মানব দেহের তত্ত্ব ভেদ
যেগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ, সংযম এবং আধ্যাত্মিক চর্চার মাধ্যমে একজন সালিক (আধ্যাত্মিক পথিক) আত্মশুদ্ধি অর্জন করেন। কোরানকে বিশ্লেষন করলে দেখা যায়, যাহা আছে বিশ্ব ভ্রমান্ডে তাহা আছে মানব ভান্ডে। সে অনুযায়ী সুফী সাধকগণ কোরান ও হাদিসের বিধানের পাশাপাশি মানব দেহ নিয়েও গবেষনা করেন এবং সাধনে করেন।
মানব দেহের চার কুতুব : সুফী দর্শনে মানবদেহকে একটি আধ্যাত্মিক বাস্তবতার কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ দেহে কিছু নির্দিষ্ট আধ্যাত্মিক কেন্দ্র বা "চার কুতুব" (চারটি স্তম্ভ) রয়েছে, যেগুলো আত্মিক উন্নয়ন ও আল্লাহর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের পথে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুফী সাধকগণ মানব দেহের চার কুতুব হিসেবে হাতের দুইটা বৃদ্ধাঙ্গুলি ও পায়ের দুইটা বৃদ্ধাঙ্গুলিকে কুতুব বলা হয়েছে।
মানব দেহের ষোল প্রহরী : সুফী মতে “দেহতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে মানবদেহের ষোলো প্রহরী” বলতে মূলত আত্মিক ও শারীরিকভাবে দেহের নির্দিষ্ট ১৬টি অংশকে বোঝানো হয়। এই ১৬ প্রহরী আসলে মানুষের ইন্দ্রিয়, অঙ্গ এবং চেতনার দিকগুলো যেগুলোর মাধ্যমেই পাপ বা পূণ্যের কাজ সংঘটিত হয়। সেগুলোকে “প্রহরী” বলা হয় কারণ একজন সুফি সাধক এগুলোর প্রতি সর্বদা সচেতন থাকেন যেন এগুলো তাকে গাফেল বা বিপথে না ঠেলে দেয়। সুফী সাধকগণের গবেষণা অনুযায়ী দুই হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বাদে বাকি আটটি আঙ্গুল এবং পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি বাদে বাকি আটটি আঙ্গুল মিলে এই ১৬টি আঙুলকে ১৬ প্রহরী হিসেবে ধরা হয়েছে.
মানব দেহের বার বুরুজ : সুফী মতে দেহ-তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে মানবদেহের "বারো বুরুজ" (১২ বুরুজ) বলতে বোঝানো হয় – মানবদেহের এমন বারোটি আধ্যাত্মিক কেন্দ্র বা উপাদান, যেগুলোকে ‘রূহানী দেহের স্তম্ভ’, ‘আত্মিক দরজা’, কিংবা ‘জাগতিক ও আধ্যাত্মিক সংযোগ বিন্দু’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
“বুরুজ” শব্দের অর্থ "দুর্গ, স্তম্ভ, অবস্থান", এবং সুফী পরিভাষায় প্রতিটি হাতের আঙুলের মোট তিন সারি করে জয়েন্ট বা জোড়া আছে এবং প্রতিটি পায়ের আঙুলের মোট তিন সারি করে জয়েন্ট বা জোড়া আছে। দুই হাত এবং দুই পা মিলে মোট ১২টি সারির জয়েন্ট বা জোড়াকে বুরুজ বলা হয়েছে।
মানব দেহের চৌদ্দ কামান : সুফী মতে দেহ-তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে মানবদেহের “চৌদ্দ কামান” বলতে বোঝানো হয় – দেহে অবস্থিত এমন ১৪টি আধ্যাত্মিক অঙ্গ রয়েছে, যেগুলো দিয়ে বাহ্যিক শক্তিকে দেহের আভ্যন্তরে প্রবেশ করতে না পারে বা প্রভাবিত করতে না পারে। এই ধারণাটি সুফি আধ্যাত্মিক দর্শনে "রূহানী নিরাপত্তা", "আত্মিক যুদ্ধ" এবং আল্লাহর নূর সংরক্ষণের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে "কামান" শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে প্রতিরক্ষা বাহক বা আক্রমণ প্রতিরোধক শক্তি কেন্দ্র বোঝাতে — ঠিক যেমন যুদ্ধের কামান শত্রুর আক্রমণ ঠেকাতে ব্যবহৃত হয়, তেমনি এই চৌদ্দ কামান আত্মাকে নফস, শয়তান, দুনিয়াবি আকর্ষণ ও গাফেলি থেকে রক্ষা করে। ছিনার দুই পাশে সাতটা করে চৌদ্দটা বাঁকা হাড় আছে. এই চোদ্দটি বাঁকা হারকে আধাকিকতায় সুফী সাধকগণ চৌদ্দ কামান বলেছে।
মানব দেহের আট কুঠুরি : সুফী মতে দেহ-তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে মানবদেহের “আট কুঠুরি” (৮ কুঠুরি) বলতে বোঝানো হয়—মানব আত্মা ও চেতনার সেই আটটি গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক কেন্দ্র বা অভ্যন্তরীণ স্তর, যেগুলো একজন সালিক (আধ্যাত্মিক পথিক)-এর আত্মিক উন্নয়ন ও পরিশুদ্ধির পথে ধাপে ধাপে উন্মোচিত হয়।
এই “কুঠুরি” শব্দটি এখানে প্রতীকী—যেন আল্লাহর দিকে যাওয়ার পথে আত্মার ভেতরে আটটি দরজা বা স্তর, প্রতিটিই একেকটি গোপন ঘর, যেখানে প্রবেশ করতে হলে নিজেকে শুদ্ধ করতে হয়। সুফী সাধকগণের গবেষণা অনুযায়ী, মানুষের মস্তকে একটি কুটুরী, কপালে একটি কুটুরী, ঘারে একটি কুটুরী, বহ্মদেশে একটি কুটুরী, ডাইন স্তনের নিচে একটি কুটুরী, নাভীমুলে একটি কুটুরী, মেরুদণ্ডে একটি কুটুরী এবং মলদ্বার ও মৃত্রদ্বারের মাঝখানে একটিসহ মোট আটটি গোপন স্থান রয়েছে। ইহাকে কুঠুরি বলা হয়।
মানব দেহের সাত সমুদ্র : সুফী মতে দেহ-তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে “মানবদেহের সাত সমুদ্র” (৭ সমুদ্র) হচ্ছে এক ধরণের আধ্যাত্মিক রূপক, যা মানব আত্মার ভেতরে থাকা সাতটি গভীর জ্ঞান, অনুভব, ও আত্মিক স্তরের প্রতীক। এগুলোকে আত্মিক সমুদ্র বলা হয়, কারণ এগুলো বিশাল, গভীর, সীমাহীন এবং আধ্যাত্মিকভাবে “ডুবে যাওয়ার” মতো। সুফিগণ মনে করেন, একজন সালিক (আধ্যাত্মিক পথিক) তার ভেতরের এই সাতটি সমুদ্র অতিক্রম করে ধীরে ধীরে আল্লাহর প্রেম ও দর্শনের গভীরতায় পৌঁছান। যেমন মানুষের দুইটি কর্ণ রয়েছে এবং এই কর্ণ দিয়ে মানুষ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কত রকমের কথা যে শুনে থাকে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। তারপর রয়েছে দুইটি চক্ষু এই চক্ষু দিয়ে মানুষ জন্মের পর থেকে কবরে যাওয়ার আগে পর্যন্ত ভালো মন্দ অনেক কিছু দেখে থাকে। এবারে আসুন মানুষের একটি নাক রয়েছে, আবার ওই নাকের দুইটি ছিদ্র রয়েছে মানুষের এই নাকের ভিতর অনেক গুপ্ত রহস্য লুকায়িত আছে। যা একজন কামেল লোক ছাড়া ভেদ কেও বুঝতে পারে না। মানুষ এই নাক দিয়ে জন্ম থেকে মৃত্যু অবদি শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করে থাকে। সর্ব শেষ হলো মানুষের মুখ। একজন মানুষ পৃথিবীতে যতদিন বেঁচে থাকে ততদিন তাকে কিছু না কিছু খেতেই হয়। ইহাকে সুফী মতে সাত সমুদ্র বলা হয় ।
মানব দেহের তেরটি নদী : সুফী মতে, দেহতত্ত্ব বা আধ্যাত্মিক শরীরচর্চার এক বিশেষ অংশ হলো মানব দেহের অভ্যন্তরীণ নদী বা "নদী" গুলো। এগুলোকে মূলত মানব শরীরের আধ্যাত্মিক বা সূক্ষ্ম শক্তি প্রবাহের পথ হিসেবে দেখা হয়, যেগুলো যোগ ও সুফী সাধনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মানব দেহে তেরোটি (১৩টি) নদীর নাম বিভিন্ন সুফী সূত্রে ভিন্ন হতে পারে, তবে একটি প্রচলিত বর্ণনায় নিচের নদীগুলোর উল্লেখ পাওয়া যায়- কাম নদী, প্রেম নদী, আশা নদী, মায়া নদী, রুপ নদী, ভাব নদী, ক্রোধ নদী, মোহ নদী, হায়াত নদী, ত্যাগ নদী, কাম নদীতে তিন নদী- একধারে রক্ত, একধারে মুত্র, একধারে রজ।
মানব দেহের তেপ্পান্ন গলি : সুফী দর্শনের দৃষ্টিতে মানব দেহকে একটি জটিল আধ্যাত্মিক রূপ হিসেবে দেখা হয়, যেখানে শরীরের বিভিন্ন অংশ বা "গলি" (পথ বা চ্যানেল) দিয়ে আধ্যাত্মিক শক্তি প্রবাহিত হয়। এই “তেপ্পান্ন গলি” (৫৩টি গলি বা পথ) মূলত দেহের অভ্যন্তরীণ আধ্যাত্মিক বা প্রাণশক্তির প্রবাহপথ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
তবে এই ৫৩টি গলির নির্দিষ্ট নাম ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা মূলধারার সুফী সাহিত্যে খুব স্পষ্টভাবে তালিকাভুক্ত নয়, বরং এটি লোকজ সুফীবাদ, বিশেষ করে বাংলা সুফী কবিতা ও মরমিয়া গানের ধারায় প্রতীকী ভাষায় ব্যবহৃত হয়। এই ধারায় দেহ-তত্ত্ব বা শরীরতত্ত্ব অনেকটা সাধনার উপমা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যেমন- বত্রিশটি দাতের ভিতর ত্রিশটি গলি, মস্তক হইতে লিঙ্গ প্রর্যন্ত বাইশটি রগ দ্বারা আবৃত করা, এবং লিঙ্গে একটি, ইহাকেই সুফী সাধকগণ মানব দেহের তেপ্পান্ন গলি হিসেবে বিবরণ দিয়েছেন।
মানব দেহের ছাপ্পান্নটি মাথা : সুফীবাদ, বিশেষ করে বাংলা লোকসাহিত্যের মরমিয়া ধারায়, দেহতত্ত্বে "ছাপ্পান্নটি মাথা" (৫৬টি মাথা) একটি আধ্যাত্মিক ও প্রতীকী ধারণা — যা মানবদেহের অভ্যন্তরীণ রহস্য, শক্তির স্তর, চেতনার অবস্থান বা আধ্যাত্মিক সাধনার বিভিন্ন ধাপ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
এই “ছাপ্পান্নটি মাথা” বলে বোঝানো হয় যে দেহ একটি জটিল আধ্যাত্মিক তন্ত্র, যার ৫৬টি কেন্দ্র বা ‘মাথা’ রয়েছে। এগুলো প্রকৃত মাথা নয় — বরং আধ্যাত্মিক জ্ঞানের, অনুভবের বা প্রজ্ঞার কেন্দ্র, যেগুলো সুফী সাধনার স্তর বা দেহমনের স্তরবিশেষ। যেমন- বত্রিশটি দাতের বত্রিশ মাথা, হাত পায়ের বিশটি আঙুলের বিশটি মাথা, নাশিকার একটি মাথা, নিজের একটি মাথা, জিহ্বার একটি মাথা, লিঙ্গের একটি মাথা, ইহাকে ছাপ্পান্নটি মাথা বলা হয় হিসেবে সুফীগণ বিবরণ দিয়েছেন।
মানব দেহের সারে চব্বিশ চন্দ্র : "সারে চব্বিশ চন্দ্র" – এই শব্দবন্ধটি সুফী ও মরমিয়া লোকসাহিত্যে ব্যবহৃত একটি গভীর প্রতীকধর্মী ও আধ্যাত্মিক ধারণা। এটি মূলত দেহতত্ত্ব বা আধ্যাত্মিক দেহের অভ্যন্তরীণ জ্যোতিঃকেন্দ্র বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
এখানে “চন্দ্র” বলতে আক্ষরিক চাঁদ নয়, বরং আলো, প্রজ্ঞা, চেতনা বা আধ্যাত্মিক শক্তির উৎস বোঝানো হয়েছে। চন্দ্রের যেমন নিজস্ব আলো নেই ঠিক তেমনি মানব দেহের যে চন্দ্রের কথা বলা হয়েছে সেটাও অনুরূপ যেমন- বিশটি আঙুলের নখকে বিশটি চন্দ্র, মস্তকে এক চন্দ্র, নাশিকাতে এক চন্দ্র, জিহ্বাতে এক চন্দ্র, আদি চন্দ্র গোপনে রহিলো ইহা কামেল মুর্শিদের নিকট থেকে জেনে নিবেন
মানব দেহের তিনটি চহ্মু : সুফী দর্শন অনুযায়ী, মানব দেহে তিনটি চক্ষু বা "চোখ" আছে, যেগুলো ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার জ্ঞান বা চেতনার প্রতিনিধিত্ব করে। এই তিনটি চক্ষু হলো: চর্ম চক্ষু, অন্তর চক্ষু, জ্ঞান চক্ষু।
উপসংহার
পরিশেষে সুফী দর্শনে মানবদেহকে একটি আধ্যাত্মিক বাস্তবতার কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সুফী মতে দেহ-তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে আল্লাহকে চেনা ও জানা যায় এবং সে অনুযায়ীই আমল করলে আল্লাহ রাসূল খুশি বা রাজি হন।
.jpg)
No comments