জানেন কি, মহানবী (সা.) এর জানাজার ইমাম কে ছিলেন?
মহানবী হযরত
মুহাম্মদ (সা.)-এর
জানাজা অন্যান্য
সাধারণ জানাজার
মতো হয়নি।
তাঁর জানাজা
ছিল ব্যতিক্রমী
ও অনন্য।
ইতিহাসবিদদের মতে,
মহানবীর (সা.)
জানাজার নামাজে
কোনো নির্দিষ্ট
একজন ইমাম
ছিলেন না।
বরং সাহাবায়ে
কেরাম দলেবলে
পৃথকভাবে জানাজার
নামাজ আদায়
করেন।
প্রথমে পুরুষ
সাহাবিগণ দলে
দলে জানাজা
পড়েন, এরপর
নারীরা ও
সবশেষে শিশুরা
জানাজায় অংশ
নেন। প্রত্যেকেই
এককভাবে জানাজার
নামাজ পড়েছেন
এবং কারো
নেতৃত্বে নয়।
এটিই ছিল
মহানবীর (সা.)
জানাজার বিশেষত্ব।
রাসুল সা.-এর ইন্তেকাল এর আগে সাহাবিরা নবীজির দরবারে আসলেন। সাহাবাদের দেখে নবীজির চোখে বেদনার জল। নবীজি বললেন, আমি তোমাদের আল্লাহর কাছে সোপর্দ করছি, আল্লাহ তোমাদের সঙ্গী হবে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. জানতে চাইলেন, হে আল্লাহর রাসুল সা.! আপনার যাওয়ার সময় খুব নিকটে চলে এসেছে, আপনার ইন্তেকালের পর আপনাকে কে গোসল দিবে? রাসুল সা. বললেন, আমার আহলে বাইত মানে আমার পরিবারের সদস্যরা। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ আবার জানতে চাইলেন, কে আপনাকে কাফন পরাবে? রাসুল সা. বললেন, আমার আহলে বাইত। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ আবার জানতে চাইলেন কে আপনাকে কবরে নামাবে? রাসুল সা. বললেন, আমার আহলে বাইত। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ আবার জানতে চাইলেন কে আপনার জানাজা কে পড়াবে? তখন রাসুল সা.-এর চোখ বেয়ে বেদনার জল নেমে এলো। তিনি বললেন, তোমাদের নাবীর জানাজা এমন হবে না, যেমন তোমাদের হয়। যখন আমার গোসল হয়ে যাবে তখন তোমরা সবাই ঘর থেকে বের হয়ে যাবে। সবার আগে জিবরাইল আমার জানাজা পড়বে। তারপর মিকাঈল ও ই¯্রাফিল ধারাবাহিকভাবে আরশের অন্যান্য ফেরেশতারা আসবে ও আমার জানাজা পড়বে। তারপরে তোমাদের পুরুষরা, নারীরা এবং শিশুরা আমার জন্য দোয়া ও সালাম পড়বে। অতঃপর তোমরা আমাকে আল্লাহর সোপর্দ করে দিবে। (আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া-৫/২২২, দালায়েলুন নবুয়্যাহ লিলবায়হাককি)
কোথায়
অনুষ্ঠিত হয়েছিল
জানাজা?
মহানবী (সা.)-এর
দাফন ও
জানাজার নামাজ
অনুষ্ঠিত হয়েছিল
তাঁর প্রিয়
স্ত্রী হযরত
আয়িশা (রা.)-এর
কক্ষে, যেটি
এখন রওজা
মুবারক নামে
পরিচিত। তাঁর
দাফনের জন্য
পৃথক কোনো
কবরস্থানে নিয়ে
যাওয়া হয়নি,
বরং মৃত্যুর
স্থানেই তাঁকে
সমাহিত করা
হয়, যা
ছিল নবীদের
জন্য সুন্নত।
সাহাবি হজরত সালেম বিন ওবায়েদ রা. বলেন, হজরত আবু বকর রা. যখন রাসুলের নিকট যেতে চাইলেন, তখন চারপাশে মানুষের প্রচন্ড- ভিড় । হজরত আবু বকর রা. লোকদের বললেন, তোমরা আমাকে সামান্য রাস্তা দাও ! লোকেরা ভেতরে যাওয়ার পথ করে দিল ! তিনি ভেতরে গেলেন, মাথা নুইয়ে কাছে গিয়ে নবীজি সা. কে দেখলেন । নবীজির পবিত্র কপালে হজরত আবু বকর রা. চুমু খেলেন । তারপর কোরআনের আয়াত পড়লেন, যার অর্থ হলো, নিশ্চয় তুমিও ইন্তেকাল করবে এবং তারাও ইন্তেকাল করবে । হজরত আবু বকর রা. বেরিয়ে এলে; লোকেরা জানতে চাইলেন, ওগো নবীজির বন্ধু ! নবীজি কি ইন্তেকাল করেছেন ? হজরত আবু বকর রা. বললেন, হ্যা । তখন লোকেরা নবীজির ইন্তেকালের খবর দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করলো । তারপর সাহাবায়ে কেরাম হজরত আবু বকর রা. কে জিজ্ঞেস করলেন, ওগো নবীজির বন্ধু ! নবীজির কি জানাজার নামাজ পড়া হবে ? তিনি বললেন, হ্যা । জিজ্ঞাসা করা হল, কিভাবে ? হজরত আবু বকর রা. বললেন, এভাবে যে, এক এক জামাত নবীজির ঘরে প্রবেশ করবে এবং জানাজা পড়ে বেরিয়ে আসবে । তারপর অন্য জামাত প্রবেশ করবে । সাহাবারা হজরত আবু বকর রা. কে জিজ্ঞাসা করলেন, নবীজিকে কি দাফন করা হবে ? তিনি বললেন, জি । জিজ্ঞাসা করা হল, কোথায় ? তিনি বললেন, যেখানে আল্লাহ তায়ালা নবীজির রূহ কবজ করেছেন সেখানেই । কেননা, আল্লাহ তায়ালা নিশ্চয় নবীজিকে এমন স্থানে মৃত্যু দান করেছেন যে স্থানটি উত্তম ও পবিত্র । সাহাবারা দৃঢ়ভাবে মেনে নিলেন হজরত আবু বকর রা.-এর কথা । হজরত আবু বকর রা. নিজেই নবীজির আহলে বায়াত তথা রাসুলের পরিবার ও বংশের মানুষদের ডেকে গোসল নির্দেশ দেন । (সূত্র : শামায়েলে তিরমিজি, হাদিস : ৩৭৯, ৩৯৭, শরফুল মুস্তফা, বর্ণনা নং-৮৫০, আল আনওয়ার ফি শামায়িলিন নাবিয়্যিল মুখতার, বর্ণনা নং-১২০৯)
জানাজার
ইমাম কে
ছিলেন?
ইতিহাসবিদদের মতে,
মহানবী (সা.)-এর
জানাজার জন্য
কোনো নির্দিষ্ট
ইমাম নিযুক্ত
করা হয়নি।
হযরত আবু
বকর (রা.),
হযরত উমর
(রা.), হযরত
আলী (রা.),
এবং অন্যান্য
প্রধান সাহাবিরা
আলাদাভাবে দলে
দলে জানাজার
নামাজ পড়েছেন।
ইমাম শাফি রহ. এবং কাজি ইয়াজ রা. বলেন, নবীজি সা.-এর জানাজা পড়া হয়েছে । কিতাবুল উম্মু/ সিরাতে মস্তুফা/৩য় খ-: ২৩৫ পুনশ্চ : নবীজির জানাজা হয়েছে । সাহাবারা একা একা পড়েছেন । কেউ ইমামতি করেননি । তবে তাবাকাতে ইবনে সাদের বরাতে বলা হয়, হজরত আবু বকর ও ওমর রা. এক সঙ্গে নবীজি সা.-এর ঘরে উপস্থিত হন । নবীজির দেহ মোবরক সামনে রেখে নামাজ-সালাম ও দুরুদ পেশ করেন । দীর্ঘ দোয়ার সময় পেছনে সারিবদ্ধ সাহাবিরা আমিন আমিন বলেছেন । (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৫ম খ-: ২৬৫)
সাহাবায়ে কেরাম
জানাজার নামাজ
আদায় করেন
নিম্নোক্ত ধারাবাহিকতায়:
- প্রথমে
পুরুষ সাহাবিরা
দলেবলে জানাজা
আদায় করেন।
- এরপর
নারীরা একইভাবে
জানাজায় অংশগ্রহণ
করেন।
- সবশেষে
শিশুদের জানাজার
নামাজ পড়ানো
হয়।
প্রত্যেকে এককভাবে
(ইমাম ছাড়াই)
চার তাকবির
দিয়ে জানাজার
নামাজ আদায়
করেন।
কেন
এমন ব্যতিক্রমী
পদ্ধতি?
উলামা ও
ইতিহাসবিদদের মতে,
মহানবী (সা.)-এর
মর্যাদা, অবস্থান
এবং সম্মানের
কারণে সাহাবিরা
চেয়েছিলেন যেন
প্রত্যেকে সরাসরি
তাঁর জানাজায়
অংশ নিতে
পারেন। এক
ইমামের পেছনে
জানাজা হলে
সবাই সেই
সাওয়াবে অংশ
নিতে পারতেন
না। তাই
ইমাম ছাড়াই
দলে দলে
জানাজার নামাজ
আদায়ের সিদ্ধান্ত
হয়। এটি
ছিল সাহাবাদের
গভীর ভালোবাসা,
শ্রদ্ধা ও
আন্তরিকতার নিদর্শন।
দাফনের
সময়
মহানবী (সা.)
সোমবার ইন্তেকাল
করেন এবং
তাঁর দাফন
হয় মঙ্গলবার
দিবাগত রাতে।
দাফনের কাজ
তত্ত্বাবধান করেন
হযরত আলী
(রা.), হযরত
আব্বাস (রা.),
ফজল ইবনে
আব্বাস (রা.),
ও অন্যান্য
ঘনিষ্ঠ আত্মীয়রা।
সূত্র
ও ঐতিহাসিক
প্রমাণ:
- ইবনে
ইসহাকের সিরাত
- ইমাম
বুখারী ও
মুসলিমের হাদীস
সংকলন
- আল
বিদায়া ওয়ান
নিহায়া – ইমাম
ইবনে কাসীর
- সিরাতে
ইবনে হিশাম
ঐতিহাসিক রেফারেন্স ও হাদীস:
১.
ইবনে ইসহাক – সিরাতে রাসূলুল্লাহ
ইবনে ইসহাকের “সিরাতে রাসূলুল্লাহ” গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জানাজার নামাজে মুসলমানরা দলে দলে অংশগ্রহণ করেন, এবং কোনো নির্দিষ্ট ইমাম ছিলেন না। সূত্র: সিরাতে ইবনে ইসহাক, খণ্ড ২
২.
ইবনে সাদ – আত তাবাকাতুল কুবরা
ইবনে সাদ তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ "আত তাবাকাতুল কুবরা"-তে বর্ণনা করেন, “রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জানাজা দলে দলে পড়া হয় এবং প্রত্যেকে এককভাবে নামাজ আদায় করেন।” সূত্র: ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৬৩-২৬৪
৩.
ইমাম ইবনে কাসীর – আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া
“রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জানাজায় মুসলিমরা ছোট ছোট দল করে জানাজার নামাজ আদায় করেছেন। কেউ ইমামতি করেননি।”সূত্র: আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ২৫৮
৪.
ইমাম বায়হাকি – দালায়িলুন নুবুওয়াহ
রাসূল (সা.)-এর জানাজা সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে যে, “লোকেরা দলে দলে প্রবেশ করে, চার তাকবির দিয়ে নামাজ আদায় করে বেরিয়ে যায়।” সূত্র: দালায়িলুন নুবুওয়াহ, ইমাম বায়হাকি, খণ্ড ৭
৫.
আল হাফিয ইবনে হাজার আসকালানী – ফতহুল বারী
তিনি বর্ণনা করেছেন: “নবী (সা.)-এর জানাজা এক ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা; কোনো একক ইমাম ছিল না, বরং প্রত্যেকে আলাদাভাবে সালাত আদায় করে।” সূত্র: ফতহুল বারী, হাদীস ব্যাখ্যা, সহীহ বুখারীর ব্যাখ্যা, খণ্ড ৮
.jpg)
No comments