চিসতিয়া তরিকতের সবক সমূহের পরিচিতিঃ ফাতেহাখানি ও ছোয়াব রেছানি দরূদ শরীফের জিকির ও মোরাকাবা
চিশতিয়া তরিকতের সবক সমূহের পরিচিতি
চিশতিয়া তরিকত হল ইসলামের সুফিবাদী ধারা যা মূলত অন্তরের পরিশুদ্ধি, আত্মিক উন্নয়ন এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের পথে সালিক (আধ্যাত্মিক পথিক)-দের প্রশিক্ষণ ও নির্দেশনা প্রদান করে। এই তরিকতের মূল ভিত্তি হচ্ছে আল্লাহর ভালবাসা, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর অনুসরণ এবং মানবকল্যাণ।
চিশতিয়া তরিকত ইসলামি আধ্যাত্মিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা, যা মূলত ইমাম খ্বাজা মইনুদ্দীন চিশতী (রহঃ) দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। এই তরিকতের মূল উদ্দেশ্য আল্লাহর সঙ্গে গভীর আত্মিক সংযোগ স্থাপন এবং হৃদয় পরিশুদ্ধ করা। নিচে চিশতিয়া তরিকতের কয়েকটি মৌলিক সবক বা আধ্যাত্মিক অনুশীলনের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দেওয়া হলো:
১. ফাতেহাখানি (فاتحة خوانی)
ফাতেহাখানি হলো ওলি-আউলিয়া, পীর-মাশায়েখ, আত্মীয়স্বজনসহ মৃত মুসলমানদের রূহের মাগফিরাত কামনায় কোরআন তিলাওয়াত, দরূদ শরীফ পাঠ ও দোয়া করার একটি পদ্ধতি। এতে পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন সূরা পাঠ করে ছোয়াব রেছানা (উপহার) প্রদান করা হয়।
সংজ্ঞা ও উদ্দেশ্য: ফাতেহাখানি হলো কুরআন তিলাওয়াত, দরূদ শরীফ, দোয়া এবং বিশেষভাবে কিছু আয়াত পাঠ করে মৃতদের রূহের উদ্দেশ্যে ইসালে ছওয়াব (সওয়াব পৌঁছানো) করা। এটি চিশতিয়া তরিকতের একটি গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক রেওয়াজ।
চর্চার পদ্ধতি: সূরা ফাতিহা, সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক, সূরা নাস প্রভৃতি পাঠ করা হয়। দরূদ শরীফ পাঠের মাধ্যমে শুরু এবং শেষ করা হয়। এরপর মৃত ব্যক্তিদের নাম করে তাদের রূহের মাগফিরাতের জন্য দোয়া করা হয়।
ফাতেহাখানির গুরুত্ব: এটি মৃত ব্যক্তির আত্মার প্রশান্তির জন্য সহায়ক। আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে সম্পর্ক ও দায়িত্ববোধ জাগ্রত করে। আত্মশুদ্ধির মাধ্যম হিসেবে কাজ করে, কারণ এটি আল্লাহর স্মরণ ও কুরআনের তিলাওয়াতের চর্চা।
২. ছোয়াব রেছানি (ثواب رسانی)
ছোয়াব রেছানি অর্থাৎ মৃত ব্যক্তির রূহের উদ্দেশ্যে কোরআন তিলাওয়াত, দরূদ, তাসবিহ ইত্যাদি আমলের ছওয়াব হাদিয়া বা উপহার হিসেবে পেশ করা। চিশতিয়া তরিকতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল হিসেবে বিবেচিত।
সংজ্ঞা ও উদ্দেশ্য: ছোয়াব রেছানি বা ইসালে ছওয়াব হলো নিজের আমল (নামাজ, রোজা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির, সাদকা ইত্যাদি) অন্য একজন মুসলিমের বিশেষ করে মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে সওয়াব পৌঁছে দেওয়া।
যেভাবে করা হয়: আমলের পর নির্দিষ্টভাবে বলা হয়, “হে আল্লাহ! আমি এই কুরআন তিলাওয়াত/ জিকির/ সাদকার সওয়াব অমুক মৃত ব্যক্তির রূহের উদ্দেশ্যে হাদিয়া করলাম, আপনি তা কবুল করুন।”
হাদীস থেকে প্রমাণ: রাসূল ﷺ বলেছেন, "যদি কেউ মৃতদের জন্য দোয়া করে বা সওয়াব পৌঁছে দেয়, তা তাদের উপকারে আসে।" (সহীহ মুসলিম)
৩. দরূদ শরীফের জিকির
চিশতিয়া তরিকতে নিয়মিত দরূদ শরীফ পাঠ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও সংযোগ স্থাপনের মাধ্যম। “দরূদে ইব্রাহিমী”, “দরূদে তাজ”, “দরূদে গাউসিয়া” ইত্যাদি দরূদ বেশি প্রচলিত।
দরূদের গুরুত্ব: দরূদ শরীফ পাঠ করা শুধু একটি ইবাদত নয়, বরং তা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক স্থাপনের একটি উপায়। এটি আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের একটি সেরা মাধ্যম।
চিশতিয়া তরিকতে জনপ্রিয় দরূদ: দরূদে ইব্রাহিমী, দরূদে তাজ , দরূদে গাউসিয়া, দরূদে মুখলিসীন।
চর্চার নিয়ম: প্রতিদিন নির্ধারিত সময়ে ১০০, ৩১৩ বা ১০০০ বার দরূদ শরীফ পাঠ করা হয়। যিকিরের সময় মনোযোগ সহকারে, হৃদয়ে ভালোবাসা ও ভক্তি রেখে দরূদ পাঠ করা হয়।
ফজিলত: গুনাহ মাফ হয়, রহমতের দরজা খুলে যায়। আল্লাহ ও ফেরেশতারা দরূদ পাঠকারীর জন্য দোয়া করেন।
৪. মোরাকাবা (مراقبة)
মোরাকাবা হলো আত্ম-সচেতনতা এবং আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের এক অন্তর্মুখী ধ্যান প্রক্রিয়া। এতে একজন সালিক (আধ্যাত্মিক পথিক) চোখ বন্ধ করে নিরিবিলি পরিবেশে বসে অন্তরে আল্লাহর জিকির বা নাম স্মরণ করে। এটি আত্মার শুদ্ধি এবং অন্তরজগতে নূর অর্জনের একটি উপায়।
মোরাকাবা কী? : মোরাকাবা হচ্ছে এক ধরণের ধ্যানচর্চা, যেখানে সালিক নিরব ও স্থির থেকে নিজের হৃদয়ে আল্লাহর স্মরণ, নূরানী ভাবনা এবং আত্মিক উপস্থিতি অনুভব করেন। এটি আত্মিক জগতের সংযোগ স্থাপনের চর্চা।
মোরাকাবার ধাপসমূহ: নিরিবিলি, পবিত্র পরিবেশে বসা। চোখ বন্ধ করে “আল্লাহ, আল্লাহ” অথবা “হু, হু” ইসিম জিকির করা। মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করে মনে করা, আল্লাহ আমাকে দেখছেন, আমি আল্লাহকে অনুভব করছি। শরীরকে সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ রেখে আত্মার গভীরে ডুবে যাওয়া।
উদ্দেশ্য ও উপকারিতা: অন্তরের অন্ধকার দূর করা। আত্মিক প্রশান্তি অর্জন। আল্লাহর সান্নিধ্য অনুভব করা। নফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখা।
উপসংহার
চিশতিয়া তরিকতের এই সবকসমূহ কেবল ইবাদত নয়, বরং আত্মিক উন্নয়ন ও দেহ-মন-আত্মার পরিশুদ্ধির একটি পূর্ণাঙ্গ পথ। নিয়মিত ফাতেহাখানি, ছোয়াব রেছানি, দরূদ জিকির ও মোরাকাবা চর্চার মাধ্যমে একজন সালিক ধীরে ধীরে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে এবং পরকালীন মুক্তির পথে এগিয়ে যায়।
নিয়মিত আমল ও পীর-মুরশিদের নির্দেশনা অনুযায়ী এগুলো পালন করাই এই তরিকতের মূল চর্চা।
.jpg)
No comments