মোরাকাবা কাকে বলে? কীভাবে করতে হয়?
মোরাকাবা কাকে বলে? কীভাবে করতে হয়?
মোরাকাবা )مراقية( শব্দের শাব্দিক অর্থ: পর্যবেক্ষণ করা, পরিদর্শন করা, তত্ত্বাবধান করা, চোখে চোখে রাখা। ত্বরীকৃতের ভাষায় পবিত্রতা অর্জন করে নির্জনে পবিত্র স্থানে বসে চোখ বন্ধ করে মুর্শিদে করীমের বর্জখ বা চেহারার ধ্যান অর্থাৎ, চোখের সামনে রেখে মাথা ঝুঁকায়ে স্বীয় প্রবৃত্তির দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখে কূলবকে আল্লাহ তা'য়ালার ধ্যানে সজাগ রেখে এন্তেজার বা অপেক্ষা করাকে মোরাকাবা বলে। নিজকে হীন ও অধম মনে করে আল্লাহ তা'য়ালার মহত্ত্বের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভক্তি প্রকাশ করে তাঁর সম্মুখে একাগ্র অন্তরে বিনয়াবনত হয়ে ফয়েজ বা জ্যোতির অপেক্ষায় থাকা। খেয়ালে এমন তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখা যেমন শিকারী শিকারের প্রতি একাগ্রচিত্তে অপেক্ষমাণ থাকে। এ সময় জিহ্বা ও শরীর নড়া-চড়া না করে জ্বলবের মধ্যে আল্লাহু জিকির জারী রাখা উত্তম।
বস্তুতপক্ষে আমল দুই প্রকার। এক প্রকার আমল বাহ্যকেন্দ্রিক যথা- হাত, পা, চোখ, মুখ ইত্যাদির কাজ তা সকলেই জানে। আর এক প্রকার আমল জ্বলবের কাজ আর একেই মোরাকাবা বলে। মোরাকাবা অর্থই হলো যে, তুমি নিজের অন্তরে এ বিশ্বাস দৃঢ় করে নেবে যে, আল্লাহ তায়ালা তোমাকে দেখছেন। বস্তুত ধ্যান করতে করতে স্বীয় মঞ্জিলে মকসুদে পর্যন্ত আত্মাকে পৌছায়ে দেয়াকেই মোরাকাবা বলা হয়। অর্থাৎ, গায়রুল্লাহ হতে হৃদয়ের হেফাজত ও নেগাহবাণী করাকে এবং আল্লাহ তায়ালার ধ্যানে বেখোদ হয়ে যাওয়াকে মোরাকাবা বলে। যেমন আল্লাহ্ তা'য়ালা ইরশাদ করেন- اینما تولوا فسما وجه اللهউচ্চারণ: আইনামা তুওয়ালূ ফাছাম্মা ওয়াজহুল্লাহ। অর্থাৎ, যে দিকেই তুমি মুখ ফিরাও না কেন সে দিকেই তোমার রবের চেহারা বিদ্যমান। পবিত্র কোরআনের অন্যত্র আল্লাহ্ তা'য়ালা ইরশাদ করেন- ان في ذالك لاية لقوم يتفكرون উচ্চারণ: ইন্না-ফী যালিকা লা-আয়াতিল লিকাওমিই ইয়াতাফাক্কারূন। অর্থাৎ, নিশ্চয় যারা চিন্তা-গবেষণা করে তাদের জন্য রয়েছে আমার নিদর্শন সমূহ। অন্যত্র আল্লাহ্ তা'য়ালা ইরশাদ করেন- ان في ذالك لاية لقوم يعقلون উচ্চারণ: ইন্না-ফী যালিকা লা-আয়াতিল লিকাওমিই ইয়া'জ্বিলুন। অর্থাৎ, নিশ্চয় যারা জ্ঞানবান তাদের জন্য রয়েছে আমার নিদর্শনসমূহ।
এভাবে বিভিন্ন স্তরের মোরাকাবা করতে করতে মুরীদের অন্তর জ্যোতিপূর্ণ হয়ে অনেক তত্ত্বজ্ঞান ও অদৃশ্য বস্তুর দর্শন লাভ হয়। ইশকে নিমজ্জিত হয়ে বিভোরচিত্তে এই দর্শনের ফলে অনেক সময় প্রকৃত আশেকদের অন্তর থেকে বেখোদী অবস্থায় কোনো শব্দও নির্গত হতে পারে। হযরত জুননুন মিশরী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "যিনি যত বেশী নিজেকে আল্লাহতে আত্ম বিলীন করে আত্মসমাহিত হতে পেরেছেন তিনি ততটুকুই তাঁকে জানতে পেরেছেন।" সূফীকুল শিরোমণি হযরত গরীবে নেওয়াজ খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী রাদ্বিয়াল্লাহু তা'য়ালা আনহু বলেছেন- "প্রেমহীন নিরস ইবাদতকারী যেখানে হাজার রাকাত নামাজ দ্বারা পৌঁছবে মাওলার ইশকে মত্ত আশেক ব্যক্তি একটি আহ্ শব্দের হুংকারেই সে স্থানে পৌঁছে যায়।" প্রকৃত পক্ষে যার অন্তরে প্রেমের আকর্ষণ প্রবল রয়েছে, তিনিই অধিকভাবে আল্লাহ তা'য়ালার ধ্যানে বা মোরাকাবায় নিজেকে আত্মনিয়োগ করে এরূপ অভাবনীয় ইন্দ্রিয়াতিত স্বর্গীয় রাজ্যে আরোহণ করে মিলন সুধা লাভ করতে পেরেছেন। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন- سَنُرِيهِمْ آيَاتِنَا فِي الْآفَاقِ وَفِي أَنْفُسِهِمْ উচ্চারণ: ছানুরীহিম আয়াতিনা ফিল আ-ফাক্তি ওয়াফী আনফুছিহিম। অর্থাৎ, আমি (আল্লাহ) অতিসত্বর তাদেরকে আমার নিদর্শন সৃষ্টি জগতের চতুর্দিকে এবং তাদের আত্মার মধ্যে দেখাব। (সূরা হা-মীম আস সাজদা-৫৩)
মোরাকাবার ফজিলত বর্ণনা প্রসঙ্গে প্রিয়নবী রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু তা'য়ালা আলাইহি ওয়াছাল্লামা হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা'য়ালা আনহুর বর্ণিত হাদিসে বলেন, فكر ساعة خير من عبادة ستين سنة উচ্চারণ: ফিকরু ছা-আতি খায়রুম মিন ইবাদাতি ছিত্তিনা ছানাহ। অর্থাৎ, “মুহূর্তকাল (এক ঘণ্টা ফিক্স বা ধ্যান (মোরাকাবা) করা ষাট বৎসর নফল ইবাদত হতে উত্তম।" মোরাকাবা হচ্ছে হৃদয় বা কূলবের আমল, তাই এতে রিয়া বা লোক দেখানো ভাব আসার আশংকা নেই।
আল্লাহ তা'য়ালার নূর মোবারক নূরে মোহাম্মদী সাল্লাল্লাহু তা'য়ালা আলাইহি ওয়াছাল্লামা রূপী আয়নার মধ্যে প্রতিফলিত। পীর-মুর্শিদের বর্জখের সাথে মোরাকাবার মাধ্যমে সালেক বা মুরীদ নিজের কূলব নামক আয়নাতে সেই জ্যোতির দর্শন লাভ করতে পারে। এটা আরেফ সূফী গণের বাণী। এইভাবে মহাসত্যের সন্ধানে আল্লাহ তা'য়ালার পথে যারা গমন করেছেন; তারাই আল্লাহ তা'য়ালার সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন এবং আরেফীন, কামেলীন, সালেহীন ও আউলিয়া ইত্যাদি সম্মানজনক উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন; যাঁদের জন্য পবিত্র কোরআনে শুভ সংবাদ ঘোষিত হয়েছে- الا ان اولياء الله لا خوف عليهم ولا هم يحزنون الذين امنوا و كانوا يتقون لهم البشرى في الحياة الدنيا و في الآخرة ، لا تبديل لكمات الله ذالك هو الفوز العظيم উচ্চারণ: আলা ইন্না আউলিয়া- আল্লাহি লা-খাওফুন আলাইহিম ওয়া-লা-হুম ইয়াহযানূন, আল্লাযীনা আ-মানু ওয়াকানু ইয়াত্তাকুন, লাহুমুল বুশরা ফিল হায়াতিদ দুনিয়া ওয়াফিল আখিরাহ, লা-তাবদীলা লিকালিমাতিল্লাহি যালিকা হুয়াল ফাওযুল আজীম। অর্থাৎ, "সাবধান! নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'য়ালার বন্ধুগণের (আউলিয়া) কোনো ভয় নেই এবং তাঁরা চিন্তিতও হবেন না। যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছেন এবং তাওয়া অবলম্বন করেছেন; তাঁদের জন্য পার্থিব জীবনে ও পরকালে শুভ সংবাদ রয়েছে। আল্লাহ তা'য়ালার বাক্যে পরিবর্তন হয় না। ইহাই সেই মহান সফলতা। (সূরা ইউনুস-৬২)
আল্লাহ তা'য়ালা এরূপ বন্ধুদেরকে কামালিয়াতের (আধ্যাত্মিক পূর্ণতার) মকামে পৌঁছানোর জন্য জীবনের শুরু থেকেই আল্লাহ তা'য়ালা বিশেষ মেহেরবাণী দান করে আখলাকে নবী অর্থাৎ, উত্তম চরিত্র গুণে গুণান্বিত করে এবং তাকওয়ার সহিত আল্লাহ্ তা'য়ালার অত্যধিক ইবাদত বন্দেগী করার, শোকর (কৃতজ্ঞতা) ও সবর (ধৈর্য ধারণ) এর সহিত নির্মল জীবন যাপন এবং প্রভুর ইরফান ও মিলন লাভের জন্য কঠিন সাধনা বা রিয়াজত করার উপযোগী করে গড়ে তুলেন।
.jpg)
No comments