দায়েমি সালাত বা সার্বক্ষণিক নামাযের গুরুত্ব এবং নামাজি ব্যক্তির সঙ্গে আল্লাহ্ থাকেন না কেন – কুরআন ও হাদীসের আলোকে
ইসলামে সালাত হচ্ছে আল্লাহর সাথে যোগাযোগের একমাত্র সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু এটি কেবল রুকু-সিজদায় সীমাবদ্ধ কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং সালাত একটি দায়েমি (নিরবিচ্ছিন্ন) অবস্থা, যা মানুষের জীবনব্যবস্থায় স্থায়ীভাবে প্রতিফলিত হওয়া উচিত।
নামাজ ইবনে জিয়াদ পড়ে। নামাজ মারোয়ান পড়ে। নামাজ আনাস ইবনে নাখৈই সমর ওরফে সীমারও নামাজ পড়ে। এজিদও নামাজ পড়ে। হরে হরে সাহাবা, হরে হরে মোয়াবিয়ার মতো মিঠা মোনাফেকও নামাজ পড়ে। আহালে সুন্নাতুল জামাতের বিরাট বিশাল মনোভাবের দরুন মোয়াবিয়াকে সাহাবার মর্যাদা দিয়ে গেছেন। তাদের এই নামাজেরধরণটি দেখে মনে হতো যেন এরা মিঠা ফক্কর।
হারুনুর রশিদ, মামুন, মনসুর, মোতাওয়াক্কিল এরাও নামাজ পড়েছেন। আবার মহানবির বংশের আওলাদেরাও নামাজ পড়েছেন। নামাজ পড়েছেন, মাওলা আলি ও খাতুনে জান্নাত মা ফাতেমা। নামাজ পড়েছেন, ইমাম হাসান, ইমাম হোসাইন। নামাজ পড়েছেন, ইমাম জয়নুল আবেদিন, ইমাম আলি আকবর, ইমাম আলি আসগর, ইমাম কাশেম, ইমাম বাকের, ইমাম জাফর সাদেক, ইমাম মুসা কাজেম ও ইমাম আলি রেজা। নামাজ পড়েছেন, ইমাম আলি তাকি, ইমাম আলি নাকি ও ইমাম হাসান আসকারি। নামাজ পড়েছেন, গাউসুল আজম গাউছে পাক ও খাজা গরীবে নেওয়াজ। সবাই নামাজ পড়েছেন।
কুরআনের আলোকে
দায়েমি সালাতের
গুরুত্ব
১. সার্বক্ষণিক সালাতের আদেশ: الَّذِينَ هُمْ عَلَىٰ صَلَاتِهِمْ دَائِمُونَ “যারা তাদের সালাতের প্রতি নিরবিচ্ছিন্নভাবে আগ্রহী।”— (সূরা আল-মা'আরিজ, আয়াত ২৩)
এখানে
"دَائِمُونَ" শব্দটি
বোঝায় যারা সালাতকে শুধু
সময় মতই আদায় করে
না, বরং জীবনের প্রতিটি অবস্থায় সালাতের
ভাব, মনোভাব ও প্রভাব
বজায় রাখে।
কোরান গবেষণা করে এটুকু পেলাম যে, দায়েমী নামাজের কথাটি সুরা মারেজের তেইশ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু নামাজিদের সঙ্গে আল্লাহ্ আছেন বা থাকেন এই কথাটি কোরান-এ একবারও বলা হয় নাই। ''ইন্নাল্লাহা মা সাবেরিন'' কোরান-এ আছে। কিন্তু ইন্নাল্লাহা মা আল মোসাললিন কোরান-এর কোথাও নাই। আল্লাহ্ সবর কারীর সঙ্গে থাকেন, এই কথাটি কোরান-এ বলা হলো, কিন্তু নামাজির সঙ্গে কেন আল্লাহ্ থাকেন না ইহার গোপন রহস্যটি বুঝতে পারলাম না। আরো মজার কথা হলো, আল্লাহ্ তাকওয়াকারীর সঙ্গেই থাকেন, খান্নাসমুক্ত নফসের অধিকারী মোহসীনিন-এর সঙ্গেও থাকেন এবং মোমিন-এর সঙ্গেও আল্লাহ্ থাকেন।কিন্তু আমানুর (ইমানদার) সঙ্গে আল্লাহ্ থাকেন না।
সমগ্র কোরান তন্ন তন্ন করে খুজে পেয়েছি মাত্র চারটি স্থানে আল্লাহ্ আছেন বলে ঘোষণা করা হয়েছে। আর সেই চারটি স্থান হলো- ১.সবরকারী, ২.তাকওয়াকারী, ৩.মোহসিনিন এবং ৪.মোমিন ব্যক্তির কালবে।
কিন্তু একটি বারের তরেও আমানু ইমানদারের সঙ্গে আল্লাহ্ থাকেন কোরান-এ বলা হয় নাই। কেন বলা হয় নাই এই রহস্য আমার জানা নাই।এখন পাঠক ভাইদের অনুরোধ করছি, নামাজের হাকিকতে কেন আল্লাহ্ থাকেন না ইহা কেহ বুঝাইয়া দিলে ধন্যবাদ প্রদান করিব।কোরান-এ সার্বক্ষণিক সালাতের উল্লেখ-দায়েমি সালাত বা সার্বক্ষণিক নামাযের গুরুত্ব :
৭০ নং সুরা মারেজ এর ১৭-২৩ এবং ৩৪ নং আয়াতে এরশাদ হচ্ছে-তাদউ মান আদবারা ওয়া তাওয়াল্লা। ওয়া জামাআ ফাআওআ। ইননাল ইনসানা খুলিকা হালুআ। ইজা মাসসাহুশ শাররু জাযুআ। ওয়া ইজা মাসসাহুল খাইরু মানুআন। ইল্লাল মুসাল্লিনাল লাজিনা হুম আলা সালাতিহিম দায়েমুন। ওয়াল লাজিনা হুম আলা সালাতিহিম ইউহাফিজুন।অর্থ
:ডাকিবে (জাহান্নাম) যারা পিঠ দেখাইব এবংযারা মুখ ফিরিয়ে নিল । যারা জমা করে (সম্পদ) এবং লুকাইয়া রাখে । নিশ্চয়ই মানুষকে (ইনসান) সৃষ্টি করা হইয়াছে চঞ্চল মন দিয়ে (হালুআ) । যখন স্পর্শ করে মঙ্গল সে হয় কৃপণ (মানুআ) । কেবলমাত্র মুসল্লিগণ ছাড়া, যারা সালাতের উপর দায়েম (সর্বক্ষণ, সবসময়, সর্বহালতে)। এবং যারা নিজেদের সালাতের হেফাজতকারী ।
ব্যাখ্যা : এ আয়াতে সরাসরি দায়েমি সালাত বা সার্বক্ষণিক নামাযের কথা বলা হলো মানুষের মন বড়ই চঞ্চল, অস্থির। মন দুনিয়ার ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সা-বড়াই-হিংসা- নিন্দা-গীবতের দিকে সদা ছুটে চলে । সহজে আল্লাহ, রাসুল-আহলে বাইত এবং পির ও মুরশিদ ধ্যানে আসতে চায় না । যারা প্রকৃত মুসল্লি একমাত্র তারাই পারে মন বা নফস কে নিয়ন্ত্রণ করতে । কারণ তারা দায়েমি সালাত বা সার্বক্ষণিক নামাযে থাকে এবং তারাই হলো নামাযের আসল হেফাজতকারী ।
২. শুধুমাত্র সালাত পড়া যথেষ্ট নয়: فَوَيْلٌ لِّلْمُصَلِّينَ الَّذِينَ هُمْ عَن صَلَاتِهِمْ سَاهُونَ “অতএব দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা নামায পড়ে, অথচ যারা তাদের সালাত থেকে গাফেল।” — (সূরা আল-মাউন, আয়াত ৪-৫)
এ আয়াতে ইঙ্গিত করা হয়েছে, যাঁরা সালাত পড়ে কিন্তু এর অন্তর্নিহিত আত্মিক সম্পর্ক বজায় রাখে না, তারা প্রকৃত নামাজি নয়।
হাদীসের আলোকে
দায়েমি সালাত
১. সালাত ও আল্লাহর ঘনিষ্ঠতা:
“আল্লাহ বলেন: আমার বান্দা যখন নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার কাছে আসে, তখন আমি তাকে ভালোবাসি। আর আমি যখন তাকে ভালোবাসি, তখন আমি তার কান হয়ে যাই যার দ্বারা সে শোনে, তার চোখ হয়ে যাই যার দ্বারা সে দেখে...” — (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৬৫০২)
এই হাদীস বোঝায়, নামাযের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর ঘনিষ্ঠতা অর্জন, যা দায়েমি অবস্থার মাধ্যমে সম্ভব।
২. দায়েমি সালাত হলো জীবনব্যাপী সংযুক্তি:
“তোমার প্রতিটি কাজ যেন এমন হয় যেন তুমি আল্লাহকে দেখছো, আর যদি না দেখতেও পারো, তবে মনে রেখো, তিনি তোমাকে দেখছেন।”— (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৮)
এ হাদীস ইহসান বা
চূড়ান্ত ইবাদত সচেতনতার পরিচয় দেয়, যা
দায়েমি সালাতের মর্মবাণী।
৭নম্বর সুরা আরাফের ২০৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে - (ইননাল্ লাজিনা ইনদা রাববেকা লা ইয়াস তাকবেরুনা আন্ ইবাদাতীহী ওয়া ইউসাববেহুনাহু ওয়ালাহু ইয়াসজুদূনা) অর্থ-"নিশ্চয়ই যাহারা তোমার রবের নিকটে রহিয়াছে তাহারা তাহার (রবের) বান্দা হইবার বিষয়ে অহংকার করে না। এবং তাহারা তাহার তসবিহ পাঠ করে এবং তাহার সমীপে সেজদারত অবস্হায় থাকে। নুর নবীজি (সা) বলেছেন- সার্বক্ষণিক নামাজ ওয়াক্তিয়া নামাজের চেয়ে উত্তম।
কেন কেবল
নামাজি হলেই
আল্লাহ সঙ্গে
থাকেন না?
অনেক সময় দেখা যায়, কেউ নিয়মিত নামাজ পড়ে তবুও তার চরিত্র, ব্যবসা, বা ব্যবহার ইসলামের শিক্ষার বিপরীত। কেন?
“নামায অবশ্যই অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।” — (সূরা আনকাবূত, আয়াত ৪৫)
যদি নামায মানুষকে খারাপ কাজ থেকে না ফেরায়, তবে সেটা শুধু যান্ত্রিক সালাত, দায়েমি সালাত নয়। প্রকৃত নামাজি সেই, যার মন, মুখ, ও কর্মে সালাতের প্রভাব পড়ে।
.jpg)
No comments