কাম যেখানে শেষ, সেখানেই প্রেমের শুরু ।
কাম যেখানে শেষ, সেখানেই প্রেমের শুরু ।
প্রিয় + ম = “ প্রিয়ম মানে প্রেম । যার প্রতি প্রিয় বলে আকর্ষণ জন্মে তার সাথে অবিরাম মিশে থাকার অন্তর্গত টান তথা মিলনের আকিঞ্চনই প্রেম ।সত্তার সাথে মূলসত্তার মিলন প্রচেষ্টাই প্রেম । নূরে মােহাম্মদির মধ্যে অখণ্ড আহাদের একীভূত সংযুক্তি । জগতে অর্থ , সম্পদ , নারী , প্রতিষ্ঠা ও খ্যাতির জন্যে জীব স্বভাবসম্পন্ন - ইন্দ্রিয়পরায়ণ মানুষের যে মােহমাখা তাড়না তাকে বলা হয় কাম ।
ফাসেক বনাম আশেক । ফাসেকি খাসলত দূর হলে আশেকি হাল জাগে । ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন ’ মানে আমরা আল্লাহর জন্যে এবং নিশ্চয় আমরা তার দিকে প্রত্যাবর্তনকারী । আল্লাহ থেকে উৎপন্ন হয়ে পুনর্বার তার দিকেই সবকিছুর প্রত্যাবর্তন এবং পরিণামে তাতেই নিষ্পন্ন হয় । আল্লাহ্ থেকে উদ্ভূত হয়ে পুনরায় সবকিছু তার সাথে একীভূত , একাকার ও একাত্ম হয়ে যায় । তার সত্তার সাথে মিলিত না হওয়া পর্যন্ত আসা-যাওয়া , আগমন-প্রত্যাগমন , আবর্তন-বিবর্তন , জন্ম-মৃত্যু অবিরাম চলতে থাকে ।
একটি দৃষ্টান্ত দিয়ে বিষয়টি তুলে ধরা যাক । জলের উৎস সমুদ্র । সূর্যতাপে সামুদ্রিক জল বাষ্পীভূত হয়ে মেঘের রূপধারণ করে আকাশে ভেসে বেড়ায় । বাতাসের বেগে মেঘের সাথে মেঘের ঘর্ষণে বজ্র - বৃষ্টিপাত দ্বারা তা আবার সমুদ্রে ফিরে আসে । আল্লাহুরূপী সম্যক গুরু থেকে সবকিছুর উদয় এবং তার মধ্যেই সবাকার বিলয় । তিনিই সবকিছুর প্রারম্ভ এবং পরিণতি , প্রকাশ এবং আড়াল । গুরুর মূলসত্তা থেকে যে অখণ্ড সত্তা বিচ্ছিন্ন হয়ে খণ্ড দেহরূপ ধরেছে তাকে গুরুসত্তার সাথে পুনর্মিলন ঘটাতে হবে । নয়তাে জন্ম - জন্মান্তরে নানা দেহে ঘুরে ঘুরে দুঃখভােগ করতে হবে ।
তাঁর সান্নিধ্যের আকাঙক্ষা থেকেই যতাে বিরহ - বেদনা । মনের মানুষের সাথে মিলনের তীব্র আকুলতা , অশেষ বিরহজ্বালা প্রেমিক সাধকের হৃদয় - মন পুড়িয়ে ঝামা করে ফেলে । দ্বৈতরূপে সৃষ্টি ও স্রষ্টার এ লীলার মূলাধার অদ্বৈত - অখণ্ড মহাগুরু মাওলা । যেমন : রাধাকৃষ্ণ , আদিঅনাদি , পুরুষপ্রকৃতি , গুরুশিষ্য , কামপ্রেম , শুক্র শােণিত । একটি অন্যটির পরিপূরক । একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটির প্রকাশ বিকাশ নেই ।
এভাবে অখণ্ড আহাদ জগতে গুরুজি রূপে রসে অসীম বৈচিত্র্যে নিত্য নব লীলায় প্রবহমান । এ দ্বিতীয়তত্ত্ব বা যুগলতত্ত্ব হলাে প্রেম ও প্রেমের স্বরূপ রূপ । প্রেমী - প্রেমাস্পদ তথা গুরুর সাথে ভক্তের একাত্মবাধ জাগিয়ে তােলে । দুয়ের মধ্যে ভেদ নেই ।
প্রেমের তথা ইশকের মােহনায় প্রেমিক বা আশেকের সাথে প্রেমাস্পদ বা মাশুকে মিলে - মিশে একাকার - একীভূত হয়ে যায় । মহাজগতে যা কিছু সত্য , সুন্দর ও মঙ্গল তার মূলে রয়েছে প্রেম । সবখানে প্রেমেরই জয় জয়কার । সর্বদেশে , সর্বকালে শিল্পে - সাহিত্যে প্রেমের চিরায়ত মহিমাই ঝংকৃত ও বর্ণিত হয়েছে । প্রেম তাই অপরাজেয় । প্রেমের লীলায় সমস্ত জগত বিভাের ও মােহিত । প্রেমের আবেশের তন্ময়াবিষ্ট হয়ে আছেন স্বয়ং স্রষ্টা , পালনকর্তা , সংহারকর্তা আল্লাহ । তিনিই সম্যক গুরুরূপে প্রেমের সফল রূপকার ও প্রবক্তা ।
প্রেমই স্বর্গ , স্বৰ্গই প্রেম । স্বর্গীয় প্রেম আমাদের করে তােলে সৌন্দর্যমণ্ডিত । অন্তরের গভীর প্রদেশে পুঞ্জিভূত প্রেমাস্পদের সাথে সংযুক্তির বা সংযােগ সাধনের অনিবার্য - অপ্রতিরােধ্য প্রয়াসই ইশক বা মহব্বত বা প্রেম । এটিই প্রেমিক ও প্রেমাস্পদের তথা আশেক - মাশুকের মধ্যবর্তী ব্যবধান ঘুচিয়ে ফেলার অমােঘ অস্ত্র । প্রেমই সুমধুর উন্মাদনা , সর্বরােগের মহৌষধ , সর্বসাধন সিদ্ধির উত্তম সহায়ক , পরম প্রজ্ঞা ও শ্রেষ্ঠতর বিজয় । প্রেমের যাদুকরী ক্ষমতা , অপূর্ব মােহিনী শক্তি ।
প্রেম তাই ভেদাভেদশূন্য , কামনামুক্ত , মহাসাম্য সংস্থাপক । একেই বলা হয়েছে ' তৌহিদ ' বা অদ্বৈতবাদ যেখানে প্রেমী ও প্রেমাস্পদের সব দূরত্ব মুছে গেছে । দেশকালসীমার দূরত্ব ভেঙে মানুষের সাথে মানুষের , ধর্মের সাথে ধর্মের , জাতির সাথে জাতির সব বৈষম্য ও হিংসার দেয়াল চূর্ণ করে দেয় প্রেম । এটি মনের চিরন্তন আর্তি । মনের মণিকোঠায় এর অধিষ্ঠান । তাই বাইরের ইন্দ্রিয়গাহ্য দৃষ্টিতে একে দেখা যায় না , হৃদয়গভীরে >দ্বাদশদল পদ্মে তার স্থিতি । প্রেম শর্তহীন । জ্ঞান ও আইন যেখানে শেষ প্রেম সেখানে শুরু । প্রেম এমনই অন্ধ । প্রেমিকেরা প্রেমঘটিত ভুলও বুঝতে পারে না । প্রেম যে কী চায় প্রেমিক তা জানে না , পৃথিবীও জানতে পারে না ।
হাদিসে আছে , “ আল ইশকু আসলি কুলু ইবাদাতিন ” (অর্থাৎ যার প্রেম নেই তার উপাসনাও নেই) । “ মান লা ওয়াজাদা লাহু লা হায়াতাল্লাহ ” অর্থাৎ( যার প্রেম নেই তার জীবনও নেই)! আল কোরান বলছেন , “ ইন্নাল্লাজিনা আমানু ওয়া আমিলুস সালিহাতি সাইয়াজালাহু লাহুমুর রাহমানু উদ্দান " । অর্থাৎ( যারা ইমানের কাজ করে এবং আমলে সালেহা অর্থাৎ উত্তম সৎকর্ম করে তাদের জন্যে রহমান প্রেম বিকশিত করেন )। যারা রহমান অর্থাৎ সম্যক গুরুর কাছে মানবীয় আমিত্বের পরিপূর্ণ সমর্পণের দ্বারা অবিচল আনুগত্যে নিষ্ঠাবান থেকে অর্পিত কর্তব্য সম্পাদন তথা সঙ্কর্ম করে তাদের অন্তরে শুদ্ধ প্রেমভক্তি সঞ্চারিত করেন গুরু । ফলে তারা প্রেমের অপ্রতিহত চৌম্বক আকর্ষণে মালাউল আলা ' অর্থাৎ আল্লাহর উচ্চতম পরিষদের সদস্যদের সাধুসঙ্গলাভ করেন । আউলিয়াগণ মৃত্যুর পূর্বেই ‘ দুন আল্লাহ্'র অর্থাৎ বিষয়মােহনির্ভর সব দুর্বল আল্লাহ ' থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে ওঠেন । বস্তুর মােহজনিত সংস্রব থেকে মনের একাকী ভাবই তাঁদের পরম গুরুর সাথে একীভূত করে তােলে । দেহত্যাগ করার পর মােমিনব্যক্তি নিঃসঙ্গ থাকেন না বরং অন্য মােমিনগণের সৎসঙ্গলাভ করে থাকেন । তাদের অন্তরে দয়াল রহমান প্রেম বিকশিত করে দেন যার মাধ্যমে তারা উচ্চতম মহাপুরুষদের প্রতি প্রেমের আকর্ষণ দ্বারা তাদের নিত্য সঙ্গলাভ করে থাকেন । কোনাে অবস্থায় একা , অসহায় থাকেন না । সারা সত্তা তাদের সহায়ক এবং সাথী । গুরুর রহমতের ছায়াতলে আশ্রয়গ্রহণ করায় তাঁদের নৈরাশ্যের অন্ধকারে তাই হাতড়ে ফিরতে হয় না । তারা যা আশা করেন তা কখনাে নিরাশ হয়ে ফিরে আসে না , কখনাে তাদের মনােবাঞ্ছা অপূর্ণ থাকে না । তারা গুরুর সাথে প্রেমের বদৌলতে এ মহাপ্রশান্তিময় আশ্রয় অর্জন করেন । প্রেমের পথ তাই কুসুমাস্তীর্ণ নয় বরং তা কণ্টকাকীর্ণ । জগত কাটাবনে কাটার আঘাতে আঘাতে রক্ত ঝরিয়ে ঝরিয়ে প্রেমের ফুল ফোটাতে হয় । প্রেমিকের এমনই নিষ্ঠা । সুত্রঃ লালন দর্শন =পৃষ্টা ৩১২/৩১৩
শাইজি গাইছেন :-
প্রেম পাথারে যে সাঁতারে , তার মরণের ভয় কী আছে ।
নিষ্ঠাপ্রেম করিয়ে সে, একমনে বসে রয়েছে ।
শুদ্ধপ্রেম রসিকের কর্ম, মানে না বেদবিধির ধর্ম,
রসরাজ রসিকের মর্ম, রসিক বৈ আর কে জেনেছে ॥
শব্দ,স্পর্শ,রূপ,রস,গন্ধ, পঞ্চেতে হয় নিত্যানন্দ
যার অন্তরে সদানন্দ, নিরানন্দ সে জানে না ॥
পাগল নয় সে পাগলের পারা, দু নয়নে বহে ধারা,
যেন সুরধুনির ধারা, লালন কয় ধারায় ধারা, মিশে আছে ৷।
.jpg)
No comments