ও আত্মশুদ্ধি
আত্মদর্শনের পথে
প্রথম
ধাপ
হলো
তাওবা বা
খাঁটি
অনুশোচনা। নিজের
ভেতরের
অহংকার,
লোভ,
হিংসা
ও
দুনিয়াবি মোহ
থেকে
মুক্তি
পাওয়াই
আত্মশুদ্ধির উদ্দেশ্য। সুফিরা
মনে
করেন,
অন্তরকে পরিশুদ্ধ না
করলে
আল্লাহর প্রেম
উপলব্ধি করা
সম্ভব
নয়।
৩. যিকির ও ধ্যান (ধ্যানসাধনা)
সুফিবাদে যিকির বা
আল্লাহর স্মরণ
একটি
মৌলিক
চর্চা।
এই
চর্চার
মাধ্যমে অন্তরের দরজা
খুলে
যায়,
এবং
মুরিদ
(অনুসারী) তার
সত্তার
গভীরে
প্রবেশ
করে
আল্লাহর উপস্থিতি অনুভব
করতে
শেখে।
ধ্যান
মানে
শুধু
চুপ
থাকা
নয়,
বরং
নিজেকে
পরিপূর্ণভাবে স্রষ্টার প্রতি
নিবেদিত করা।
৪. মুরশিদ (আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক)
সুফিরা
বিশ্বাস করেন,
একজন
মুরশিদ বা
পীর
ছাড়া
আত্মদর্শনের সঠিক
পথ
খোঁজা
অত্যন্ত কঠিন।
মুরশিদের দিকনির্দেশনায় পথিক
তার
আত্মার
পথ
চিনতে
পারে
এবং
বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানের ঊর্ধ্বে উঠে আত্মার গভীরে
পৌঁছায়।
৫. ফানা ও বাক্বা (নিজেকে বিলীন করে আল্লাহতে অবস্থান)
আত্মদর্শনের চূড়ান্ত ধাপ
হলো
ফানা—নিজের
অস্তিত্বকে আল্লাহর ইচ্ছার
সঙ্গে
একীভূত
করে
দেওয়া।
এরপর
আসে
বাক্বা—আল্লাহর সান্নিধ্যে স্থিত
হয়ে
থাকা।
এ
অবস্থায় ব্যক্তি আর
নিজের
জন্য
বাঁচে
না;
সে
আল্লাহর প্রেম
ও
ইচ্ছার
জন্য
বাঁচে।
উপসংহার
সুফি
দর্শন
বলে,
আত্মদর্শন একটি আয়না—এই
আয়নায়
আপনি
যদি
সত্যভাবে নিজেকে
দেখেন,
তবে
আপনি
আপনার
প্রভুর
ছায়াও
দেখতে
পাবেন।
এই
আত্মজ্ঞান শুধু
জ্ঞানচর্চা নয়,
এটি
প্রেম,
আত্মসমর্পণ ও
ঈমানের
চর্চা।
আর
এ
পথ
ধৈর্য,
একাগ্রতা ও
অন্তরের সত্যতা
ছাড়া
অতিক্রম করা
সম্ভব
নয়। নিজেকে
জানার
প্রক্রিয়াটি সহজ
নয়,
বরং
এটি
আজীবন
চলমান
একটি
অভ্যন্তরীণ অভিযাত্রা। কিন্তু
এই
অভিযাত্রা জীবনের
প্রতিটি ক্ষেত্রে—চিন্তা,
সম্পর্ক, কর্মজীবন ও
মানসিক
স্বাস্থ্যে—গভীর
ইতিবাচক প্রভাব
ফেলে।
আত্মদর্শন একজন
মানুষকে পরিণত
করে
আরও
মানবিক,
আরও
সংবেদনশীল এবং
সত্যিকার অর্থে
সচেতন
একজন
সত্তায়।
পরিশেষে আল্লাহপাকের একটি সুমহান বাণী দিয়ে আমার ‘আত্মা' সম্পর্কিত আলোচনার যবনিকা টানতে চাই:‘‘হে নবী (মুহম্মদ সাঃ) তাহারা তোমাকে ‘রূহ' সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, তুমি তাদেরকে বলে দাও ইহা আল্লাহর আদেশঘটিত ব্যাপার এবং এ বিষয়ে মানুষকে খুব কম জ্ঞানই দেয়া হয়েছে।’’

No comments