আল্লাহর সাথে সালাতে সংযোগ না হওয়ার কারণ কী?
সালাত ইসলামের মূল স্তম্ভগুলোর অন্যতম। এটি এমন এক ইবাদত যার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করে। কুরআন বলেছে, "আকিমুস সালাতা লিযিকরী" — ‘আমার স্মরণে সালাত কায়েম করো।’ — (সূরা ত্বাহা, আয়াত ১৪)
অথচ
বাস্তব
জীবনে
আমরা
দেখি,
অনেক
মানুষ
নিয়মিত
নামাজ
পড়ে
তবুও
তার
মধ্যে
আল্লাহ-ভীতি, আত্মশুদ্ধি বা
নৈতিক
উন্নতি
দেখা
যায়
না।
এমনকি
সালাত
পড়েও
মানুষ
পাপ
ও
অন্যায়ের পথে
চলে
যায়।
প্রশ্ন
জাগে,
কেন? সালাতে কি কোনো ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে?
নামাজ কি ও কেন? এর ভেদ ও মারেফত কি? অনেক নামাজিও জানে না নামাজের মারেফত কি? নামাজের কথা আল্লাহ কুরানে বারবার বলেছেন। ৮২ বার বলেছেন। আর পবিত্র থাকতে শয়তানি কাজ হতে বেচে থাকতে বলেছেন ২৭৪ বার। তা কেন? একবার বললেই তো ফরজ হত ঠিক কিনা? বার বারকেন? রোজা, যাকাত, হজ্জের কথা অন্য ইবাদতের কথা ১বার করে বলেছেন। নামাজের কথা এত বারবার বলা হল কেন? তাছাড়া সুরা ফাতিহা ছাড়া নামাজ হবে না কেন? নামাজের বেহেতের চাবি আর নামাজের চাবি অযু বা পবিত্রতা কেন?
কারণ ১: সালাত হয়ে গেছে যান্ত্রিক, অন্তরের স্পর্শ নেই
আমাদের
অনেকের
সালাত
এমন
হয়ে
দাঁড়ায়—যেন রোবটের মতো
দাঁড়ালাম, পড়লাম,
উঠলাম,
সিজদা
দিলাম,
সালাম
ফিরালাম। কিন্তু
মন
একবারও
অনুভব
করল
না,
"আমি আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে আছি।" এমন
সালাতের ফল
সম্পর্কে কুরআনে
বলা
হয়েছে—
"অতএব ধ্বংস তাদের জন্য যারা সালাত পড়ে, অথচ তারা তাদের সালাত সম্পর্কে গাফেল।" — (সূরা
আল-মাউন, আয়াত ৪-৫)
এখানে
“গাফেল”
বলা
হয়েছে
সেইসব
নামাজিদের কথা,
যারা
বাহ্যিকভাবে ঠিক
থাকলেও,
অন্তর
একেবারেই উপস্থিত নয়।
আল্লাহ বলেন, "তারা যখন জাহান্নামের কাছে পৌছাবে, তখন তাদের কান, চক্ষু ও ত্বক তাদের কর্ম সম্পর্কে সাক্ষ্য দিবে (সূরা হামীম সেজদাহ, আয়াত-২০)।" আমাদের শরীর তো আমাদের কর্মের বিরুদ্ধেই সাক্ষী দিবে। আর সাক্ষী হিসাবে শরীরের আদায় করা সালাত অন্তরের কোন কাজে আসবে না, যদি না অন্তর সালাত আদায় করে। সালাতে আল্লাহর সাথে আমাদের অন্তরের সংযোগ স্থাপন হবে শরীরের সাথে নয়। অথচ আমরা এমনভাবে সালাত আদায় করি সালাতে আমাদের অন্তর স্থীর থাকে না। আমরা যখন আল্লাহকে সেজদা করার জন্য সালাতে দাড়াই, তখন আল্লাহ পরিষ্কার দেখেন যে বান্দার শরীর যখন আল্লাহকে সেজদা করছে অন্তর তখন বাজারে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আল্লাহর সামনে বান্দার রক্তমাংসের শরীর দাড়িয়ে আছে কিন্তু অন্তর তো আল্লাহর সামনে স্থীর না থেকে বারবার এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। সালাত তো পড়তে হবে অন্তরকে। অথচ সালাতে দাড়ালে সেই অন্তর সালাত না পড়ে সালাতে শরীরকে রেখে হাটেবাজারে ঘুরে বেড়ায়। আর অন্তরকে দিয়ে শরীর যদি সালাত আদায় করাতে না পারে সেই সালাতের পুরষ্কার পাওয়া তো দুরের কথা বরং ওয়েল দোযখ।
কারণ ২: গুনাহর বোঝা মনকে ভারাক্রান্ত করে
আল্লাহর সংস্পর্শে আসতে
হলে
আত্মা
হতে
হবে
পরিশুদ্ধ। যারা
পাপের
মধ্যে
নিমজ্জিত, তাদের
হৃদয়
গাফেল
হয়ে
যায়।
"না, বরং তাদের কৃতকর্ম তাদের অন্তরকে কলুষিত করেছে।" — (সূরা
আল-মুতাফ্ফিফিন, আয়াত ১৪)
হারাম
উপার্জন, গীবত,
অহংকার,
অন্যায়ের সহযোগিতা—এসব
হৃদয়কে
আল্লাহর আলো
থেকে
দূরে
সরিয়ে
দেয়।
অন্তরকে বশে এনে একাগ্রচিত্তে সালাত আদায় যে কঠিন কাজ তা আল্লাহ কুরআনেই বলেছেন, "তোমরা নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর, নিশ্চয়ই ইহা কঠিন কাজ বিনীতগণ ব্যতীত (সূরা বাকারাহ, আয়াত-৪৫)।" আল্লাহ আরো বলেন, "নিশ্চয়ই সালাত মানুষকে পাপকাজ হতে ফিরিয়ে রাখে (সূরা আনকাবুত, আয়াত-৪৫)।"
বিনীত অর্থ ভদ্র বিনয়ী আর যে বিনয়ী নয় সে বেয়াদব। আল্লাহর সাথে যে ব্যক্তির সংযোগ স্থাপন হয়ে যায় সেই ব্যক্তিই বিনয়ী হয়ে যায়। আর বিনয়ী ব্যক্তি আর কোন পাপকাজে জড়ায় না বা জড়াতে পারে না। কারণ আল্লাহর সাথে তার সংযোগ স্থাপন বা যোগাযোগ হয়ে গেছে। আর যে ব্যক্তির অন্তর আল্লাহর সামনে সালাতে দাড়িয়ে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করে তাহলে সেই ব্যক্তি সালাতে দাড়িয়ে আল্লাহর সাথে চরম বেয়াদবি করে। আর আল্লাহ কোন বেয়াদবিই পছন্দ করেন না। যে ব্যক্তি সালাতে নিজের অন্তরকে পুরোপুরি বশে এসে একাগ্রচিত্তে সালাত আদায় করে সেই ব্যক্তি নিশ্চিতভাবে বিনয়ী। আর অন্ডরকে বসে এনে বিনয়ী হওয়া কঠিন কাজ এটা আল্লাহর কুরআনে দেওয়া নিজেরই ঘোষণা।
কারণ ৩: তাকওয়া ও তাযকিয়া (আত্মশুদ্ধি) না থাকা
আল্লাহ
কুরআনে
বলেন:
“ইন্নাল্লাহা মা’আল মুত্তাকীন”— আল্লাহ তাকওয়াবানদের সঙ্গে থাকেন। — (সূরা
বাকারা,
আয়াত
১৯৪)
কিন্তু
কুরআনে
"ইন্নাল্লাহা মা’আল মুসল্লীন"
বলা
হয়নি।
অর্থাৎ,
স্রেফ নামাজি হলেই আল্লাহ সঙ্গে থাকবেন না,
বরং
তাকওয়া
ও
আত্মশুদ্ধি আবশ্যক।
কারণ ৪: দায়েমি সালাতের অভাব
কুরআনে
একমাত্র সুরা
মারেজের ২৩
আয়াতে
বলা
হয়েছে—"الَّذِينَ
هُمْ عَلَىٰ صَلَاتِهِمْ دَائِمُونَ" — যারা তাদের সালাতের প্রতি দায়েম (অবিচ্ছিন্নভাবে) আগ্রহী।— সূরা আল-মা'আরিজ, আয়াত
২৩
এখানে
বোঝানো
হয়েছে,
সালাত
কেবল
পাঁচ
ওয়াক্তের নামাজ
নয়—
এটি এমন এক জীবনব্যবস্থা, যা সবসময় আল্লাহর স্মরণে রাখে।
কারণ ৫: আত্মতৃপ্তি ও আড়ম্বরপূর্ণ ইবাদত
অনেকেই
সালাত
পড়ে,
কিন্তু
সেটা
হয়
লোক
দেখানো,
আড়ম্বরপূর্ণ, কিংবা
নিজের
ধার্মিকতা দেখানোর উপায়।
"হায় সেই নামাজিদের জন্য, যারা লোক দেখানোর জন্য নামাজ পড়ে।" — (সূরা আল-মাউন, আয়াত ৪-৬)
এই
সালাতে
নেই
ভালোবাসা, নেই
আল্লাহর সামনে
বিনম্রতা।
কারণ ৬: আল্লাহর প্রেম অনুভব না করা
আল্লাহর সাথে
সংযোগের মূল
ভিত্তি
হচ্ছে
"মহব্বত বা প্রেম"। যদি আল্লাহর প্রতি
প্রেম
না
থাকে,
সালাত
কেবল
দায়িত্ববোধে রয়ে
যায়। “তুমি যদি আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমার অনুসরণ করো, তাহলে আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসবেন।” — (সূরা
আলে
ইমরান,
আয়াত
৩১)
সালাতে
প্রেম
না
থাকলে,
আল্লাহর উপস্থিতি অনুভব
হয়
না।
সমাধান: কীভাবে সালাতকে সংযোগময় করব?
১.
নিয়মিত তাওবা ও আত্মশুদ্ধির চেষ্টা
২.
আল্লাহকে ভয় নয়, ভালোবাসা ও জান্নাতপ্রাপ্তির আশায় সালাত আদায় করা
৩.
সালাতের অর্থ ও অর্থবোধে মনোযোগী হওয়া
৪.
যান্ত্রিকতা ছেড়ে দিয়ে ধ্যান, ধীরে ধীরে পড়া, সিজদায় সময় বাড়ানো
৫.
সার্বক্ষণিক আল্লাহ-স্মরণ চর্চা—সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, ইস্তিগফার ইত্যাদি দিয়ে মন পরিশুদ্ধ রাখা
উপসংহার
সালাত
এমন
এক
ইবাদত,
যার
মাধ্যমে বান্দা
তার
প্রভুর
দরজায়
প্রতিদিন পাঁচবার কড়া
নাড়ে।
কিন্তু
সেই
কড়া
নাড়ায়
যদি
আত্মার
উপস্থিতি না
থাকে,
পবিত্রতা না
থাকে,
প্রেম
না
থাকে—তবে সেই দরজা
খোলে
না।
আল্লাহ
আমাদের
সালাতকে দায়েমি
সালাতে
রূপান্তর করার
তাওফিক
দিন,
যাতে
আমরা
কেবল
রুকু-সিজদা নয়, আল্লাহর সান্নিধ্যও লাভ করতে পারি।
.jpg)
No comments