Header Ads

"নামাজী তোর নামাজ হলোরে ভুল, মসজিদে তুই রাখিলি সিজ্‌দা, ছাড়ি ইমানের মূল"

 

এই কথাটি মূলত আমাদের অনেকের সালাত বা নামাজের আড়ালের এক বড় বাস্তবতা তুলে ধরে। আমরা নামাজ পড়ি, মসজিদে যাই, সিজদা করিকিন্তু যদি এর মধ্যে ইমান, খুশু-খুজু, অন্তরের উপস্থিতি, তাকওয়া, ভালোবাসা না থাকে, তবে সেই নামাজ একখণ্ড আড়ম্বর ছাড়া কিছু নয়

সালাত কায়েম করা কি এতই সহজ যে মসজিদে গিয়ে ইমামের পিছনে জামাতে দাঁড়ালাম আর সালাত কায়েম হয়ে গেলগুরুজি সায়রামমীম বলেন- "সালাতে নাকি আল্লাহর সাথে বান্দার কথোপকথন হয়তা সারাজীবন নামাজ পড়া হল আল্লাহর সাথে কথোপকথন হল না! মরীচিকার পিছনে ছুটিলাম জীবনভর জলের সন্ধান পেলাম না!"

কুরআনে আল্লাহ পাক বলেছেন- আকিমুস সালাত। আকিমু অর্থ কায়েম করা বা স্থাপন করা কিংবা প্রতিষ্ঠা করা। আর সালাত অর্থ সংযোগ বা যোগাযোগ। তাহলে আকিমুস সালাত এর অর্থ হলো সংযোগ স্থাপন করা বা সংযোগ কায়েম করা কিংবা সংযোগ প্রতিষ্ঠা করা। যেহেতু সালাত আল্লাহর জন্য আদায় করা হয় তাই এটা পরিষ্কার যে সালাতের মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করার হুকুম দিয়েছেন। আর আমরা সালাতের অর্থ করেছি দোয়া বা প্রার্থণা করা। সালাত যদি দোয়া বা প্রার্থাণাই হবে তাহলে আল্লাহ বলতেন না যে তোমরা সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থণা কর। প্রার্থণার মধ্যে কি প্রার্থণা করা যায়আল্লাহ বলেছেন সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থণা কর অর্থাৎ আমার সাথে সংযোগ স্থাপন করে সাহায্য চাও

. বাহ্যিক নামাজ যথেষ্ট নয়অন্তরের উপস্থিতি জরুরি

কুরআন বলে: "অতএব ধ্বংস তাদের জন্য, যারা সালাত পড়ে, অথচ তারা তাদের সালাত সম্পর্কে গাফেল।"
সূরা আল-মাউন: আয়াত -

ব্যাখ্যা: এই আয়াত গাফেল নামাজিদের কথা বলছেযারা শুধু শরীর দিয়ে নামাজ আদায় করে, কিন্তু তাদের অন্তর আল্লাহর সামনে থাকে না

সারা বিশ্বের দেড়শো কোটির উপরে মুসলমানেরা সকলে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় না করলেও নিয়মিত সালাত আদায়কারীর সংখ্যাও একেবারেই কম নয়। সারাবিশ্বের লক্ষ লক্ষ মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায়ের পর মুসলিম জাতির কল্যাণে দোয়া করা হয়। সপ্তাহের শুক্রবারের জুম্মার সালাতের পর সারাবিশ্বে লক্ষ লক্ষ মসজিদে কোটি কোটি মুসল্লিদের নিয়ে ইমাম সাহেবগণ মুসলিম জাতির কল্যাণে বিশেষভাবে দোয়া করেন। ঈদের জামাতে তো আরো বিশেষভাবে দোয়া করা হয়। এত এত দোয়া করার পরও মুসলিম জাতির অবনতি ছাড়া উন্নতির কোনই লক্ষণ পরিলক্ষিত হয় না। তাহলে এত অধিক সংখ্যক মুসলমানেরা যে এত এত দোয়া করেন সেই দোয়ার ফলাফল কোথায় যায়আসলে আল্লাহ যে কারণে যেভাবে সালাত কায়েম করতে বলেছেনআমরা সেভাবে সালাত আদায়ের চেষ্টা না করে সালাত আদায় করার কাজ সালাত আদায় করি। সালাত হলো কি হলো না বা কবুল হলো কি হলো না আল্লাহ জানেন। এই হলো আমাদের সালাতের অবস্থা। সালাতে আল্লাহর সাথে যদি আপনার যোগাযোগ হয় আপনি কি তা জানবেন না যে আল্লাহর সাথে আপনার সংযোগ হয়েছেসালাতের মাধ্যমেই আল্লাহর সাথে যোগাযোগ হয় বলেই সালাতকে মমিন ব্যক্তির জন্য মেরাজ বলা হয়েছে

. আল্লাহ শরীর নয়, অন্তর দেখেন

হাদীসে নবী (সা.) বলেছেন: আল্লাহ তোমাদের চেহারা শরীর দেখেন না, বরং তিনি তোমাদের অন্তর আমল দেখেন। সহীহ মুসলিম: ২৫৬৪

ব্যাখ্যা: শুধু মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়লেই চলবে না। ইমান, আন্তরিকতা আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা থাকতে হবে

. লোক দেখানো নামাজ বরং গোনাহের কারণ

কুরআন বলে: "হায় সেই নামাজিদের জন্য, যারা নামাজে গাফেল, যারা লোক দেখানোর জন্য নামাজ পড়ে।"  সূরা আল-মাউন: আয়াত -

ব্যাখ্যা: যারা নামাজকে সামাজিক প্রদর্শন মনে করে বা লোক দেখানোর জন্য পড়ে, তাদের নামাজ আল্লাহর কাছে কবুল নয়

. নামাজ আল্লাহর সাথে সম্পর্ক তৈরির মাধ্যম, না দায়িত্ব পালন?

কুরআন বলে: "নিশ্চয়ই সালাত মানুষকে অশ্লীলতা অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে।" সূরা আনকাবুত: আয়াত ৪৫

প্রশ্ন: আপনি নামাজ পড়েও যদি গীবত, হারাম, অহংকার, অন্যায় কাজ না ছাড়েন, তাহলে বুঝতে হবে আপনার সালাতে সংযোগ তৈরি হয়নি। অর্থাৎ, আপনি সিজদা করলেন ঠিকইকিন্তু ইমানের মূল থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন

ভুলভাবে ধর্ম শিখে ভুল ধর্ম পালন করার কারণেই প্রতিবছর পবিত্র মক্কায় হজ্জে গিয়ে কাবা শরীফে বিশ লক্ষ হাজী মুসলিম জাতির কল্যাণের জন্য দোয়া করলেও সারাবিশ্বে মুসলিম জাতির কল্যাণ তো হয়ই না বরং মুসলমানদের দুর্দশা দিনে দিনে বাড়তেই আছে। তাহলে পবিত্র কাবায় হজ্জে গিয়ে প্রতি বছর বিশ লক্ষ হাজীদের করা দোয়া যায় কোথায়এর কারণ আল্লাহর সাথে সংযোগহীন সালাত এবং আল্লাহর উদ্দশ্যে করা সংযোগহীন যেকোন ইবাদতের কোনই মূল্য নেই

. নামাজ কি অভ্যাস নাকি উপলব্ধি?

নবী (সা.) বলেন: "যে ব্যক্তির নামাজ তাকে অন্যায় অশ্লীলতা থেকে বিরত রাখে না, সে যেন চিন্তা করে, তার নামাজ আদায় ঠিকমতো হচ্ছে কি না।" আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে, সহীহুল জামে ৩৯১০

ব্যাখ্যা: যান্ত্রিকভাবে নামাজ পড়লে, সেটি আত্মশুদ্ধি করে না। মনের সঙ্গে, উপলব্ধি দিয়ে পড়লে তবেই তা আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য হয়

. সিজদা, কিন্তু ইমানহীনশয়তানের শিক্ষাও ভুল না!

"আর যখন আমি ফেরেশতাদেরকে বললাম: আদমকে সিজদা করো; তখন সবাই সিজদা করলশয়তান ছাড়া। সে অবাধ্যতা করল এবং অহংকারে পড়ে গেল, সে ছিল কাফেরদের একজন।" সূরা বাকারা: আয়াত ৩৪

শয়তান জানত আল্লাহ কে। কিন্তু সে বিনয় দেখায়নি, মান্যতা দেয়নি। তাই তার জ্ঞান, সিজদা আমল সবই অগ্রহণযোগ্য হলো। ইমান ছাড়া শুধু ইবাদত মূল্যহীন

আল্লাহর সাথে সংযোগ স্থাপনের রাস্তা হারিয়ে ফেলে আমরা সালাতকে বানিয়েছি বেহেশতে যাওয়ার চাবি। সালাত যদি বেহেশতের চাবিই হয় তাহলে কারবালায় হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ)-কে শহিদ করে তাঁর পবিত্র শরীর মোবারক হতে মাথা মোবারক বিচ্ছিন্নকারীরা সকলেই কারবালার ময়দানেই জামাতে আসরের সালাত আদায় করেছিল। তারা সকলেই পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায়কারী ছিলেন। সালাত বেহেশতের চাবি হলে তো তারা সকলেই চাবি দিয়ে বেহেশতের তালা খুলে বেহেশতে ঢুকে যাবে। রাসুল (সাঃ)-এর আশপাশে থাকা মোনাফেকরাও রাসুল (সাঃ)-এর পিছনে সাহাবীগণের সাথে নিয়মিত সালাত আদায় করেছেন। তাহলে কি এরা সবাই সালাত নামক চাবি দিয়ে বেহেশতে চলে যাবে?

কি করলে নামাজে ইমান সংযোগ আসবে?

করণীয়

ব্যাখ্যা

তাওবা আত্মশুদ্ধি

নামাজে সংযোগ আনতে হলে অন্তরকে পবিত্র করতে হবে

নামাজের অর্থ জানুন

আয়াতের মানে বুঝে পড়লে মনোযোগ উপলব্ধি বাড়ে

আল্লাহর প্রেম অর্জন করুন

ভয় নয়, প্রেম ভালোবাসা দিয়েই আল্লাহর কাছে পৌঁছা যায়

খুশু-খুজু বৃদ্ধি করুন

ধীরে ধীরে, ভাবনা নিয়ে পড়লে সংযোগ তৈরি হয়

দায়েমি সালাতের চর্চা

সালাতকে কেবল ওয়াক্তে সীমাবদ্ধ না রেখে জীবনচর্চায় পরিণত করুন

উপসংহার:

নামাজী তোর নামাজ হলোরে ভুল”— এই কথাটি আমাদের স্মরণ করায়, নামাজ কেবল শরীরের ব্যায়াম নয়, আত্মার উত্থান আপনি যদি সিজদা করেন কিন্তু অন্তরে আল্লাহর উপস্থিতি না থাকে, ইমান না থাকেতাহলে সেই সিজদা আল্লাহর কাছে পৌঁছে না

আসুন আমরা আত্মসমালোচনা করি, যেন আল্লাহ আমাদের নামাজকে শুধু আমল নয়, বরং ইমান প্রেমের মাধ্যম হিসেবে কবুল করেন


No comments

Powered by Blogger.