Header Ads

হুর কি? হুর সম্পর্কে কোরান হাদিসে কি বলা আছে এবং সুফী মতে কি বলা আছে?

 

"হুর" (حُور) শব্দটির মূল আরবি রূট হলো "হাওর" (حَوَر), যার অর্থসাদা-কালোর সমন্বয়ে চমৎকার চোখের সৌন্দর্য। কুরআনে হুরের উল্লেখ এসেছেহুর-উল-ঈন” (حُورُ الْعِينِ) নামে, যার মানেবড় চোখবিশিষ্ট বিশুদ্ধ রমণী

আল কোরানের সুরা আর-রহমান আয়াত নং ৭২: হুরুম্মাক ছুরাতুন ফিল খি-ইয়াম অর্থ: হুর তাঁবুর মধ্যে আবদ্ধ (বা আবৃত) আছেন, অথবা বাড়ির প্রধান হুর তাঁবুর মধ্যে গোপন রহিয়াছেন। বলা হচ্ছে, হুর তাবুর মধ্যে আবদ্ধ বা আবৃত বা ঢাকা আছে।তাহলে এখানে তাবু কি? হাকিকতের দৃষ্টিতে তাবু হলো ঘর ঘর দেহ ঘর। কি আবদ্ধ বা আবৃত আছে? হুর। তাহলে হুর কি? হুর হলো স্ত্রী লীঙ্গ। আর স্ত্রী লীঙ্গ হলো মাশুক। কার মাশুক? আশেকের। কে আশেক? যে তার প্রেয়সী যার প্রতি মোহব্বত প্রেম ভালবাসা অধিক জাগ্রত হয়। আপনি হলেন সাধক আপনার কাজ হলো আপনার দেহ ঘরে যে প্রেয়সী লুকায়িত আছে, তাকে খুঁজে বের করা এবং তার সাথে প্রেম লীলা খেলা। আর এই প্রিয়সী রুপে যিনি আপনার দেহ ঘরে আবদ্ধ বা আবৃত হয়ে আছেন, তিনি আর কেউ নন আমি আপনি যার জন্য পাগল সেই নূরে মোহাম্মদী। আমি যা বুঝাবার তা বুঝিয়ে দিয়েছি জ্ঞানীদের জন্য ইশারাটিই যথেষ্ট।

হুর কেবল রূপের উপমা নয়

অনেক ইসলামি দার্শনিক সুফি চিন্তাবিদ মনে করেনহুর কেবল দৈহিক সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, বরং এটি এক আত্মিক পুরস্কার প্রেমের পরাকাষ্ঠা, যা একজন মুমিন (আশেক) পাবে তার দীর্ঘ আত্মত্যাগ প্রেমময় ঈমানের বিনিময়ে

সুফি সদর উদ্দিন আহম্মদ চিশতী সাহেবের কোরআন দর্শনে তিনি হুরের যে ব্যক্ষা দিয়েছেন তা হলো:- মাকছুরাতুন অর্থ্: বাড়ির প্রধান, বদ্ধ,প্রাসাদে আবদ্ধ মহিলা,গোপনীয় মহিলা। রুহু আল্লাহর জাতি নূর। নূরে মোহাম্মদির একচ্ছটা আলো প্রত্যেক মানুষের মধ্যে প্রচ্ছন্ন হইয়া বিরাজ করেন। রুহু যখন আলোর মূর্তি লইয়া আত্ম প্রকাশ করেন তখন উহাকে হুর বলে-কোরআন দর্শন। অর্থাৎ নূরে মোহাম্মদী যখন আমার আপনার মধ্যে বিরাজমান,তখন তার স্বরুপ দর্শনটাই হলো হুর। হুরের চেহারা মানুষের আপন আলোকিত সুক্ষ চেহারা ব্যতীত অন্য কিছু নহে। ইহাই আত্ম- দর্শনের চরম পর্যায়। এখানে আমার আপনার বাহ্যিক চেহারা ভিন্ন হতে পারে কিন্তু ভিতরে যে নূরে মোহাম্মদীর স্বরুপ রয়েছে তা ভিন্ন নয়। তাহলে এখানে হুর বলতে যা বুঝান হলো তাতে কি কোন জৈবীক দেহধারী রক্ত মাংসের গড়া রুপসী ললনা নারী পাওয়া গেল? নি:শ্চয় না। তাহলে যা নয় তা নিয়ে মোল্লা সমাজের কামভাবী ব্যক্তিদের এত কামণা বাসনা কেন?

হুর: মাশুক কেন?

"মাশুক" শব্দের মানেযাকে ভালোবাসা যায়, প্রেম করা যায়। কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে হুর হলো: জান্নাতের পুরস্কারস্বরূপ "প্রিয়" আল্লাহর পক্ষ থেকে উপহার, যারা আল্লাহর ভালোবাসায় নিজেকে উৎসর্গ করেছে

ইমাম গায্জালি, ইবনে আরাবি এবং রুমি- মতো সুফি পণ্ডিতেরা হুরকে ব্যাখ্যা করেছেন "আত্মিক সৌন্দর্যের উপমা" হিসেবেএমন এক রূপ, যার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা জান্নাতবাসী মুমিনের আত্মাকে চরম আনন্দ প্রেমের পরিতৃপ্তিতে ভরিয়ে দেবেন

অন্তর্নিহিত ব্যাখ্যা:
হুর হলো সেই "মাশুক", যাকে ঈমানদার ভালোবাসেকিন্তু প্রকৃত মাশুক তো আল্লাহ নিজেই। সুতরাং হুর হলো আল্লাহর প্রেমে পৌঁছানোর এক ধাপ, এক রূপক

কে আশেক?

"আশেক" মানে যিনি "আশক" বা গভীর প্রেমে পড়েছেন। ইসলামী দৃষ্টিতে আশেক হলো: যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি গভীর প্রেমে মগ্ন, যে দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করে আখিরাতের দিকে ধাবিত, যে কেবল জান্নাত চায় না, চায় আল্লাহর সাক্ষাৎ নৈকট্য

কুরআনে এসেছে: "যারা আল্লাহর প্রেমে এমনভাবে ভালোবাসে, যেন আল্লাহই একমাত্র প্রিয়।" (সূরা আল-বাকারা :১৬৫)

তাই, আশেক সেই ব্যক্তিযে আল্লাহর প্রেমে এতটাই পরিপূর্ণ যে দুনিয়ার সবকিছু ত্যাগ করতেও প্রস্তুত

হুরআশেক সম্পর্ক: রূপক, নয় আত্মার মুক্তি

কামেল গুরুর অপর নাম “ফাতেরিস সামাওয়াতে অল আর্দ“ অর্থাৎ মন ও দেহ বিচুর্ণকারী। কামেল গুরু আপন অস্তিত্ব হইতে দেহ মন বিচুর্ণ করিতে পারিয়াছেন বলিয়াই শিষ্যগণকেও সেই পথে পরিচালনা করিবার পূর্ণ্য যোগ্যতা অর্জন করিয়াছেন। এই রুপে কামেল গুরুর কোনও লা-অবস্থার সঙ্গেই মিথ্যার বা শেরেকের কোন রুপ যোগ থাকে না‘। কামেল মোর্শেদের আপন ইন্দ্রিয় পথে যেই সকল ধর্ম রাশি মস্তিস্কে আগমন করে তাহার প্রত্যেকটি মোহ তিনি ত্যাগ করিয়া নিস্কাম মোহ শুন্য অবস্থায় বিরাজ করেন।  সুতারং তাঁহার কোনও বিষয়ের সঙ্গেই মিথ্যা বা মোহ যুক্ত হইতে পারে না। শেরেক শুন্য তাই রবের আসল পরিচয়।আল কোরানের সুরা আর-রহমান আয়াত নং ৭৪: লাম-ইয়াত মিসহন্না ইনসুন কবলাহুম ওয়ালা জান্নু। অর্থ্: তাঁহাদিগের সংস্পর্শে আসে নাই ইতি পূর্বে কোন মানুষ এবং কোন জিন। ব্যাখ্যা: হুরের সঙ্গে মিলন লাভের পূর্ব পর্যন্ত কোন মানুষ অথবা জিন হুরকে স্পর্শ করিবার যোগ্যতা রাখেনা। অর্থাৎ হুরের সংস্পর্শে আসিতে পারেনা, বরং হুর গোপন কক্ষে আবদ্ধ এবং অজ্ঞাতই থাকিয়া যায়। আল কোরানের সুরা আর-রহমান আয়াত নং ৫৬: ফি-হিন্নান কাছিরাতুত্ব রফে-লাম ইয়াত্ব মিসহুন্না ইনসুন ক্ববলাহুম ওয়ালা জান্নু। অর্থ: ইহাদের মধ্যে রহিয়াছে চোখের দৃষ্টি সংযতকারী, যাহাদিগের সংস্পর্শে আসে নাই ইতি পূর্বে কোন মানুষ এবং না কোনও জিন। ব্যাখ্যা: কাছিরাতুত্ব রফে অর্থ:চোখের দৃষ্টি বিষয়ে যে নিজেকে সংযত রাখে। জান্নাতবাসীগণ সকলেই স্ত্রী-লিঙ্গ্, অর্থাৎ প্রকৃতি। যদিও ইহারা উচ্চতম জান্নাতের অধিবাসী তথাপি ইহারা এখনও পুরষ হন নাই, প্রকৃতির মধ্যে আবদ্ধ আছেন। সেই জন্য স্ত্রী-লিঙ্গ প্রয়োগ করা হইয়াছে। রুহু জাগ্রত হইয়া দৃশ্যমান হইলে তাঁহাকে হুর বলে। হুর প্রাপ্ত ব্যক্তির হুর অন্য সবার জন্য দৃশ্যমান নহে। সুফি সাধক মহাত্মা লালন শাহ রুহুকে “অচিন পাখি”বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছেন। উপরুক্ত বাণী সমুহের আলোকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় মোল্লা সাহেবরা জৈবিক হুরের কথা বলে যে বয়ান দ্বারা যুবক শ্রেনীর ভাইদেরকে আকৃষ্ট করেন তাহা প্রকৃত পক্ষে কোন রক্ত মাংসের দেহধারী সুন্দরী রুপবতী নারী নহে।

হুর হচ্ছে এক "আত্মিক তৃষ্ণার" প্রতীকজান্নাতে আল্লাহর পক্ষ থেকে এক নিখুঁত ভালবাসার পরিপূর্ণতা। আশেকের হৃদয় জান্নাতে তা পায়

হুর নারীপ্রেম নয়, আল্লাহ প্রেমের ছায়া

বিভিন্ন সুফি দর্শনে হুর কখনও কখনও এমন কল্পনাতীত রূপে হাজির হয়েছে, যেখানে তারা কেবল নারী নয়বরং এক আত্মিক প্রভা, এক দিব্য আকাঙ্ক্ষা, যা আশেকের হৃদয়ে ছায়া ফেলে: "হুর হলো সেই রূপ, যার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা আশেককে দেখানযে প্রেম সে বহন করেছে, তার প্রতিদান শুধু জান্নাত নয়, হৃদয়ের চিরশান্তি।"

সুফি সদর উদ্দিন আহম্মদ চিশতী সাহেব আরও সুন্দর করে বুঝিয়েছেন, যে আপন প্রচ্ছন্ন হুরের সঙ্গে মিলনের মধ্যেই মানব জীবনের চরম সার্থকতা। অর্থাৎ চিশতী সাহেব বুঝিয়েছেন, নূরে মোহাম্মদীর স্বরুপ দর্শনের মাঝেই রয়েছে জীবনের সকল চাওয়া পাওয়া বা সার্থকতা। মানব দেহ আল্লাহর ঘর বা প্রাসাদ। এই প্রাসাদের গোপন রানী হইয়া হুর তথা নূরে মোহাম্মদী বিরাজ করিতেছেন। হুর স্ত্রী-লিঙ্গে প্রকাশিত। এই জন্য সুফি সাধকগণ তাঁহাদের মাশুককে প্রেয়সী,রানী ইত্যাদি নামে সম্বোধন করিয়া থাকেন।

উপসংহার

 এক কথায় আলোকিত সাধককেই হুর বলা হয় সার কথাটি দাঁড়ায়মানব দেহের রুহু (নূরে মোহাম্মদীরুপে ”হুরপ্রচ্ছন্ন হইয়া আছেজাগ্রত হইয়া মানবসত্তার মিলনের অপেক্ষায় রহিয়াছে মানুষের আপন আলোকিত মুর্তি হইল হুর 

হুর কে? হুর হলো মাশুক, সেই প্রেমিক রমণী বা আত্মিক পুরস্কার, যাকে একজন আশেক (ঈমানদার প্রেমিক) জান্নাতে পাবেন।
আশেক কে?  যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভালোবেসে নিজের নফস, দুনিয়া সব কিছু ত্যাগ করে তাঁর পথে নিজেকে বিলিয়ে দেয়এই ভাবনায় হুর শুধুই নারী নয়এটি একটি আত্মিক আদর্শ, প্রেম, বিশ্বাস, আত্মত্যাগের চূড়ান্ত পুরস্কারের প্রতীক



No comments

Powered by Blogger.